ঢাকা     শুক্রবার   ০৭ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২৩ ১৪২৭ ||  ১৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

রক্ষা করতে হবে মাতৃভাষার মান

1 || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:১৯, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

মহান একুশে ফেব্রুয়ারি। বাংলাদেশের ইতিহাসে গৌরবময় একটি দিন। ভাষার জন্য তথা মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলার অধিকার আদায়ে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে প্রাণ দিয়েছেন সালাম, জব্বার, বরকত, রফিক’ শফিক ও নাম না জানা অনেকে। তাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকার। শ্রদ্ধাবনত চিত্তে আমরা স্মরণ করি ভাষা আন্দোলনের সেই সব শহীদকে।

আজকের এ দিনটি শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পরিচিত। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো বাংলা ভাষা আন্দোলনের প্রতি সম্মান জানিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে সারাবিশ্বে গভীর শ্রদ্ধা ও যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে উদযাপন করা হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। তাই আজ শুধু আমরা নই, সারা বিশ্বই দিনটিকে পালন করছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে।

একুশ মানে মাথা নত না করা, একুশ মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। ভাষার প্রশ্নে একুশের আন্দোলন হলেও প্রকৃত প্রস্তাবে তা ছিল শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিবাদ। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রমনার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাষ্ট্র ভাষা প্রসঙ্গে ঘোষণা করেন, ‘উর্দু অ্যান্ড উর্দু শ্যাল বি দি স্টেট ল্যাংগুয়েজ অব পাকিস্তান’- অর্থাৎ উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা। সঙ্গে সঙ্গে ‘নো, নো’ কণ্ঠে প্রতিবাদ জানায় ছাত্র-জনতা। জিন্নাহকে জানিয়ে দেওয়া হয়, বাঙালি জাতি কখনোই তা মেনে নেবে না। এরপর থেকেই মূলত শুরু হয় ভাষার জন্য সংগ্রাম।

এই সংগ্রাম চরমে পৌছায় ১৯৫২ সালে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি বিক্ষোভ মিছিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তখন প্রশাসন ২০ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৬টায় ঢাকায় শহরে ১৪৪ ধারা ঘোষণা করে। ২১ ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে ছাত্ররা সমবেত হতে থাকেন। কড়া পুলিশি পাহারা থাকার কারণে দশজন দশজন করে শিক্ষার্থীরা বের হতে লাগলো। কিন্তু পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করতে শুরু করে।

এ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় উত্তেজনাও বাড়তে থাকে। জিমনেশিয়াম মাঠে সমবেত ছাত্রদের প্রতি কাঁদানো গ্যাস ছোড়া হয়। এতে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। উত্তেজনাকর পরিস্থিতি চলার মুহূর্তে পুলিশ ছাত্র-জনতার মিছিলে গুলিবর্ষণ করে। রফিক, সালাম, বরকতদের রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ। কিন্তু  তাদের এই আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। আমরা পেয়েছি মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের দ্বিতীয় গণপরিষদে প্রথম সংবিধান প্রণয়ন করে। যেখানে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

বস্তুত: এই একুশের আন্দোলনেই ঘটে বাঙালির আত্মবিকাশ, যার ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিন্ন করে এসেছে মহান স্বাধীনতা। মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার জন্য বিশ্বে আত্মাহুতি দেওয়ার ঘটনা বিরল। এ জন্য জাতি হিসেবে আমরা গর্বিত। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, মাতৃভাষার চর্চা ও বিকাশের ক্ষেত্রে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি, যা ভাষা আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

মাতৃভাষা ছাড়া জ্ঞানচর্চা পূর্ণাঙ্গ হয় না। যদি আমরা নিজেদের আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে দাবি করি, তাহলে সরকারি-বেসরকারি দপ্তরসহ সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনে আমাদের কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ এবং দ্রুততম সময়ে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। রক্ষা করতে হবে মাতৃভাষার মান। ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে মর্যাদার আসনে।


ঢাকা/এনএ/নাসিম 

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন  

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়