ঢাকা, বুধবার, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ২০ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

হ্যালো অভিভাবক! শুনতে পাচ্ছেন?

মো. সুমন ইসলাম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১০-০৫ ১০:২৩:২৫ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১০-২০ ১:১৯:৫৩ পিএম

জীবনে বড় হওয়ার ইচ্ছে প্রতিটি মানুষের থাকে। এই বড় হওয়ার জন্য প্রয়োজন নিজের মেধা ও মননের যথার্থ পরিচর্যা এবং একটি স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রয়াস। 'স্বপ্ন' মানুষকে প্রতিনিয়ত তার গন্তব্যের দিকে ধাবিত করে এবং প্রেরণা যোগায়।

উচ্চ মাধ্যমিক শেষ হওয়ার পরপরই প্রতিটি মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থাকে দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ার। কিন্তু যখন এসব মেধাবীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির স্বপ্ন পূরণের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়ান, তখন আমাদের সমাজের কিছু অসাধু-লোভী মানুষ এসব মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিয়ে মেতে ওঠেন ভর্তি বাণিজ্যের খেলায়।

জাতি হিসেবে আমরা অলসতায় শীর্ষে। কষ্ট করে নিজের পরিশ্রমে কোনো কিছু পাওয়ার চেয়ে কষ্ট না করে তা যদি দুর্নীতি মাধ্যমে সহজেই পাওয়া যায়, এটা আমাদের কাছে গর্বের।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা আসলেই শুরু হয়ে যায় এসব দুর্নীতিবাজদের ভর্তি বাণিজ্য, প্রশ্ন ফাঁস কিংবা প্রক্সি নামক রমরমা ব্যবসা। ভর্তি পরীক্ষার সময় আসলেই প্রতিদিনের সংবাদপত্র/টিভিতে 'অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির দায় ১/২ জন আটক, কিংবা তমুক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রক্সি দিতে গিয়ে আটক' শিরোনামে উঠে আসে এমন চিত্র।

ভর্তি জালিয়াতি/কিংবা প্রশ্ন ফাঁসের কারণে অনেক যোগ্য মেধাবীদের স্থান হয় না দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠগুলোতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় প্রতি বছর এই জালিয়াতির শিকার অনেকেই। যারা এগুলো করছে, তাঁদের হাত আইনের হাতের চেয়ে নিশ্চয়ই শক্তিশালী নয়।

ভর্তি জালিয়াতি কিংবা প্রশ্ন ফাঁসের দায় কি শুধুই তাদের, নাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা কমিটিরও? প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার ব্যর্থতা কার?

প্রশ্ন ছাপাখানাগুলো কি এতটাই নিরাপত্তাহীন যে, সেখান থেকে প্রশ্ন ফাঁস হয়ে যায়? নাকি ভর্তি পরীক্ষা কমিটিরও স্বার্থ জড়িত।

আর প্রতিবছর এসব দুষ্টু চক্রের সাথে আমাদের কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক জড়িত হচ্ছেন। অভিভাবকদের এই ভর্তি বাণিজ্যের অর্থ যোগান দেয়ার সুযোগ হাতিয়ে নিচ্ছে আমাদের দেশের এই জালিয়াতি চক্র। এসব অসাধু চক্রের সুযোগ করে দিচ্ছেন কে/কারা? নিশ্চয়ই অভিভাবক। অন্যায় যে করে আর অন্যায়কে যে প্রশ্রয় দিয়ে থাকে, তাঁরা সমান অপরাধী। নিজের সন্তানকে দেশ সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির লোভে এসব অভিভাবক মেতে ওঠে বাণিজ্যিক জালিয়াতির খেলায়।

২০১৮ সালে গুগল সার্চে শীর্ষ দুই'য়ে জেএসসি কোয়েশ্চেন। অভিভাবকরা দল বেঁধে পিএসসি কোয়েশ্চেনও খুঁজেন। দাড়ি-গোঁফ ওঠার আগেই এই প্রজন্ম জেনে যায় প্রশ্ন আউট কেমনে করতে হয়/পরীক্ষার আগে প্রশ্ন কেমনে পাওয়া যায়।

অভিভাবকদের একটাই চাওয়া তাদের গোল্ডেন জিপিএ-৫ চাই চাই। দিনশেষে টাকার জোরে এইসব মেধাবীরা যখন বলে, I'm GPA-5. কিংবা বাংলা বারো মাসের নাম বলতে পারেন না, তখন তাদের দোষ দিয়ে কী লাভ বলুন?

সেইদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন লক্ষ লক্ষ গোল্ডেন এ প্লাসের ভিড়ে ‘ওয়াও তুমি ফেইল করেছ বলে ভাইভা বোর্ডের সদস্যরা তাকে দাঁড়িয়ে স্যালুট করবে! চাকরির আবেদনপত্রে লেখা থাকবে দুইটাতে তৃতীয় শ্রেণির ফলাফল না থাকলে প্রার্থীর আবেদন বাতিল বলে গণ্য হবে।

এমন অভিভাবকরা মনে করেন, গোল্ডেন জিপিএ-৫ না পেলে কিংবা ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পেলে ছেলেটার জীবন অন্ধকার। তাঁরা নিজেরা সমাজে মুখ দেখাতে পারবেন না, এমন ভ্রান্ত ধারণায় আবদ্ধ। সমাজে তাদের সম্মান ক্ষুন্ন হবে এই ভয়ে।

পারলে ইউটিউবে সার্চ দিয়ে ‘গোল্ডেন এ প্লাস’ নাটকটা দেখবেন; কীভাবে সন্তানদের জিপিএ-৫ এর নামে ঠেলে দেয়া হচ্ছে অন্ধকারে।সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ হওয়ার শিক্ষা না দিয়ে জোর করে মাথায় জিপিএ-৫ নামে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন বিষণ্নতা। যা হিতে বিপরীত কিছুর ইঙ্গিত প্রদান করছে।

আপনাদের চোখে গত বছরের ‘বড় ছেলে’ নাটকটি সেরা মনে হলেও আমার কাছে ‘গোল্ডেন এ প্লাস’ নাটকটি ছিল সেরার সেরা। সন্তানদের ওপর জোর করে মেধাবীর ট্যাগ চাপিয়ে দিতে চাচ্ছেন আমাদের অধিকাংশ অভিভাবক।

যেখানে সন্তানদের সাথে একটু বন্ধুসুলভ আচরণের মাধ্যমে স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের থেকে ভালো ফলাফল আদায় করে নেয়া অসম্ভব কিছু নয়। শুধু প্রয়োজন এমন মানসিকতার। কবে হবে আপনাদের সেই বোধোদয়?

শুধু বাংলাদেশ নয়, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতেও বোর্ড পরীক্ষায় নকল সরবরাহ করার দায়ে অভিভাবকদের গ্রেপ্তার করে পনের (১৫) লক্ষ টাকা জরিমানা করেছেন বিহার পুলিশ। বাংলাদেশেও এমন আইন করা এখন সময়ের দাবি। প্রশ্ন ফাঁস করা কিংবা ভর্তি বাণিজ্যের সাথে জড়িত ঐ সকল শিক্ষার্থীর সাথে অভিভাবকদের দেশবাসীর সামনে এনে ক্ষমা চাওয়ানো, জরিমানা করা এবং শাস্তির ব‌্যবস্থা করা।

আদৌ কি হবে এমন আইন? এমন আইন থাকলেও কতটুকু কার্যকর করা হবে?

অভিভাবকদের উদ্দেশে বলি, সন্তানকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা ব্যারিস্টার বানানোর আগে মানুষের মতো মানুষ বানানোর স্বপ্ন দেখুন। নয়তো এমন দুর্নীতি বা কুশিক্ষায় শিক্ষিত সন্তান একদিন আপনাদেরকে (অভিভাবক) বৃদ্ধাশ্রমে রেখে গেলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। কথায় আছে, ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না।

অভিভাবকই হচ্ছেন অর্থের যোগান দাতা। অর্থের যোগান দেয়া বন্ধ হলেই প্রশ্ন ফাঁস/ভর্তি জালিয়াতি অনেকাংশে কমে আসবে। কাজেই প্রশ্ন ফাঁস কিংবা ভর্তি জালিয়াতি বন্ধে অভিভাবকরাই মূল ভূমিকা পালন করতে পারে বলে আশা করা যায়।

‘ভর্তি বাণিজ্য, প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ হোক, মেধার লড়াইয়ে যোগ্য মেধাবীদের জয় হোক। তাহলেই কেবল অভিভাবক এবং সমগ্র জাতির জয় হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।


রাবি/সুমন ইসলাম/হাকিম মাহি

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন