ঢাকা, সোমবার, ২২ আষাঢ় ১৪২৭, ০৬ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

ভালো ফল করেও পছন্দের কলেজে ভর্তি অনিশ্চিত

আবু বকর ইয়ামিন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৬-০১ ৯:২৩:৩০ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৬-০১ ৩:৪০:১৮ পিএম

করোনা পরিস্থিতির মধ্যে মাধ্যমিকের ফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের মধ্যে আনন্দের পাশাপাশি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।

সারাদেশে ভালো মানের কলেজে এক লাখের মতো আসন থাকলেও এবার ১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৯৮ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। এজন্য ভালো ফল পেয়েও সেরা কলেজে ভর্তি হওয়া নিয়ে অনেকের মধ্যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশের মানসম্মত কলেজের ৫০ হাজারের মতো আসনের বিপরীতে এ বছর জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৯৮ জন। সেই হিসাবে জিপিএ-৫ পেয়েও ৮০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী প্রথম সারির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পাবে না। অনেকে একাধিকবার আবেদন করেও পছন্দের কলেজে ভর্তি হতে পারে না। আর এদের অধিকাংশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী।

গত কয়েক বছরে অনলাইনে যেসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তির আবেদন বেশি পড়েছে সে হিসেবে মানসম্মত প্রতিষ্ঠান রয়েছে ঢাকা বিভাগে ৭৫টি, রংপুর বিভাগে রয়েছে ৩২টি, বরিশাল বিভাগে ১৪টি, রাজশাহী বিভাগে ৭টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৯টি, খুলনা বিভাগে ১৩টি এবং সিলেট বিভাগে ২৩টি। এসব কলেজে স্ব স্ব বিভাগের জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীরা ভিড় করলে সবার সংস্থান হবে না। এর বাইরে সংশ্লিষ্ট এলাকার সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডের বাইরের অন্য দুই শিক্ষা বোর্ড থেকে শিক্ষার্থীরা ভর্তির আবেদন করবে।

এ অবস্থায় জেলা ও জেলার বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলোর মানোন্নয়নে গুরুত্ব দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা।

জানতে চাইলে শিক্ষানীতি-২০১০ প্রণয়ন কমিটির সদস্য অধ্যাপক একরামুল কবির জানান, গত বছরের তুলনায় এবার জিপিএ ৫ এবং পাসের হার দুটি বেড়েছে। এতে করে শিক্ষার্থীরা ভর্তি নিয়ে একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে পারে। কেননা বেশিরভাগ ভালো রেজাল্টধারী শিক্ষার্থীরা ভালো প্রতিষ্ঠান পছন্দ দিয়ে থাকে।

কয়েক ধাপে আবেদন করেও অনেকে শিক্ষার্থী নিজেদের পছন্দের প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পায় না। এক্ষেত্রে ভালো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সুবিধা মতো বদলির সুযোগ রাখা প্রয়োজন, এতে সেসব প্রতিষ্ঠান মান বাড়বে, শিক্ষার্থীরা সেখানে যেতে আগ্রহী হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, বর্তমানে অনেক কলেজ রয়েছে যেগুলো ভালো সুনাম কুড়িয়েছে। শিক্ষার্থীদের সেগুলোর প্রতি একটুও প্রবণতা বেশি থাকে। তারা সেখানে আবেদন করে। এক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হবে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, যারা জিপিএ-৫ পেয়েছে তাদের বেশিরভাগই শহরের। কারণ তাদের কোচিং-প্রাইভেটের মাধ্যমে সেভাবে তৈরি করা হয়েছে। শহরের স্কুলগুলোতে সুযোগ-সুবিধাও বেশি। তাই তারা ভালো ফলাফল করছে। যার বিপরীত চিত্র রয়েছে গ্রামের স্কুলগুলোতে। সেখানে সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে যে শিক্ষার্থীরা পাস করে আসছে, সেটাই তো অনেক বড় ব্যাপার। একটা গ্রামের ছেলের সঙ্গে শহরের ভালো স্কুলের ছেলের মধ্যে মেধার কোনো পার্থক্য নেই। পার্থক্য হল কেবলই সুযোগ-সুবিধার। তাই এ মেধাবীদের সামনে এগিয়ে নিতে গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক মানোন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

এদিকে আগামী ৭ জুন থেকে একাদশ শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রম শুরু করতে গত ১৭ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে আন্তঃশিক্ষা সমন্বয়ক বোর্ড। ১ মাস ২০ দিন জুড়ে তিনটি ধাপে অনলাইনে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে বলে জানা গেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন দেওয়া হলেও ভর্তি কার্যক্রম শুরু করা হবে।

উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি সংক্রান্ত কমিটির তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সাড়ে ৮ হাজার কলেজে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তিযোগ্য আসন রয়েছে প্রায় ৩০ লাখ। যার মধ্যে মানসম্মত কলেজের সংখ্যা মাত্র পৌনে দু’শ। এসব কলেজে আসন সংখ্যা ৫০ হাজারের কিছু বেশি।

অথচ এবার সাধারণ নয় বোর্ডে পাসের হার ৮৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ ও ১ লাখ ২৩ হাজার ৪৯৭ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭ হাজার ৫১৬ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে  ৪ হাজার  ৮৮৫ জন। মাদরাসা এবং কারিগরির বোর্ডের বড় একটি অংশ উচ্চ মাধ্যমিকে সাধারণ বোর্ডের অধীনে ভর্তি হয়। ফলে কলেজগুলোতে ৯ সাধারণ বোর্ডের বাইরেও প্রায় ৫ হাজারের বেশি আবেদন পড়তে পারে। এর ফলে প্রথম সারির কলেজগুলোতে জিপিএ-৫ পেয়েও ৮০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এতে ভর্তির সুযোগ পাবে না।

রাজধানী ঢাকাতে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়াশোনার জন্য আসন রয়েছে প্রায় ৫০ হাজারের মতো। এর মধ্যে ভালো মানের ২০-২২টি কলেজে আসন রয়েছে ২৫ হাজারের বেশি। বিপরীত দিকে ঢাকা বোর্ডেই এবার পাস করেছে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ। এর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৬ হাজার ৪৭ জন। আবার জিপিএ-৪ থেকে ৫-এর মধ্যে পেয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩৫৫ জন।

সেই হিসেবে ঢাকার বাইরের শিক্ষার্থীদের রাজধানীর প্রতিষ্ঠানসমূহে ভর্তির সুযোগ কতটা থাকবে, তা নিয়েও রয়েছে সংশয়। ফলে ভালো ফলাফলের পর উচ্চ মাধ্যমিকে রাজধানীতে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি থাকবে। একই ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে মাদরাসা বোর্ড থেকে পাস করার শিক্ষার্থীদের জন্যও। সব শিক্ষার্থীর ভর্তির জন্য পর্যাপ্ত আসন থাকলেও প্রথম সারির প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তির সুযোগ পাবে না সবাই।

এ বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক অধ্যাপক হারুন অর রশিদ বলেন, গ্রামের প্রতিষ্ঠানগুলোতে দক্ষ শিক্ষকের অভাব, বিশেষ করে ইংরেজি ও বিজ্ঞান বিষয়ে ভালো শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা শহরের প্রতিষ্ঠানমুখী হয়। ফলে শহরের মানসম্মত প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য ভীড় বাড়ে। তবে এটা সার্বিক চিত্র নয়।

তিনি বলেন, সারাদেশে প্রায় ২০ লাখ কলেজে ভর্তির আসন রয়েছে। তার মধ্যে ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৫২৩ জন পাস করেছে। তাই ভালো ফল পাওয়া সব শিক্ষার্থী পছন্দের কলেজ না পেলেও কেউ ভর্তি থেকে বঞ্চিত হবে না।

তবে আবেদন প্রক্রিয়ার নির্দেশনা ভালোভাবে পড়ার পর কলেজ ভর্তির আবেদন করলে ক্রটিপূর্ণভাবে আবেদন করা সম্ভব হবে বলে সব ভর্তিইচ্ছুকে এ বিষয়ে সর্তক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

 

ইয়ামিন/এসএম