ঢাকা, বুধবার, ৩ আশ্বিন ১৪২৬, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

বিশ্বকাপ ১৯৯২ : যে বছর বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল পাকিস্তান

সাইফ মুহাম্মাদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৫-২২ ১০:২৮:৩৮ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৫-২২ ১১:১৯:২৪ এএম
বিশ্বকাপ ১৯৯২ : যে বছর বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল পাকিস্তান
Walton E-plaza

সাইফ মুহাম্মাদ : দিন তারিখের হিসেব ফুরিয়ে আর মাত্র কয়েক দিন পরেই মাঠে গড়াবে আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০১৯। অংশগ্রহণকারী দশ দলের বেশ কয়েকটি এর মধ্যেই পা রেখেছে আয়োজক ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের মাটিতে। নতুন বিশ্বকাপে উন্মাদনায় ভেসে যাওয়ার আগে একবার ফিরে তাকানো যাক ১৯৯২ বিশ্বকাপের দিকে।

অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হওয়া সে বিশ্বকাপে বিশ্বকে চমকে দিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় আগের তিন আসরের সেমিফাইনালিস্ট পাকিস্তান। ওই আসর দিয়েই বিশ্বকাপে রঙিন পোশাক ও সাদা বলে খেলার নতুন ইতিহাস তৈরি হয়। ওই আসর দিয়েই বিশ্বকাপ জিতে ক্যারিয়ার শেষ করেন ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম দুই তারকা জাভেদ মিয়ানদাদ ও ইমরান খান। এ দুজন আবার তখন পর্যন্ত সব বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করা সর্বশেষ দুই ক্রিকেটার ছিলেন। অর্থাৎ ১৯৭৫ থেকে ১৯৯২, প্রতিটি আসরেই খেলেছেন এ দুই পাকিস্তানি ক্রিকেটার। এমন কীর্তি আর কারো নেই।

পাকিস্তানের চ্যাম্পিয়ন হওয়া যতোটা বিস্ময়কর ছিল, তার চেয়ে কম বিস্ময়কর ছিল না প্রথম ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের কাছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার হার। সেটাও ছিল আসরের প্রথম ম্যাচে। কে জানে কী চিন্তা করে প্রথম ম্যাচেই দুই আয়োজক দেশকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে দিয়েছিল আইসিসি! আসরের প্রথম ম্যাচটা নিউজিল্যান্ড জিতে নেয় ৩৭ রানে। কিউইদের হয়ে দারুণ এক সেঞ্চুরি করেন মার্টিন ক্রো। এর আগে ম্যাচের প্রথম বৈধ বলেই অস্ট্রেলিয়ান ওপেনার জন রাইটকে ফেরান ক্রেইগ ম্যাকডরমেট। ম্যাচের প্রথম বৈধ বলটাই যেনো লিখে দিয়েছিল পুরো ম্যাচের নিয়তি। একই সাথে তা যেনো অস্ট্রেলিয়ার শিরোপা হারাতে বসার ইঙ্গিতও।

১৯৯২ সালের বিশ্বকাপ স্মরণীয় হয়ে আছে আসরের ফরম্যাটের কারণেও। রাউন্ড-রবিন ফরম্যাটে আট দলের অংশগ্রহণের বিশ্বকাপের প্রাথমিক সূচি নির্ধারণ করা হয়। পরে অবশ্য সূচিতে অদলবদল করতে হয় দক্ষিণ আফ্রিকার অংশগ্রহণের কারণে। দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপ দিয়ে আবার মূল ধারার ক্রিকেটে ফেরে প্রোটিয়ারা। পরে রাউন্ড-রবিন লিগ পদ্ধতিতে নয় দলের বিশ্বকাপ আয়োজিত হয়। সেমিফাইনাল ও ফাইনাল বাদে ওই আসরে মোট ৩৬টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। পরে মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত হওয়া ফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২২ রানে হারিয়ে শিরোপা জেতে ইমরান খানের পাকিস্তান।



পাকিস্তানের দারুণ ইতিহাস রচনার আসরে ওয়াসিম আকরাম ছিলেন তাদের মূল শক্তি। আসরের ১০ ম্যাচে ১৮টি উইকেট নেন তিনি। এ ছাড়া একটি ম্যাচে চার উইকেটও নেন ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই বাঁহাতি পেসার। ওয়াসিম আকরামই ছিলেন ওই আসরের সেরা বোলার। ১৬টি উইকেট নিয়ে তার পরে ছিলেন ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি অলরাউন্ডার ইয়ান বোথাম। ব্যাট হাতে পাকিস্তানের ত্রাতা ছিলেন জাভেদ মিয়ানদাদ। পাকিস্তান ক্রিকেটের ‘বড়ে মিয়া’ ৯ ম্যাচে ৪৩৭ রান করেন। তার চেয়ে বেশি রান করেছিলেন কেবল মার্টিন ক্রো। তার সংগ্রহ ছিল ৪৫৬ রান।

