ঢাকা, সোমবার, ২৯ আষাঢ় ১৪২৭, ১৩ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:
ছোট গল্প

এ কেমন প্রতিদান!

আবদুর রহমান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-২৫ ২:০৫:১৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-২৫ ২:০৫:১৭ পিএম

বাপ আমার। আমারে নিয়া যা। এত বড় বাড়িতে একা একা থাকতে পারবো নারে। তোদের কোনো কষ্ট দেবো না। নিজের মতো করে তোদের ওখানে এক কোণে পড়ে থাকবো। বাবার করুণ আকুতি শুনে ছেলে রফিক বলেছিল, ছয় মাস পর তোমাকে নিয়ে যাবো।

বাবা করিম মিয়া জানেন তার ছেলের বউয়ের কাছে এই অসুস্থ শরীর সহ্য হবে না। রফিক কোনো দিনও নেবে না। বউয়ের কথা মতো চলে একদম। বাধ্য হয়ে করিম মিয়া রফিককে বলেন, আমাকে অন্তত বৃদ্ধাশ্রমে রেখে যা। বুড়ো বয়সে এই অসুস্থ শরীর একা সামলাতে পারি নারে বাবা। রফিক নিজের সন্মান বাঁচাতে বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমেও রাখলো না। ওষুধ খরচ আর খাওয়া খরচ বাবদ বাবার হাতে হাজার পঞ্চাশেক টাকা দিয়ে বউ-বাচ্চা নিয়ে বিদেশের উদ্দেশে পাড়ি দিল রফিক।

করিম মিয়ার একমাত্র সন্তান রফিক। ছোটবেলায় তার মা মারা যান। ভ্যান চালক করিম মিয়া মা হারা ছেলেকে অনেক কষ্টে বড় করেছেন। নিজে না খেয়ে ছেলেকে খাইয়েছেন। ছেলেকে পড়াশোনা করিয়েছেন। পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল রফিক। স্কলারশিপ পেয়ে আমেরিকায় উচ্চ শিক্ষার জন্য গিয়েছে রফিক। আমেরিকান মেয়ের পাল্লায় পড়ে তাকে বিয়ে করে নেয় রফিক। সেখানেই  চাকরি করছে। বাবাকে দেখার জন্য দেশে আসার কোনো নাম নেই। বয়স হয়েছে করিম মিয়ার। বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষের বিভিন্ন রোগ ব্যাধি দেখা দেয়, তাই হয়েছে তার। করিম মিয়ার সাথে কিছুদিন পর পর ফোনে কথা হতো। আর মাসে মাসে টাকা পাঠাতো। বিয়ে করার আগে প্রতিদিনই কথা হতো। বিয়ের পর কেমন যেন দূরে সরে যাচ্ছে রফিক।

সাপ্তাহ খানেক হলো দেশে আসলো রফিক কোনো একটা দরকারে। বউ-বাচ্চাকে নিয়েই আসছে। বিদেশি মেয়ের গ্রামের এই বাড়িটি সহ্য হবে না ভেবেই শহরে একটা বড় হোটেলে উঠছে। গ্রামে বাবার কাছে একাই এলো রফিক বাবাকে দেখতে। রফিককে দেখে বাবা তো খুশিতে উৎফুল্ল। আজি নাকি চলে যাবে বিদেশে। শুনে সঙ্গে সঙ্গে খুশি হারিয়ে গেলো। এত বছর পর এসেও একটা দিনও থাকলো না বাবার কাছে। যাওয়ার আগে বাবার কোনো আকুতিই শুনলো না। টাকাগুলো দিয়ে আর করিম মিয়ার সেবা করার জন্য একটা লোক ঠিক করে দিয়ে চলে গেলো।

করিম মিয়া এই পৃথিবীতে একা। কেউ নাই তার। ছেলে থেকেও নাই।  একমাত্র ছেলের কথা চিন্তা করেই ছেলের অশান্তি হবে ভেবেই দ্বিতীয় বিয়েটাও করলো না। আর ছেলেই বাবাকে অশান্তিতে রেখে চলে যাচ্ছে। কাঁদছে খুব কাঁদছে এই তার সারাজীবনের কষ্টের প্রতিদান! মানুষের হৃদয়ে আঘাত অত্যধিক হলে মানুষ খুব কাঁদে।

একমাস যেতে না যেতেই খাওয়া, ওষুধ খরচ, টুকিটাকি খরচ আর সেবা করার লোকটার বেতন দিতেই প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা শেষ। হাতে আর মাত্র হাজার চারেক টাকা আছে। টাকা শেষ দেখে সেবা করার লোকটাও চলে গেল। এদিকে ছেলেকে দিনের পর দিন ফোন দিয়ে যাচ্ছে। ফোন ধরে না। বারবার ফোন দেওয়ার পর একবার ধরলেও রফিক ব্যস্ত বলে কেটে দেয়।

অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই করিম মিয়ার বাড়িতে রান্না হয় না। হোটেলের ছেলেটাকে কিছু টাকা বাড়িয়ে দিলেই খাবার প্রতিদিন ডেলিভারি দিয়ে যায়‌। আজ সে আসবে টাকা নিতে। ওষুধ কিনার খরচ বাদ দিলে আরো পনেরো-বিশ দিনের খাবারের টাকা দিতে পারবো। ছেলেটাকে টাকা না দিলে আগামী কাল থেকে আর খাবার দেবে না। রফিক টাকা পাঠালে না হয় ওষধ কিনে নেবো‌। এই ভেবে বাকি চার হাজার টাকা খাবার ডেলিভারি বয়কে দিয়ে দিলো।

প্রতিদিনের মতো আজও খাওয়ার আগে করিম মিয়া ছেলেকে ফোন দেয়। ফোন ধরে না রফিক। শুধু জানতে চাইতো ছেলে খেয়েছে কিনা। ছোটবেলায় যে ছেলে না খেলে করিম মিয়া খেতো না। ফোন ধরলে অন্তত খাওয়ার মধ্যেও শান্তি পেতো করিম মিয়া। ভাবলেন ছেলের বউকে ফোন দিলে ধরবে হয়তো। কিন্তু না সেই একি ব্যাপার কেউ ফোন ধরে না। ১৫ দিন শেষ হয়ে এলো‌। ছেলের এত টাকা-পয়সা থাকা সত্ত্বেও দুদিন পর কি তাহলে না খেয়ে মরতে হবে?  দুশ্চিন্তায় একাধারে ফোন দিতেই থাকলেন। কোনো সাড়া শব্দ পেলো না।

পরেনো দিন পেরিয়ে আজ ষোলো দিনে পড়লো। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। খাবার ডেলিভারি দেওয়ার ছেলেটা এলো না। করিম মিয়া ভেবেছিল তার এই করুন অবস্থা দেখে ডেলিভারি ছেলেটা কিছু খাবার দিয়ে যাবে। কিন্তু তা হলো না। এই শহরের মানুষ খুব টাকা প্রেমী। যতক্ষণ টাকা আছে ততক্ষণে পাশে আছে।

প্রেসারের ওষুধ খাওয়া হয় না অনেক দিন থেকে। প্রেসার বেড়ে গেছে মনে হচ্ছে। এইভাবে যদি মরণ হয় তবে হোক। মা হারা ছেলেকে নিজের সর্বস্ব দিয়ে বড় করেছি। এই পুরস্কার তো আমার প্রাপ্য পুরস্কারই। খোদার কাছে প্রার্থনা, এমন সন্তান যেন কারো না হয়। ভাবতে লাগলো বিড়বিড় করে বলতে লাগলো করিম মিয়া।

