ঢাকা     মঙ্গলবার   ০৪ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ১৯ ১৪২৭ ||  ১৪ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

risingbd-august-banner-970x90

এন্ড্রু বলতো, ‘ভালো, আমি ভালো আছি’

|| রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:৩৮, ৭ জুলাই ২০২০  

একটি দ্বৈত গানে কণ্ঠ দিতে গিয়ে এন্ড্রুর সঙ্গে পরিচয়। সাল ঠিক মনে পড়ছে না; ১৯৭৪ কিংবা ’৭৫ হবে। আলম (আলম খান) ভাইয়ের কোনো একটি গান হবে। গানটির কথাও আজ আর মনে নেই।

যাই হোক, এরপর একের পর এক নতুন গানে একসঙ্গে কণ্ঠ দিয়েছি। কতো গান যে এন্ড্রুর সঙ্গে গেয়েছি হিসাব নেই! কতো শত স্মৃতি আমাদের- আজ সবই এক দিনের ব্যবধানে অতীত হয়ে গেল! 

এন্ড্রু কিশোরের মতো শিল্পী আমরা আর পাবো না। ফিল্মের গানের জন্য এমন নিখুঁত কণ্ঠ আর পাওয়া যাবে না- কখনও না। এই শূন্যস্থান পূরণ হবে না- হবার নয়। আমরা একসঙ্গে দেশ-বিদেশে অনেক অনুষ্ঠান করেছি। এন্ড্রু শুধু আমার সহকর্মী ছিলো না, ভাইয়ের মতো ছিলো, বন্ধুর মতো ছিলো। অসম্ভব কাছের একজন মানুষ ছিলো সে। 

তবে আমার একটাই দুঃখ, এন্ড্রু আগে থেকে সতর্ক হয়নি। চিকিৎসকের কাছে যায়নি। কতবার বলেছি, কিশোর তুমি সিঙ্গাপুর যাও। তোমার শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছে! ওয়েট কমে যাচ্ছে- এগুলো তো খুব ভালো লক্ষণ নয়। ও কিছুতেই শুনতে চাইতো না। ‘দেশেই চিকিৎসা করছি’, ‘ঠিক হয়ে যাবে’, ‘ভালো হয়ে যাব’- এসব বলতো।

একবার অস্ট্রেলিয়া গেলাম অনুষ্ঠান করতে। এন্ড্রুকে বললাম, ফেরার পথে ট্রানজিট নিয়ে সিঙ্গাপুর নামো। চেকআপ করাও। তাও শুনলো না! অথচ সেবার ও অস্ট্রেলিয়ায় সবগুলো অনুষ্ঠান করতে পারেনি। মাঝপথে শরীর খারাপ হয়ে গিয়েছিল। 

এরপর একদিন জোর করেই বললাম, তোমার শরীর এতো খারাপ যে অনুষ্ঠান পর্যন্ত করতে পারলে না; এবার অন্তত যাও। চেকআপ করাও। এভাবে অনেক কষ্টে সিঙ্গাপুর যাওয়ার জন্য এন্ড্রুকে রাজি করিয়েছিলাম। সেখানে যাওয়ার পর জানা গেলো ক্যানসারে ভুগছে সে। তারপরও আমাদের নিয়মিত কথা হতো। ফোনে যদি জানতে চাইতাম- কেমন আছো? এন্ড্রু বলতো, ‘ভালো, আমি ভালো আছি!’ অসুস্থতার বিষয়টি বুঝতে দিতে চাইতো না। অনেক সময় এড়িয়ে যেতো। 

কিছুদিন পর আমি সিঙ্গাপুর গেলাম। গিয়ে দেখি, এন্ড্রু তেমন খেতে পারছে না। তখন আমার একটু খটকা লাগলো! যদিও এন্ড্রুকে দেখে ওর শরীর খারাপ মনে হচ্ছিল না। তারপর সপ্তাহখানেক বা দশদিন পর দেশে ফিরে আসি।

এন্ড্রুর জন্য অনুষ্ঠান করতে গত ফেব্রুয়ারিতে সিঙ্গাপুর গিয়েছিলাম। এ সময় আমাদের সঙ্গে ছিলেন— মিতালি মুখার্জি, হাদী (সৈয়দ আব্দুল হাদী) ভাই, চন্দন দত্ত, মনোয়ার হোসেন টুটুল, রাজিব আহমেদসহ অনেকে। অনুষ্ঠান ভালোভাবেই শেষ হলো। মঞ্চে হুইল চেয়ারে বসে গান গাইলো এন্ড্রু। মনেই হলো না সে অসুস্থ! গলা ঠিক আগের মতো! ‘জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প’ গানটি গাওয়ার পর এন্ড্রু বললো, আমি ‘সাত সখীরে পার করিতে’ গানটি ডুয়েট গাইবো। আমি বললাম, চলো গাই। আমরা একসঙ্গে গাইলাম।

সেদিন নানারকম ইমোশনাল কথাবার্তা হয়েছিল। তখন পর্যন্ত ভেবেছিলাম, সব কিছু ভালোর দিকেই যাচ্ছে। কারণ শরীরের যেখানে ক্যানসারের জীবাণু ছিলো জায়গাটি জীবাণুমুক্ত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরে জানা গেল, জীবাণু শরীরের অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। দুর্ভাগ্য ছাড়া একে কী বলবো! জীবাণুমুক্ত হলেও এন্ড্রুর জ্বর আসতো। ডাক্তার এর সঠিক কারণ বুঝতে পারছিলেন না। সিটি স্ক্যান করার পর বিষয়টি ধরা পড়ে।

গত ১১ জুন সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফিরে আসে কিশোর। পরদিন আমাকে ফোন করে বলল, ‘আপা আমি ঢাকা চলে এসেছি। আমার জন্য দোয়া কইরেন।’ শুনে আমি আবাক! কারণ আসার আগে আমাকে কিছুই জানায়নি। তখন আমি সত্যি বুঝতে পারিনি কেন এতো তাড়াহুড়ো করে সে দেশে ফিরে এলো। পরে সবকিছু জেনে বললাম, ঢাকায় একজন অনকোলজিস্টকে দেখাও। অন্তত একজন ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে থাকো। আলম ভাইকে দেখছেন ডা. কামরুজ্জামান সাহেব, তুমি তাকে দেখাও। কামরুজ্জামান সাহেব বিখ্যাত অনকোলজিস্ট।

এন্ড্রু বললো, ‘আমি রাজশাহী যাবো।’ রাজশাহী ওর প্রিয় জায়গা। তারুণ্যের শহর। অনেক স্মৃতি আছে সেখানে। বললাম, সেখানে গেলে তোমার ভালো লাগবে সুতরাং যাও। কিন্তু তার আগে ডাক্তার দেখিয়ে যাও- লক্ষ্মী ভাই আমার! এ ভাবে বলার পরেও ও ডাক্তারের কাছে গেলো না। রাজশাহী চলে গেল।

রাজশাহী থেকে হঠাৎ একদিন ফোন- ‘আপা আমাকে মাফ করে দিয়েন।’ আমি বললাম, হঠাৎ এ কথা বলছো কেন? কী হয়েছে? পরে মোমিনের (মোমিন বিশ্বাস) কাছ থেকে জানলাম, ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছে না, ঘুম হচ্ছে না।

আমার সঙ্গে এন্ড্রুর শেষ কথা হয় ৯-১০ দিন আগে। ‘আপা আমাকে মাফ করে দিয়েন’— এটাই ছিলো ওর সঙ্গে আমার শেষ কথা।

 

শ্রুতিলিখন: আমিনুল ইসলাম শান্ত 

 

ঢাকা/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়