ঢাকা, শনিবার, ২৭ আষাঢ় ১৪২৭, ১১ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

নবীনরা প্রবীণ হচ্ছেন কোয়ারেন্টাইনে

সাইফুর রহমান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-২০ ৩:২৯:১৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-২০ ৩:২৯:১৪ পিএম

ভর্তিযুদ্ধ শেষ করেই হাজারো স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই আমরা। নতুন ক্যাম্পাস, পরিবেশ ও বন্ধুবান্ধব পেয়ে যেন এক নতুন উদ্যমে পার হয় প্রথম বর্ষ। খুব একটা পড়াশোনার চাপ নেই, অভিভাবকের ডাক নেই এবং ঘুরাঘুরিতেও নেই কোনো বাঁধা। সকাল থেকে সন্ধ্যা যেন আড্ডা-গান, খেলাধুলা ও ঘুরাঘুরিতে কেটে যায় দিন। আর এভাবে দিনের পর দিন শত শত স্মৃতির সাক্ষী হয় এ বর্ষটি।

কলেজের সীমানা পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে মাত্র পা রেখেছে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা। কয়েক দিন ক্লাস করতে না করতেই চলে এলো মহামারি। বন্ধ ক্লাসরুম, বন্ধ বিশ্ববিদ্যালয়। বন্ধ হৈ-হুল্লোড়, চায়ের আড্ডা, ঘুরাঘুরি এবং বন্ধ রয়েছে অচেনাকে চেনা ও অজানাকে জানা। সব কিছু আটকে গেছে চার দেয়ালের মাঝে। সময় পার হচ্ছে কোয়ারান্টাইনের দিন গুনে। যেন সেখানেই প্রবীণ হচ্ছেন এই নবীন শিক্ষার্থীরা।

ক্যাম্পাস জীবনে প্রথম বর্ষ সবচেয়ে স্মরণীয়। বছরটি ঘিরে থাকে হাজার হাজার মধুর স্মৃতি। কিন্তু এ বছর যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন, তারা প্রায় আড়াই মাস ক্লাস করেছেন। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে তাও হয়নি। স্মৃতির ডায়েরি ভারী হওয়ার আগেই নবীনরা ফিরেছেন বাড়ি। ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং বিভিন্ন বিতর্ক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোতে মাত্র যোগ দিয়েছেন তারা। পরিকল্পনা ছিল হাজারো, হলোনা তেমন কিছুই। প্রাক্তনদের স্মৃতিচারণে প্রথম বর্ষের খুনসুটির নানা গল্প বলেন না, হয়তো এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন।

করোনার থাবায় থেমে গেছে নবীনদের নতুন ক্যাম্পাস ও প্রথম বর্ষ ঘিরে বিভিন্ন পরিকল্পনা। সেসব নিয়ে কথা হয় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীর সঙ্গে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনফরমেশন অ্যান্ড লাইব্রেরি সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী রাজিয়া সুলতানা পারুল। ক্যাম্পাসের প্রতি প্রত্যাশা নিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘ কয়েক মাস কঠোর পরিশ্রমের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে পা রেখেছি। ক্যাম্পাস নিয়ে ছিল নানা জল্পনা-কল্পনা। আত্মউন্নয়নের লক্ষ্যে যোগ দিয়েছি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ও সামাজিক সংগঠনে। নতুন ক্যাম্পাস, পরিবেশ ও নতুন মানুষের সাথে যাত্রাটা শুরু হয়েছিল কাঙ্ক্ষিত পথেই। কিন্তু করোনা মহামারি আমাদের ঘরে আটকে রেখেছে। প্রায় ২ মাস হয়ে গেল ক্যাম্পাস ছেড়েছি। নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার প্রতিযোগিতায় কখনো চায়ের কাপে, কখনো পশ্চিমপাড়ার পিঠাপুরীতে কিংবা টুকিটাকির চত্বরের গানের আসরে নিজের প্রত্যাশিত আনন্দগুলোকে খুঁজে বেড়াতাম। এখন সব বন্ধ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী জাকারিয়া মোহাম্মদ। বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে তার নানা জল্পনা-কল্পনা নিয়ে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে আড্ডা-গান, ঘুরাঘুরি আর আনন্দ করার উপযুক্ত সময় হচ্ছে প্রথম বর্ষ। এরপর থেকে আস্তে আস্তে চাপ বাড়তে থাকবে। জীবন থেকে হাসি-আড্ডা ও আনন্দ কমে যাবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতে না ঢুকতেই যেন সব আনন্দ ফুরিয়ে এসেছে। নতুন ক্যাম্পাসে গিয়ে ক্যাম্পাসটা ভালো করে চেনাই হলো না মহামারি করোনার কারণে। নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়ানোর আগেই বাড়িতে চলে আসতে হলো। নববর্ষ, মুজিববর্ষ ও রমজান মাস নিয়ে হয়তো অনেকের অনেক পরিকল্পনা ছিল। করোনার আঘাতে সব পরিকল্পনা তাসের ঘরের মতো ভেঙে গেলো।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সুমাইয়া নিশাত। প্রথম বর্ষ নিয়ে আক্ষেপ আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবশ্যই আক্ষেপ আছে। আমাদের এখনো পরিচয়পর্বই শেষ হয়নি। এর আগেই ক্যাম্পাস বন্ধ হয়ে গেছে। মাত্র এক সপ্তাহে ক্যাম্পাসে যে মুহূর্তগুলো তৈরি হয়েছিল, তা দেখে মনে হচ্ছে বাকি দিনগুলো কতো সোনালি-ই না হতো! যাক, তবুও বাঁচার আশায় বাসায় ফেরা। কবে পরিস্থিতি ঠিক হবে, কবে যে প্রাণের ক্যাম্পাসে ফিরে যাবো! আবারও ঘুরবো, আড্ডা দেবো সেই অপেক্ষায় শুধু প্রহর গুনি।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী জাহিদ সরকার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় জীবন উপভোগ করা প্রত্যেকের শিক্ষা জীবনের একটি অন্যতম স্বপ্ন। ভাগ্যক্রমে সেই স্বপ্নকে আমরা ছুঁতে পেরেছিলাম। তবে এখন পর্যন্ত খুব বেশিদিন উপভোগ করতে পারিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে নবীনদের জন্য সবকিছুই আনন্দময় থাকে। প্রথম বর্ষে সকলেই নিজের সবটুকু দিয়ে সেই আনন্দ উপভোগ করতে চায়। বড়দের ভালোবাসা, ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণ ঘুরে ঘুরে দেখা, নতুন নতুন বন্ধু তৈরি, বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করা শুরু করেছিলাম মাত্রই। পহেলা বৈশাখে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন যেন একেকটা শিক্ষার্থীদের জীবনে অনন্য এক আনন্দময় মুহূর্ত। কিন্তু সেই আনন্দ থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি। করোনা আমাদের গৃহবন্দি করে রেখেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ছৈয়দ মওলা। তিনি বলেন, নতুন ক্যাম্পাসে এসে আড্ডা-গানে যাত্রা শুরু করি। পড়াশোনাটা আসল হলেও আত্মউন্নয়ন, ঘুরাঘুরি ও বিনোদনের একটা বড় অধ্যায় জড়িত প্রথম বর্ষের সঙ্গে। সবাই বলে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রথম বর্ষই উপভোগ করার শ্রেষ্ঠ সময়। কিন্তু আফসোসের বিষয়, প্রথম বর্ষেই আমরা পড়ে গেলাম করোনাজনিত হোম কোয়ারান্টাইনে। নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিল। ব্যক্তিগতভাবে সাহিত্য, ছবি, গান ও বিতর্কের প্রতি প্রবল ঝোঁক থাকায় যুক্ত হয়েছি নানা সংগঠনের সাথে। তাছাড়া নিয়মিত টিএসসির গানের আসর, মলচত্বরের আড্ডা তো ছিলোই। কিন্তু মহামারির প্রভাবে সবকিছু হঠাৎ থমকে যায়।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ফারজানা ববি সীমা বলেন, পরিবার থেকে দূরে গেছি। নতুন জায়গা ও পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে শিখছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বমুখী চিন্তা ভাবনার সাথে পরিচিত হতে শুরু করেছি মাত্র। বন্ধুবান্ধব ও সিনিয়রদের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা দিন দিন বেড়ে চলছিল। ছোটবেলা থেকেই চিত্র আঁকার প্রতি একটা ঝোঁক আছে আমার। তাই ক্যাম্পাসে এসেই চিত্রাঙ্কনের একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হই। ধীরে ধীরে ক্যাম্পাসের আলো-বাতাসের প্রতি মায়া জন্মেছিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের আক্রমণে বাধাগ্রস্ত প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা। অল্প কয়েক দিনের সেই সুখকর স্মৃতি বড্ড মনে পড়ছে। পৃথিবী সুস্থ হলে আবার ঘুরাঘুরি হবে, জমিয়ে গান-আড্ডায় মেতে ওঠবো সবাই। ফিরে পাবো স্বাভাবিক ক্যাম্পাস, স্বাভাবিক জীবন।

লেখক: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

 

রাবি/হাকিম মাহি