শিক্ষাগুরু : আমাদের আলোকবর্তিকা
তানভীর আহমেদ রাসেল || রাইজিংবিডি.কম
প্রস্থান প্রকৃতির অবধারিত রীতি। কেউ আগে, কেউ পরে। নশ্বর দেহটা মাটির সাথে মিশে যায় এবং সেই সাথে ইতি টানতে হয় মোহময় এই পৃথিবীর। শেষ দিবসে মাটির সাথে পিষ্ট হয়ে কারো জীবনের অধ্যায়ের ইতি ঘটে এখানেই। কখনো আবার শারিরীক মৃত্যুর পরেও কেউবা নতুন করে বেঁচে ওঠেন হাজারো প্রাণের স্পন্দনে। বেঁচে থাকেন অজস্র মানবের মননে ও মগজে।
এমনই এক কীর্তিমান জনাব গোলাম মাওলা। তিনি কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট উপজেলার ভোলাইন বাজার উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের প্রাক্তন শিক্ষক। গোলাম মাওলা স্যার জিএম স্যার নামে অত্র এলাকায় এক নামে সমাদৃত ও সুপরিচিত ছিলেন।
প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জনাব গোলাম মাওলা। ইংরেজি শিক্ষক হলেও বাংলা, পদার্থ, রসায়ন, গণিত, উচ্চতর গণিতে তাঁর ছিল অসামান্য প্রতিভা। অত্যন্ত মেধাবী ও সৃজনশীল এই শিক্ষাগুরু ছিলেন গতানুগতিক অন্যান্য শিক্ষকের চেয়ে একদমই ভিন্ন প্রকৃতির। নাড়ির প্রতি অকৃত্রিম মায়ার বাঁধনে আচ্ছাদিত হয়ে এই অজপাড়ায় শিক্ষার প্রদীপ দীপ্তিমান করতে নিজের জীবকে বিলিয়ে দিয়েছেন মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।
আজ থেকে অর্ধশতক বছর আগে যখন ওই অঞ্চলে শিক্ষার আলো অনেকটাই ঘোর অন্ধকারে, তখনই হাল ধরেন জনাব গোলাম মাওলা স্যার। দিন রাত এক করে চালিয়ে যেতে থাকেন ক্লান্তিহীন প্রচেষ্টা। প্রত্যন্ত গ্রামে থেকেই তৈরি করেন বুয়েট, মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নেয়া যোগ্যতা সম্পন্ন এক ঝাঁক মেধাবী তরুণের। আস্তে আস্তে আলোর মুখ দেখতে শুরু করে এই অঞ্চলটি।
২০১৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর কর্মজীবনের সমাপ্তি ঘটলেও জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত নিজেকে নিবেদিত রেখেছেন উক্ত প্রতিষ্ঠানের আলোকবর্তিকা হিসেবে।
স্কুল থেকে বিদায় নিয়ে অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি যোগ দিয়েছেন কয়েক মাইল দূরের একটি প্রসিদ্ধ প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু এখানকার মাটি ও মানুষের টানে তিনি ওই প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করে আবারো অনানুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষা-কার্যক্রম চালিয়ে যান সেই চিরচেনা প্রতিষ্ঠানে। এমনই এক নিবেদিত প্রাণের অনন্য উদাহরণ ছিলেন জনাব গোলাম মাওলা স্যার।
বেঁচে থাকা মানে জৈবিকভাবে বেঁচে থাকা নয়, অমরত্ব লাভ করা। সংক্ষিপ্ত জীবনের অধিকারী হয়েও অনন্তকাল বেঁচে থাকে কর্মের মাধ্যমে। মৃত্যুর পরেও পরবর্তী প্রজন্মের নিকট আলোকিত রূপে ফিরে আসেন কীর্তিমানেরা। এর পুরোটাই করতে পেরেছেন স্যার।
অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বেলে অবশেষে গত ১৭ জুলাই ২০১৯ সালে চলে গেলেন অন্তিম শয়ানে। উনার অকাল প্রয়াণে বিদেহী আত্মার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।
লেখক: শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।
([email protected])
কুবি/তানভীর আহমেদ রাসেল/হাকিম মাহি
রাইজিংবিডি.কম