আসরসেরার মুকুট নিয়ে দেশে ফিরলেও লিগ পর্যায়ের ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে হেরে যায় পাকিস্তান। ম্যাচটি ছিল বিশ্বকাপে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত-পাকিস্তানের প্রথম লড়াই। ১৯৯২ সাল থেকে শুরু করে যতোবার বিশ্বকাপে এই দুই দল মুখোমুখি হয়েছে, ভারত ততোবারই ম্যাচ জিতে মাঠ ছেড়েছে। বিশ্বকাপে এই দুই দলের লড়াই মানেই এখন ভারতের নিশ্চিত বিজয়।

সেই ম্যাচে হাফ সেঞ্চুরির পাশাপাশি একটি উইকেটও নেন শচিন টেন্ডুলকার। কে জানতো, সেই শচিনই একদিন বিশ্ব ক্রিকেটের মহীরুহ হয়ে উঠবেন! কে-ই বা জানতো, সেই শচিনেরই একটা বিশ্বকাপ জেতার জন্য প্রায় অনিশ্বেষ অপেক্ষায় থাকতে হবে? সেই অপেক্ষার অবশ্য অবসান হয়েছে ২০১১ সালে, যখন ফাইনালে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে নিজেদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিতে ভারত।

পাকিস্তানের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বাইরে যে ঘটনাগুলো ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপের ‘ট্রেড মার্ক’ হয়ে আছে, তার মধ্যে আছে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার জয়। বহুদিন পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরেই ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দেয় তারা। পরে আসরের সেমিফাইনালেও পা রাখে প্রোটিয়ারা। দক্ষিণ আফ্রিকান দর্শকদের কাছে তাদের দলের এ রকম পারফর্ম্যান্স মোটেও প্রত্যাশিত ছিল না। নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপে ওই রকম প্রত্যাশার চেয়ে বেশি পারফর্ম করা দক্ষিণ আফ্রিকা কেনো যে এখন পর্যন্ত কোনো বিশ্বকাপ জিততে পারল না, তা এক বড় বিস্ময়।



পাকিস্তানের বিপক্ষে ব্রায়ান লারার ৮৮ রানের ঝলমলে ইনিংসটিও ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় ব্যাটিং হয়ে আছে। বৃষ্টিবিঘ্নিত সেই ম্যাচটি ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতে যায় ১০ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ওইভাবে হারলেও শেষ পর্যন্ত আসর শেষের হাসি অবশ্য পাকিস্তানেরই ছিল।

১৯৯২ সালের বিশ্বকাপের অন্যতম কাঙ্খিত ম্যাচ ছিল ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার লড়াই। যে লড়াইয়ে ইয়ান বোথামের দারুণ বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়াকে হারায় ইংলিশরা। ওই ম্যাচে ৩১ রানে চার উইকেট নেন বোথাম। তার বোলিংয়ে ভর করে অস্ট্রেলিয়াকে ১৭১ রানে আটকে রাখে ইংলিশরা। পরে লড়াকু এক হাফ সেঞ্চুরি করে নিজ দলের জয় নিশ্চিত করেন বোথাম।

১৯৯২ সালের বর্ণিল বিশ্বকাপ আরো নানা কারণে স্মরণীয় হয়ে আছে ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে। কিন্তু সব কারণের চেয়ে বড় কারণ নিশ্চয়ই পাকিস্তানের শিরোপা জয়। কদিন বাদে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপেও পাকিস্তানের কাছে অনেকে চমকের আশা করছেন। যদিও সাম্প্রতিক বাস্তবতা বলছে, পাকিস্তানের সে রকম চমক দেখানোর সম্ভাবনা প্রায় নেই-ই। বিশ্বকাপের ঠিক আগে ইংল্যান্ডের সাথে ৪-০ ব্যবধানে সিরিজ হেরেছে তারা। এই ফলাফল নিঃসন্দেহে তাদের সমর্থকদের বিশ্বকাপের ফল নিয়ে সন্দিহান করে তুলেছে।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২২ মে ২০১৯/সাইফ মুহাম্মাদ/আমিনুল

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন