ঢাকা, রবিবার, ৩ কার্তিক ১৪২৬, ২০ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:
দার্জিলিংয়ের পথে-১

সড়ক পথে ঢাকা থেকে শিলিগুড়ি

উদয় হাকিম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৫-১৩ ৮:৪১:৩০ এএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৫-১৩ ১১:৩৬:৫৮ এএম
দার্জিলিংয়ের হোটেল স্তস্তিতে লেখক ও তার সফরসঙ্গীরা

উদয় হাকিম : ছোটবেলার কথা। তখন গ্রামে অনেক যাত্রা-নাটক হতো। তাতে দেখা যেতো জমিদারের ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনী দার্জিলিংয়ে পড়ে। দার্জিলিংয়ে পড়া মানে জাতে ওঠা। জমিদারী স্ট্যাটাস। শুনতাম বৃটিশ আমলে ইংরেজরা দার্জিলিংয়ে থাকতে পছন্দ করতেন। ইংল্যান্ডের আবহাওয়ার সঙ্গে এর অনেকটা মিল আছে। ঠান্ডা, এই রোদ, এই বৃষ্টি। চা বাগান। ছায়া গাছ। শান্ত সুবোধ পাহাড়ি জনপদ। সুখী, সমৃদ্ধ নির্ভেজাল জীবনযাপন।

শুনেছি ইংরেজ সাহেবরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় থাকলেও তাদের ছেলে-মেয়ে পড়তো দার্জিলিংয়ে। অনেকে স্ত্রীকেও রেখে দিতেন এখানেই। এখানকার শিক্ষার মানও ছিল ভালো। এমনকি বাংলাদেশের অনেক বনেদী পরিবারের সন্তানরাও এখানে লেখাপড়া করেছেন। সংখ্যায় কম হলেও এখনও পড়ছে অনেকেই।

যাই হোক, সেসব শুনে মনের মধ্যে একটা দুর্নিবার ইচ্ছে-দার্জিলিংয়ে যাবো। অবশেষে এলো সেই সুযোগ। করপোরেট ক্রিকেটে এবার ওয়ালটন অপরাজিত চ্যাম্পিয়ান হয়েছে। দেশে প্রথমবারের মতো আয়োজিত ক্রিটেক ক্রিকেট টুর্নামেন্টেও ওয়ালটন চ্যাম্পিয়ন। গেল  বছর চ্যাম্পিয়ন হয়ে পুরো টিম নিয়ে গিয়েছিলাম ভুটান। আমার ইচ্ছে ছিল এবার চ্যাম্পিয়ন হলে দার্জিলিং যাবো, সড়ক পথে।

ভারতে প্রবেশের অনুমতির জন্য লালমনিরহাটের বুড়িমারি বন্দরের ইমিগ্রেশন অফিসের সামনে টুরিস্টদের ভিড়


বিমানে চড়ে বিদেশে গেলে পথের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের কোনো অবকাশ থাকে না। তাই সড়ক পথটাই আমার ভালো লাগে। রাস্তা, দুপাশের সুন্দর প্রকৃতি, নদী, পাহাড়, গাছ, ফুল এসব আমাকে খুব টানে। টিমের সবাই সিদ্ধান্ত নিলাম-এবার সড়ক পথেই দার্জিলিং যাবো। আরেকটা ইচ্ছে ছিল পঞ্চগড় হয়ে বাংলাবান্ধা সীমান্ত দিয়ে যাবো। কারণ এই পঞ্চগড়ে আমার কখনো যাওয়া হয়নি।

১০ মে সন্ধ্যায় রওনা হলাম দার্জিলিংয়ের পথে। শ্যামলী এনআর বাস। কথা ছিল সাড়ে ৬টায় কমলাপুর থেকে বাস ছাড়বে। যারা কল্যাণপুর থেকে উঠবেন তাদের আসতে হবে ৮টার মধ্যে। কাউন্টারে একে একে টিমের সদস্যরা আসছেন। আমার চিন্তা শাকিলকে নিয়ে। গতবার কালাচাঁদপুর থেকে এয়ারপোর্টে গিয়েছিল সবার পরে। বিমান ছাড়ার ৩০ মিনিট আগে। অথচ তার বাসা থেকে এয়ারপোর্ট ৫ মিনিট দূরত্বের। শাকিলকে নিয়ে যখন তুমুল আলোচনা, হাস্যরস, এর মধ্যেই শাকিল এসে হাজির। কালো চেহারায় খুশির ঝিলিক। সে এসে বসলো আলভির সঙ্গে। আমাদের টিমে সবচেয়ে কালো শাকিল, আর সবচেয়ে ধলো আলভি। এ নিয়ে অবশ্য শাকিলেরও কোনো আফসোস নেই। তার নিজের উক্তি-কালো হইলে কি হবে, কাটিন ভালো আছে।