খাবার ছাড়া অনেক দিন পার হয়ে গেছে। এই সময় নিজের অজান্তেই কথা বলতে থাকেন করিম মিয়া‌। রফিকের যখন তিনবছর বয়স, তখন তুমি চলে গেছিলা আমাকে একা করে। তখন অসময়ে চলে গেছিলা বলে তোমাকে ক্ষমা করতে পারিনি। আজ কিন্তু তুমি ঠিক সময়ে এসেছো। নিয়ে যাও আমাকে। নির্জন রাত। কেউ শুনে না তার কথা। এমনভাবে কথা বলছে যেন তার সামনে রফিকের মা এসে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু বলেই যাচ্ছে নিয়ে যাও। সাথে নিয়ে চলো, সাথে নিয়ে চলো। চলো।

আমেরিকায় আজ ঈদের দিন। কিন্তু আকাশটা খুব মেঘ করছে‌। এই মেঘলা আকাশ দেখে রফিকের বাবার কথা মনে পড়ছে। ছোটবেলায় আকাশ মেঘ করলেই বাবা রফিককে বাইরে যেতে দিতো না। বৃষ্টি আসবে বলে বাবা তাকে আগলে রাখতো। আজ হয়তো বৃষ্টি হবে। আকাশে মেঘ ঘনকালো হয়ে গেছে। বাবা বলতেন এমন মেঘলাময় আকাশ দেখলে বাইরে বের হতে নেই। মেঘলা আকাশ বাবার খুব অপছন্দ। এমন দিনেই নাকি মা মারা গেছেন। কল্পনা করতে লাগলো বাবার কথাগুলো। আজ তার খুব মনে পড়ছে বাবার কথা।

হঠাৎ মনে হলো ছয় মাস হয়ে গেলো বাবা আর ফোন দিয়ে বিরক্ত করে না। আজ রফিক ফোন দিলো। ফোন ঢুকলো না দেখে চিন্তিত হয়ে বারবার ফোন দিলো। কোনো লাভ হয়নি। অপর পাশ থেকে সাউন্ড আসে আপনি যে নাম্বারে কল দিয়েছেন সেটি এই মুহূর্তে বন্ধ আছে। রফিকের টেনশন গভীর হতে লাগলো‌। বাবার জন্য যেন একদম ভেঙে পড়লো এখন। মানুষ কাছে থাকলে গড়ে তোলে দূরত্ব, হারিয়ে গেলে তবেই বোঝে গুরুত্ব।

পরের দিন সকালে প্রথম ফ্লাইটে ঢাকায় ফিরে। বাংলাদেশে আজ ঈদের দিন। রাস্তায় জ্যাম নেই। কিছু কিছু মানুষ দেখা যাচ্ছে। কুশলাদি বিনিময়ে মানুষদের মুখে হাসি ফুটেছে। চারিদিকে শুধু খুশির আমেজ। বাংলাদেশের আকাশটা আজ মেঘলা নেই। তবুও রফিকের কাছে মেঘলা মনে হচ্ছে। যেন এখনি ঝেড়ে বৃষ্টি নামবে। খুব অন্ধকার নেমে আসছে। বাবার সাথে খুব অন্যায় করেছে। ভাবতে থাকে। ভাবতে ভাবতে গাড়ি চলে আসলো বাবার ভিটে-বাড়ির সামনে।

দরজা বন্ধ। দরজায় কড়া নাড়তেই কোনো সাড়া শব্দ পাচ্ছে না। বারবার দরজা ধাক্কাতেই থাকে দরজা খুললো না কেউ। চিৎকার চেঁচামেচিতে পাড়া প্রতিবেশী জড়ো হলো। রফিক থানায় ফোন করলো। কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকেই হতভম্ব! যা দেখলো, রফিক, পুলিশ কেউই এমন কল্পনাও করতে পারেনি। বাবার বেডরুমের বিছানায় পড়ে আছে একটি কঙ্কাল। হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল রফিক। কাঁদে পাড়া প্রতিবেশী। কাঁদে ঐ মেঘলা আকাশও।

লেখক: শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ। দত্তপাড়া কলেজ।


লক্ষ্মীপুর/হাকিম মাহি