ঢাকা     বুধবার   ০৫ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২০ ১৪২৭ ||  ১৫ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

risingbd-august-banner-970x90

শিক্ষক ও সমাজ একই সুতোয় বাঁধা

|| রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:৪১, ২৯ অক্টোবর ২০১৯  

জাতি গঠনের অতন্দ্র কারিগর শিক্ষকদের সম্মান জানানোর জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিনের প্রয়োজন নেই। তথাপি শিক্ষকদের প্রতি সম্মান, মর্যাদা ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপনে জনসচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকতার মতো এ মহান পেশার অবদানকে স্মরণ করার জন্যই সুনির্ধারিত হয়েছিলো ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষকদের সাথে দেখা হলে শুধু সালাম বিনিময়ই শ্রদ্ধা নয়, বরং তাদের আদর্শকে বাস্তবায়ন করাই প্রকৃত শ্রদ্ধা।

শিক্ষা যখন জাতির মেরুদণ্ড তখন শিক্ষকরা এই মেরুদণ্ডের পরিচর্যাকারী। শিক্ষার প্রচার এবং প্রসার ঘটে থাকে মহান শিক্ষকদের নিরলস পরিশ্রমের ফলে। একটি শিশুর শিক্ষার সূত্রপাত এবং বিকাশ ঘটে তার চারপাশের পরিবেশ পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে। শিশুর অপ্রতাষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জনে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে মা-বাবার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। সুতরাং এই মা এবং প্রথম শিক্ষক। তারপরেই হচ্ছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ, যারা শিশুর প্রাতিষ্ঠানিক মেধাবিকাশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সাথে চরিত্র গঠনের একটি বিরাট সময় কেটে যায় বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে। সুতরাং মা-বাবার পরেই শিক্ষকদের মর্যাদা।

শিক্ষকদের মর্যাদা নিয়ে রচিত হয়েছে অসংখ্য সাহিত্য। কাজী কাদের নেওয়াজ রচিত ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতাটি আমরা সবাই পড়েছি। কবিতাটির শেষোক্ত কয়েকটি পংক্তিমালা তুলে ধরছি-

‘বাদশাহ্ কহেন, সেদিন প্রভাতে দেখিলাম আমি দাঁড়ায়ে তফাতে,
নিজ হাতে যবে চরণ আপনি করেন প্রক্ষালন,
পুত্র আমার জল ঢালি শুধু ভিজাইছে ও চরণ।
নিজ হাতখানি আপনার পায়ে বুলাইয়া সযতনে
ধুয়ে দিল না’ক কেন সে চরণ, স্মরি ব্যথা পাই মনে।

উচ্ছ্বাস ভরে শিক্ষকে আজি দাঁড়ায়ে সগৌরবে
কুর্নিশ করি বাদশাহে তবে কহেন উচ্চরবে-
আজ হতে চির-উন্নত হল শিক্ষাগুরুর শির,
সত্যই তুমি মহান উদার বাদশাহ্ আলমগীর।’

কবিতাটি শ্রেণিকক্ষে পঠনের সময় একসাথে ছাত্র-শিক্ষক সবার চক্ষু অশ্রুজলে ভেসেছে।

সুতরাং ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কে আন্তরিকতার ছোঁয়া চিরন্তন। প্রত্যকের জীবনেই রয়েছেন এমন কিছু শিক্ষক যাদের আমাদের ব্যক্তিজীবনে অবদান ভুলার মতো নয়। সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত লোক কখনও তার শিক্ষককে অসম্মান, অশ্রদ্ধা ও অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে না।

শিক্ষকদের সম্মানে শির নত করেছেন বহু প্রতাপশালী অত্যাচারী শাসকও। শিক্ষকদের সম্মান প্রদর্শনার্থে বহুদেশের সর্বোচ্চ শাসকও কোনো অনুষ্ঠানে নিজ আসন ছেড়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ২০১৮ সালে অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যারের সম্মানার্থে লাল গালিচা থেকে নেমে গিয়েছিলেন।

শিক্ষকরা মা-বাবার সমতূল্য সম্মান পাওয়ার যোগ্য। পৃথিবীর সব ধর্মে শিক্ষকদের সম্মানের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ববহ। হাদিসে বলা হয়েছে, ‘তোমরা জ্ঞান অর্জন কর এবং জ্ঞান অর্জনের জন্য আদব শিষ্টাচার শিখ। তাকে সম্মান কর; যার থেকে তোমরা জ্ঞান অর্জন কর।’ চাণক্য শ্লোকে বলা হয়েছে, ‘এক অক্ষরদাতা গুরুকেও গুরু বলিয়া মান্য করিবে।’ 

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক লাঞ্চিত হওয়ার ঘটনা ঘটে,  যা জাতির বিবেককে নাড়া দেয়। এ ঘটনার কারণগুলোর মধ্যে শিক্ষার্থীদের নৈতিক অবক্ষয় যেমন দায়ী, তেমনি কিছু কিছু শিক্ষকের অপকর্মও দায়ী। ছাত্ররা যেমন নৈতিক শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, নৈতিক অবক্ষয় হচ্ছে, তেমনিভাবে কিছু কিছু শিক্ষক নৈতিকতা বিবর্জিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে শিক্ষকের মতো মহান দায়িত্বে কালি লেপন করছেন। শিক্ষাকে যারা পেশা হিসেবে গ্রহণ  করেন, তাদেরকে আরো সতর্ক থাকা উচিৎ। যাতে করে তাঁদের দ্বারা এ পেশার কোনো ক্ষতি না হয়।’  

একটি দেশের উন্নয়ন-সমৃদ্ধিতে সে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। সুতরাং দেশের উন্নয়নে শিক্ষক সমাজের ভূমিকা লক্ষণীয়। শিক্ষক ও সমাজ একই সুতোয় বাঁধা। শিক্ষক ভালো হলে ছাত্র ভালো হবে, আর ছাত্র ভালো হলে সমাজ ভালো হবে।

আজকের ছাত্র আগামী দিনের শিক্ষক। তাই প্রত্যেক ছাত্রের উচিৎ তাদের শিক্ষাগুরুর প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণ করা, সম্মান করা, তাদের সার্বিক অবস্থার খোঁজ-খবর নেয়ার চেষ্টা করা, দুঃসময়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং অন্তত তাঁদেরকে কষ্ট না দেয়া। আর শিক্ষকের দায়িত্ব হচ্ছে তার আদর্শ দিয়ে ছাত্রকে তৈরি করা। পৃথিবীর সমস্ত শিক্ষক দীর্ঘজীবী হোন, সেটাই কামনা।

লেখক: শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


ঢাবি/আব্দুল্লাহ আল রাশেদ/হাকিম মাহি

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়