ঢাকা, রবিবার, ২১ চৈত্র ১৪২৬, ০৫ এপ্রিল ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

কাইজেলিয়ার আত্মকাহিনি

আজমীর আলম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০১-১৪ ৬:১২:১১ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০১-১৫ ৭:০৯:১৬ পিএম

কলেজের প্রধান ফটক দিয়ে প্রায় ৫ শ’ গজ দক্ষিণে এগোচ্ছি একদিন। হঠাৎ একটি আকুতির সুর আমাকে থামিয়ে দিয়ে আহ্বান করলো ‘দাঁড়াও পথিকবর’। না দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। প্রবল উৎসাহে তার বাকি কথাগুলোয় মনোযোগ দিলাম। যা বুঝলাম, প্রচণ্ডরকম স্বর্ণ লোভী মানুষ যদি কখনো হীরার টুকরো পেয়ে যান, তাহলে তার যেরকম অবস্থা হওয়ার কথা। একজন বৃক্ষপ্রেমী ব্যক্তিও কথাগুলো শুনে সেই অনুভূতিটিই প্রকাশ করবেন।

তার আকুলতা, বেঁচে থাকার চরম আকাঙ্ক্ষা আমার অন্তরে নাড়া দিয়ে উঠলো। তিনি আমাকে একটি দায়িত্বও দিয়ে ফেললেন সুযোগ পেয়ে। আমাকে বললেন, ‘যদি তোমরা সঠিক পরিচর্যা না করো, তাহলে অচিরেই আমি নিঃশেষ হয়ে যাব। আমাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব তোমাদেরই।’ কাজেই, আমার কাছে এটি হীরার টুকরোর চেয়েও অধিক মূল্যবান জিনিস মনে হলো।

এতক্ষণ যেটির কথা বললাম, সেটি উত্তরবঙ্গের অক্সফোর্ড খ্যাত কারমাইকেল কলেজের কাইজেলিয়া নামের বৃক্ষের কথা। বিরল প্রজাতির ঔষধি গাছ ‘কাইজেলিয়া’। ইতিহাস জানতে ইচ্ছে হলো, যা জানলাম (সাইনবোর্ডে পরিচিতি অংশে) তাই আজ জানানোর চেষ্টা করছি।

এর বৈজ্ঞানিক নাম Kigelia africana (কাইজেলিয়া আফ্রিকানা)। গোত্র Bignoniaceae। আফ্রিকা মহাদেশের সেনেগালের দক্ষিণাঞ্চলে এর আদি নিবাস। আফ্রিকার বাইরে এ বৃক্ষটির অস্তিত্ব খুব বেশি দেখা যায় না। এশিয়া মহাদেশে এ গাছটির অস্তিত্ব রয়েছে কিনা, তার সঠিক তথ্য জানা যায়নি। বিলুপ্তির পথে থাকা সেই কাইজেলিয়া এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে উত্তরবঙ্গের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ কারমাইকেল কলেজে। 

এটি কলেজ স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সামনে রাস্তার ডান পাশে সগর্বে দাঁড়িয়ে বৃক্ষটি। এর ফল কাঁচা অবস্থায় সবুজ আর পাকলে বাদামি রঙ ধারণ করে। এ ফল বিষাক্ত। এটি প্রক্রিয়াজাত করে আলসার, সিফিলিস, সাপে কাটার ওষুধ, বাত, ছত্রাক দমন, চর্মরোগ, মেয়েদের প্রসাধনী সামগ্রী এমনকি ক্যান্সার রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার হয়।

জানা গেছে, কলেজ প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে ১৯২০ সালে কোনো এক বৃক্ষপ্রেমী কাইজেলিয়ার দুটি চারা রোপণ করেন। সে হিসেবে গাছটির বর্তমান বয়স ১০০ বছর। শতবর্ষী এই গাছ দুটির বর্তমান উচ্চতা ২০-২৫ মিটার। প্রতিদিন অনেকেই এই বৃক্ষের দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। এটিই হয়ে উঠেছে কারমাইকেল কলেজের অন্যতম দর্শনীয় বস্তু। কিন্তু সবাই কি ভাবে একে বাঁচিয়ে রাখতে হবে? নাকি একবার এর ওপর চোখ বুলিয়ে মনের খোরাক মিটিয়ে চলে যাবেন। না, সবাই তা ভাবে না।

মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া সেই বিলুপ্ত কাইজেলিয়ার পরাগায়ন প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল হওয়ায় এতদিন চারা উৎপাদন করা যায়নি। কিন্তু জটিল কাজকে সহজ করে বিলুপ্তপ্রায় এ বৃক্ষের চারা উৎপাদন করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন কারমাইকেল কলেজের বাগান মালি বাটুল সিং।

কাইজেলিয়াকে এশিয়ার বুকে বাঁচিয়ে রাখতে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশীয় সনাতন পদ্ধতিতে কলেজের বাগান মালি বাটুল সিং এর চারা উৎপাদনের চেষ্টা করে গেছেন। অবশেষে, ২০১৬ সালের শেষ দিকে তিনি বেশ কয়েকটি চারা উৎপাদনে সক্ষম হন। বাটুল সিংয়ের স্বপ্ন- নিজ হাতে দেশের প্রতিটি জেলায় এবং ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোতে অন্তত একটি করে কাইজেলিয়ার চারা রোপণ করে বিলুপ্তপ্রায় বৃক্ষটিকে বাঁচিয়ে রাখবেন।

এদিকে বাটুল সিংয়ের আগে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কারমাইকেল কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের একদল কৃষি বিজ্ঞানী টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে বিলুপ্ত কাইজেলিয়ার বেশ কয়েকটি চারা উদ্ভাবন করেছিলেন। কিন্তু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহে সেই চারাগুলো রোপণ করলেও বাঁচাতে পারেননি। কিন্তু বাটুল সিং প্রায় অসম্ভব এ কাজটি সম্ভব করেছেন। কারমাইকেল কলেজের মালি বাটুল সিংয়ের উৎপাদিত চারা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও লাগানো হয়েছে।

বিলুপ্তপ্রায় এ কাইজেলিয়া বৃক্ষের নামানুসারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি প্রতিশ্রুতিশীল সংগঠন ‘কারমাইকেল কাইজেলিয়া শিক্ষা-সংস্কৃতি সংসদ’ (কাকাশিস)। এছাড়াও প্রতিনিয়ত দর্শক সমাগমসহ বৃক্ষপ্রেমী, সাহিত্যপ্রেমীদের আড্ডায় মুখরিত থাকে এর চারপাশ।

রংপুর সরকারি কলেজে স্নাতক পর্যায়ে অধ্যায়নরত এক শিক্ষার্থী দেখতে এসেছেন কাইজেলিয়াকে। জিজ্ঞাসা করলাম, এই বৃক্ষ দেখতে আসার কারণ কী? তার সাহিত্যিক জবাব, ‘বিলুপ্ত হওয়ার পথে এই মূল্যবান বৃক্ষ। পাশাপাশি ঐতিহাসিক, এই বিদ্যাপীঠের শতবর্ষের ইতিহাস এই বৃক্ষের জানা। তাই ইচ্ছে হলো এর ছায়ার নিচে দু’মিনিট কাটিয়ে আসি, প্রাণ খুলে শ্বাস নেব আর....... (থেমে গেলেন)।’

কতশত প্রাক্তন শিক্ষক-ছাত্রছাত্রী ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে গেছেন, অনেকেই এই পৃথিবী ছেড়েও চলে গেছেন, কিন্তু এই কাইজেলিয়া ক্যাম্পাসের ঐতিহ্য রক্ষা করে দাঁড়িয়ে আছে সগৌরবে। একদিন সময় করে আপনিও দেখে যেতে পারেন ঐতিহাসিক কাইজেলিয়াকে।

লেখক: শিক্ষার্থী, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ, কারমাইকেল কলেজ।

 

রংপুর/হাকিম মাহি

     
 

ট্যাগ :