এর মধ্যে উঠলো আলভির কথা। ইমোতে এসএমএস পাঠিয়ে কেউ একজন তার কাছ থেকে ৩ হাজার টাকা বাগিয়ে নিয়েছে। ‘আমি ফিরোজ আলম বলছি। আমার ইমার্জেন্সি ৩ হাজার টাকা দরকার। একটু জলদি পাঠান। এই আমার বিকাশ নম্বর।’ ফিরোজ আলম হেসে কুটি কুটি। আমার নাম বললো আর আপনি টাকা দিয়ে দিলেন? এরকম প্রতারণার কথা আগে কখনো শুনেননি? একবার তো ফোন করে জিজ্ঞেস করতে পারতেন। আলভির ফরসা গাল লজ্জ্বায় নীল হয়ে ওঠে।

গাড়ি আসতে দেরি। শেষ পর্যন্ত রাত ৯টায় গাড়ি ছাড়লো। নবীনগর থেকে গাড়ি সোজা কালামপুর দিয়ে যাচ্ছে মির্জাপুরের দিকে। বাসে মোট যাত্রী ২৭ জন। আর ১৫ জনই আমরা। এই সুযোগে জমলো আড্ডা। এর মধ্যে নুরুল আফসার চৌধুরী (কথায় কথায় ‘ইয়া’ বলে, তাই তার নাম দিয়েছি ইয়া চৌধুরী) শোনালো আরেক কাহিনি। ক্রিকেট টিমের সঙ্গে ইয়া চৌধুরী ইন্ডিয়া যাচ্ছে। এই খবর বন্ধু-বান্ধবরা জেনে গেছে। এর মধ্যে একান ওকান হয়ে রটে গেছে আইপিএল খেলতে নুরুল ইন্ডিয়া যাচ্ছে।

টাঙ্গাইল শহরের একটু আগে এসে জ্যামে পড়লাম। খেয়ে দিল প্রায় দুই ঘণ্টা। রাত আড়াইটায় গিয়ে পৌঁছলাম যমুনায়, বঙ্গবন্ধু সেতুতে। তখন অনলাইনে লাইভ দেখছিলাম বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের উৎক্ষেপণ। কাউন্ট ডাউন করে যখন আকাশে উড়ে গেল কৃত্রিম উপগ্রহ, ঠিক তখনই বঙ্গবন্ধু সেতুতে ওঠলাম। সেতুর দুপাড়ে আলো জ্বলছে। আলো জ্বলছে লাইট পোস্টে। অন্য এক নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হলো মহাকাশ!

রাত তিনটে দশে গিয়ে বাস থামল সিরাজগঞ্জে, ফুড গার্ডেনে। আধা ঘণ্টার বিরতি দিয়ে বাস চলতে শুরু করলো। কিন্তু গাইবান্ধা, বগুড়াতে গিয়ে পড়লাম জ্যামে। ঢাকার জ্যাম এখন সারা দেশেই। শিগগিরই মহাপরিকল্পনা নিয়ে নতুন রাস্তা না বানালে এই অচলায়তন ভাঙবে না।

কথা ছিল ভোরবেলা চ্যাংড়াবান্ধা পৌঁছব। তা আর হলো না। বগুড়াতেই সকাল হলো। তিস্তা সেতু পার হয়ে বায়ে মোড় নিয়ে সোজা যাচ্ছি উত্তর দিকে। এলাকাটা চরাঞ্চল। ব্যাপক ভুট্টার চাষ হয়। নিখাঁদ গ্রাম।

কিন্তু আমার মন খারাপ হলো অন্য কারণে। ভেবেছিলাম বাংলাবান্ধা দিয়ে যাচ্ছি। পঞ্চগড় দেখা হবে। সে আর হলো কই। পাসপোর্টে চ্যাংড়াবান্ধা পোর্ট উল্লেখ ছিল। ভেবেছি বাংলাবান্ধার বিপরীতে ভারতের চ্যাংড়াবান্ধা। পরে জানলাম, লালমনিরহাটের বুড়িমারির বিপরীতে চ্যাংড়াবান্ধা। যাক, তবু নতুন একটা পোর্ট তো দেখা হলো। আসলে আমি কখনো স্থলবন্দর পার হয়ে বিদেশ যাইনি। এই প্রথম।

