ঢাকা, শুক্রবার, ২০ চৈত্র ১৪২৬, ০৩ এপ্রিল ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

প্লাস্টিক বর্জ্য রিসাইক্লিং উদ্যোক্তাদের জন্য দারুণ সুযোগ

আব্দুল ওয়াহিদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৩-০৪ ৯:৪১:০৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-০৮ ২:৪৫:০৮ পিএম

সভ্যতা বিকাশের সাথে বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার এক বিস্ময়কর অবদান হলো প্লাস্টিক। এটি আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহারের একটি গুরুত্বর্পূণ পণ্য। প্লাস্টিক পণ্য আমাদের নিত্য দিনের সঙ্গী। আমরা ঘর সাজাতে প্লাস্টিকের বিভিন্ন ধরনের পণ্য কিনে থাকি। দামে সাশ্রয়ী, সহজে ব্যবহারযোগ্য, কম ঝুঁকিপূর্ণ ও টেকসই ইত্যাদি কারণে সারা বিশ্বে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে।

অনেক হালকা এবং দামে সস্তার কারণে প্লাস্টিক খুব জনপ্রিয়। দোকানে দোকানে পাতলা প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগের ছড়াছড়ি। বর্তমানে এমন যুগে বাস করছি, যাকে প্লাস্টিক যুগও বলা যায়। ঘরে-বাইরে আসবাবপত্র কিংবা খেলনা-যন্ত্রপাতিতে বা গাড়ি-উড়োজাহাজের বিভিন্ন অংশ, ল্যাবরেটরির বিভিন্ন কাজে দেখা যায় প্লাস্টিকজাত সামগ্রীর বহুল ব্যবহার। প্লাস্টিকের এই ব্যবহারের কারণ হলো, এটিকে যেকোনো আকৃতি দেওয়া যায়, রাসায়নিকভাবে উচ্চ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন এবং কমবেশি নমনীয়তা গুণসম্পন্ন।

নিয়মিত প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহারের কারণে প্লাস্টিক দূষণের মাত্রাও বাড়ছে। বিভিন্ন ধরনের পলিথিন ব্যাগ, গৃহস্থালির প্লাস্টিক, কসমেটিক প্লাস্টিক, প্লাস্টিকের বোতল,  বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বিভিন্ন পণ্যের বেশির ভাগই পুনঃচক্রায়ন করা হয় না, ফলে এগুলো দিন দিন পরিবেশের বর্জ্যে পরিণত হচ্ছে এবং পরিবেশের দূষণের মাত্রাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের এক জরিপে দেখা যায়, মাত্র ৯ শতাংশ প্লাস্টিক পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ করা হচ্ছে, যা পরিমাণের তুলনায় খুবই নগণ্য।

প্লাস্টিক এক বিশেষ ধরনের রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণ, যা পরিবেশের মাটির  সাথে পচে মিশে যেতে বা কারখানায় পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ করতে অনেক বেশি সময়ের প্রয়োজন হয়। তাই প্লাস্টিককে ‘অপচনশীল  পদার্থ’ বলা হয়, যা কিনা বর্তমান সময়ে পরিবেশের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আর প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে পরিবেশের উদ্ভিদকূল, জলজপ্রাণী, সেন্টমার্টিন দ্বীপ অঞ্চলের প্রাণীরা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে দিন দিন জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, ফলে ফসল উৎপাদনও হ্রাস পাচ্ছে।  শুধু উদ্ভিদকূল, জলজ প্রাণীই নয়, মানুষও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১৫ সাল, এই ২০ বছরে সবচেয়ে বেশী প্লাস্টিক দূষণে ক্ষতির সম্মূখীন হয়েছে মিয়ানমার এবং এতে বাংলাদেশের অবস্থান ৬ষ্ঠ। আরেক প্রতিবেদনে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের নেতা এবং প্রিভেনটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেছেন যে, প্লাস্টিক চার ভাবে পরিবেশ দূষণ করে। যেমন- মাটি, বায়ু, খাদ্য এবং পানি দূষণ। বিশ্বব্যাংকের এক রিপোর্টে বলা হয় যে, ২০১৫ সালে প্লাস্টিক, যা পরিবেশ দূষণের জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যেখানে মালদ্বীপ ১১.৫ শতাংশ, ভারত ২৬.৫ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে প্লাস্টিক দূষণে কারণে ২৮ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

প্লাস্টিকের বর্জ্য যেখানে সেখানে ফেলা হলে তা যেমন পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি মাটিতে বসবাসকারী ক্ষুদ্রাতি-ক্ষুদ্র প্রাণী থেকে শুরু করে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণী নীল তিমির জন্যও ক্ষতিকর। ঢাকা বা অন্যান্য শহরের আকস্মিক বন্যার জন্য দায়ী হচ্ছে প্লাস্টিকের বর্জ্য, যা ড্রেনে আটকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে।  সাগর ও নদীর তলদেশে জমা হয়ে মাটি, পানি ও পরিবেশের জীববৈচিত্রকে ধ্বংস করছে। প্লাস্টিকের বর্জ্য মাটির মধ্যে ৪০০ বছর থাকলেও পচে বা গলে না। বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে প্লাস্টিকের অণু মাটির সাথে মিশে মাটির অনুজীবকে ধ্বংস করে, মাটির গুণাগুণ নষ্ট করে এবং মিথেন গ্যাস নির্গমন করে গ্রিনহাউস গ্যাস উৎপন্ন করে।

একসময় ফুড চেইনের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে মানব স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। প্লাস্টিকের অণু থেকে নির্গত গ্যাস বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পরে। ফলে, মানুষের হাপানি রোগের সৃষ্টি হয়। আবার বিসফেলন নামক প্লাস্টিকের বোতল থেকে নির্গত অণু পানির সাথে মিশে, যা পান করলে মানুষের ক্যান্সার, হরমোন পরিবর্তন, শুক্রানুর সংখ্যা হ্রাস, বন্ধ্যাত্ব রোগের সৃষ্টি হয়। প্লাস্টিক দূষণে সবচেয়ে বেশি শিকার হয় গর্ভবতী নারী ও ছোট ছোট শিশুরা। এমনকি মানুষের চর্ম রোগের জন্য প্লাস্টিক দায়ী।

আবার ক্লোরিন যুক্ত প্লাস্টিক বিষাক্ত রাসায়নিক পদাথ নির্গত করে, যা ভূ-গর্ভস্থ ও ভূ-পৃষ্ঠের পানির সাথে মিশে পানি দূষিত করছে। পাখি আমাদের মূল্যবান সম্পদ, যা পরিবেশে প্রজননের অপরিসীম ভূমিকা পালন করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। প্লাস্টিকের কারণে এসব পাখি আজ বিলুপ্তি হয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় প্রতি বছরে ১০ লক্ষ পাখি প্লাস্টিকের বর্জ্য খাওয়ার কারণে মারা যাচ্ছে।  আবার ২০০৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, সামুদ্রিক গিল নামক একটি পাখির পেটে তার ৩০ খণ্ডের সমপরিমাণ প্লাস্টিক পাওয়া গেছে।

আমরা প্রতিনিয়ত যে প্লাস্টিকের পণ্যগুলো ব্যবহার করি, তা একটা সময় ভেঙে বা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে  এগুলোই আমরা যেখানে-সেখানে ফেলে দিয়ে আমাদের পরিবেশ নষ্ট করি। কিন্তু আমরা জানি না যে, আমাদের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের পণ্যগুলোই পরিবেশের  জন্য মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমরা এই প্লাস্টিকের বর্জ্যগুলোই পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে নতুন প্লাস্টিকের পণ্য উৎপাদন করতে পারি।

যেমন প্লাস্টিকের বর্জ্য রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে পুরনো প্লাস্টিক থেকে নতুন ঝুড়ি, প্লেট, জগ, মগ, চেয়ার, বালতি, বোতাম, ক্লিপ, হ্যাঙ্গার, চামচ, টেবিল, ইত্যাদি বিশেষ করে বল, খেলনা গাড়ি, পোশাক খাতের সরঞ্জাম, গৃহনির্মাণসামগ্রী থেকে শুরু করে পোলট্রি ও মৎস্য খাতের বিভিন্ন পণ্য, গাড়ি ও সাইকেলের যন্ত্রাংশ এবং কম্পিউটারের উপকরণ তৈরি হচ্ছে। এছাড়াও অফিসে ব্যবহারের জন্য তৈরি হচ্ছে স্কেল, বলপেন, পেপারওয়েট, কভারফাইল ইত্যাদি পণ্য।

প্লাস্টিকের বোতল থেকে যেভাবে পলিস্টার ফাইবার তৈরি করা হয়-

আমরা পানি বা পানীয় জলপান করার যে প্লাস্টিকের বোতলটি ফেলে দিচ্ছি, সেই প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে পলিস্টার ফাইবার তৈরি করা হয়। এই ফাইবার দিয়ে সুতা বানিয়ে তৈরি করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের কাপড়। প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবহার করে রিসাইকেল পদ্ধতিতে তৈরি হচ্ছে পলিস্টার ফাইবার (তুলা)। প্রথমে প্লাস্টিক বোতলগুলো সংগ্রহ করে এগুলো রিসাইকেল কারখানায় এনে বাছাই করে আলাদা করতে হয়।

তারপর প্লাস্টিকের বোতলগুলো ছোট ছোট কাটতে হবে। পরে এই কাটা অংশ গরম পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুতে হবে। তারপর উচ্চ তাপমাত্রা ও উচ্চচাপে গরম কুচি আট ঘণ্টা বায়ু নিরোধক ড্রামে রাখা হয়। ভ্যাকুয়াম ড্রামে তাপ দেয়ার পর তৈরি করা হয় পেস্ট বা লেই। সেই পেস্ট বা লেই স্পিনারেট দিয়ে স্লাইবার করা হয়। এরপর তা সুতা আকারে বেরিয়ে আসে। এই সুতাকে আবার বিভিন্ন আকারে কাটিং করে মেশিনে ঢোকানোর পরে পলিস্টার স্ট্যাপল ফাইবার (পি.এস.এফ) হিসেবে সাদা তুলা আকারে বেরিয়ে আসে, যা কিনা প্রাকৃতিকভাবে তৈরি কাপাস তুলার মতোই মসৃন ও মোলায়েম। প্লাস্টিকের বর্জ্য থেকে তৈরি তুলা প্যাকেজিং করে বিদেশে রপ্তানি করা হয়। আবার এই প্রক্রিয়ার সময় সুতার মতো যে বর্জ্য তৈরি হয় তা থেকে পুনরায় আবার রিসাইকেল পদ্ধতিতে তুলা তৈরি করা হয়। এই পলিস্টার ফাইবার তুলা রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রতি বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকা আয় করছে।

অপর দিকে আমরা প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ও টায়ার রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে কালি ও তেল উৎপাদন করতে পারি। আবার আমরা বিভিন্ন প্লাস্টিকের পুরাতন পণ্য কুচি কুচি করে কেটে বা দানা তৈরি করে বিভিন্ন নতুন পণ্য তৈরি করতে পারি। আবার ওই কুচি বা দানা চীনে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারি।

আমাদের উচিৎ প্লাস্টিকের বর্জ্যগুলো পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ এবং একই সাথে প্লাস্টিকের তৈরি পণ্যের ব্যবহারের ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা। পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ প্লাস্টিকের বর্জ্যগুলোকে মূল্যবান সম্পদে পরিণত করে, দেশের হত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয়ের উৎসে পরিণত করা এবং একই সাথে পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পের মাধ্যমে আমাদের প্লাস্টিকের বর্জ্যগুলো থেকে নতুন  প্লাস্টিক তৈরি করতে উৎসাহিত হই। আবার পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে নতুন প্লাস্টিকের তৈরি পণ্যে ব্যবহার কমানো সম্ভব এবং এতে করে আমাদের কাঁচামাল আমদানি ও অর্থনীতির উপর চাপ কমানো সম্ভব হবে।

আবার আমরা এই প্লাস্টিক বর্জ্য রিসাইক্লিং করে বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করতে পারি। এতে আমরা পরিবেশকে প্রাকৃতিক ও মানব সৃষ্ট দুর্যোগ থেকে রক্ষা করতে পারি, একই সাথে আমরা বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে মাথাপিছু জিডিপি পরিমাণ বৃদ্ধি করতে পারি।

প্লাস্টিক পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে আমাদের দেশের বেকার সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। এর পুনঃব্যবহার অর্থনীতি ও সামাজিক অবস্থার উপরেও নীতিবাচক প্রভাব ফেলে। পরিবেশ দূষিত হলে নানা রকম রোগজীবাণুর আবির্ভাব ঘটে। প্লাস্টিক পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ মাধ্যম মাটি, পানি ও বায়ু দূষণ রোধে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করে।

‘২০২০ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য হোক, আসুন প্লাস্টিক রিসাইক্লিং করে পরিবেশ দূষণ রোধ করি এবং জাতীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করি।’ আসুন নিজে প্লাস্টিক ব্যবহারে সচেতন হই, প্লাস্টিক পুনঃপ্রক্রিয়াকরণে উদ্বুদ্ধ হই, পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখি এবং সুস্থ, সুন্দর ও নিরাপদ জীবনযাপন করি।

লেখক: শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।


জাককানইবি/হাকিম মাহি