বেলা পৌনে ১২টায় পৌঁছলাম পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারি বন্দরে। চরম অব্যবস্থাপনা পুরো এলাকা জুড়ে। ইমিগ্রেশন অফিস দালালে ভরা। কাজে বিশৃঙ্খলা। বসার জায়গা নেই। দাঁড়ানোর মতো পরিবেশও নেই।

শেষ পর্যন্ত ভোগান্তির এক অধ্যায় শেষ হলো। বাংলাদেশ সীমানা পেরিয়ে প্রবেশ করলাম ভারতে। ভারতীয় অংশে একবার মাত্র চেকিং হলো। শুধু জানতে চাইলো সাথে বাংলা টাকা কত আছে? রুপি আছে কি না? এরপর পাসপোর্ট জমা নিয়ে তারাই সব করে দিল। পাসপোর্টে সিল মেরে হাতে দিয়ে দিল। সব মিলিয়ে পোর্টে সময় লাগল সোয়া দুই ঘণ্টা।

ইমিগ্রেশন অফিসের ভোগান্তি পেরিয়ে ভারতে প্রবেশের পর সফরসঙ্গীর সঙ্গে লেখকের (বায়ে) হাস্যেজ্জ্বল সেলফি


ভালোভাবে ভারতে প্রবেশ করলেও বিপত্তি ঘটল অন্যখানে। কথা ছিল  সীমান্তের এ পাড়ে শ্যামলীর একই রকম গাড়ি থাকবে। সেটি আমাদের নিয়ে যাবে শিলিগুড়ি। কিন্তু বাস নেই। কেন নেই। ১৪ মে পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত নির্বাচন। তাই নাকি বাস রিক্যুজিশন দিয়ে নিয়ে গেছে পুলিশ। হুম, ঘটনা একই। সীমান্তের এপাড় ওপাড় একই সিস্টেম!

ছোট প্রাইভেটকার নিয়ে রওনা হলাম শিলিগুড়ির উদ্দেশ্যে। ১৫ জন চার গাড়িতে। আমাদের চালকের নাম মদুল সওদাগর। মুসলমান। দাদার আমলে ভারতে এসেছিলেন তারা। এখনো বাংলাদেশে তার চাচারা থাকে। চ্যাংড়াবান্ধা পড়েছে কুঁচবিহার জেলায়। শিলিগুড়ি পড়েছে জলপাইগুড়ি জেলায়। চ্যাংড়াবান্ধা থেকে শিলিগুড়ি যেতে সময় লাগে ৩ ঘন্টা। দূরত্ব ৯০ কিলোমিটার। শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং ৬৫ কিলোমিটার।

২০ কিলোমিটার পর এল ময়নাগুড়ি বাইপাস। সেখান থেকে সোজা পশ্চিমে চলছি। আড়াই ঘণ্টা আসার পর হঠাৎ মোবাইলে বাংলাদেশের নেটওয়ার্ক! ঘটনা কি? ড্রাইভার জানালেন, এখানে বাংলাদেশের সীমান্ত খুব কাছে। মাত্র ২ কিলোমিটার। তাই নাকি? তাহলে এখান দিয়ে আমরা আসিনি কেন? এই পোর্টের নাম কি? ফুলবাড়ি। বাংলাদেশ অংশে বাংলাবান্ধা। কপাল! এখান দিয়ে আসলে আড়াই ঘণ্টা  সময় বাঁচতো।

৩ ঘণ্টায় চ্যাংড়াবান্ধা থেকে শিলিগুড়ি পৌঁছলাম। শরীর ক্লান্ত, মন অবসন্ন। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে শিলিগুড়ির সৌন্দর্য্য আমাদের চাঙ্গা করে তোলে। এখানে আমাদের দুপুরের খাবারের কথা হোটেল স্তস্তিতে। সেখানে যেতেই আমাদের ফুলের মালা দিয়ে বরণ করা হলো। অবশেষে শিলিগুড়ি এসে স্বস্তি পেলাম।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ মে ২০১৮/অগাস্টিন সুজন/সাইফ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন