ঢাকা, সোমবার, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০১ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিপন্ন হাতি !

বিজয় ধর : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-২৩ ৩:০৩:৩৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-২৩ ৪:৩১:৫৪ পিএম

পাহাড়ের পাদদেশে  গ্রামগুলোতে হাতির দলের ধ্বংসযজ্ঞ নতুন কোনো খবর নয়। তেমনি হাতির আক্রমণে অতিষ্ঠ মানুষের হাতেও মারা পড়ে বিপন্ন হচ্ছে হাতি।

রাঙামাটি জেলার কাউখালী, কাপ্তাই, লংগদু এবং বরকলের বেশ ক'টি গ্রামে হাতির তাণ্ডব প্রায় প্রতিদিনেরই ঘটনা। জীবন বাঁচাতে মানুষকে পার্শ্ববর্তী পাকা স্কুলঘর কিংবা হাসপাতালের পাকা ভবনে আশ্রয় নিতে হয়। হাতির আক্রমন থেকে বাঁচার জন্য এরা কখনো কখনো হাতির উপর পাল্টা হামলাও চালাচ্ছেন। এতে প্রাণ যাচ্ছে হাতিরও।

জানা গেছে,২০১৫-২০১৬ সালে আইইউসিএন (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার) এর এক জরিপে সারাদেশে মোট ২৬৮হাতি থাকার কথা জানা গেছে। এর মধ্যে দুই তৃতীয়াংশের হাতিরই বসবাস পার্বত্য চট্টগ্রামে।

অপরদিকে বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ এর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯-১৯  সাল পর্যন্ত আইইউসিএন এর জরিপ মতে, বিগত ১০ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামে ২০টি হাতি মারা গেছে।এর মধ্যে রয়েছে বান্দরবানের লামা বনবিভাগের এলাকায় ১০টি,বান্দরবান পাল্পউড বনবিভাগের অধীনে ২টি, রাঙামাটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের এলাকায় ৫টি, রাঙামাটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বনবিভাগের এলাকায় ৩টি।

তিন পার্বত্য জেলায় মানুষের আক্রমনে হাতি মারা যাওয়ার ঘটনায়  স্ব-স্ব থানায় জিডি করা আছে। কিন্তু কোনো গ্রেপ্তার বা মামলা হয়নি। অন্যদিকে, হাতির আক্রমনে মানুষ মারা গেছে, ঘরবাড়ি ক্ষয়ক্ষতি বা ফসল নষ্ট হয়েছে এমন পরিবার পরিজনকে ৮ লক্ষ টাকা সহায়তা প্রদান করেছে সংশ্লিষ্ট বনবিভাগ।

হাতি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন- জরিপের সময় হাতি গণনায় যে নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি তার কারণ বাংলাদেশের হাতিদের দুইটি আলাদা শ্রেণী আছে। এর একটি আবাসিক অন্যটি অনাবাসিক। আবাসিক হাতিগুলো সাধারণত স্থায়ীভাবে বাংলাদেশেই থাকে কিন্তু অনাবাসিক হাতিগুলো ভারত কিংবা মায়ানমার থেকে আসে আবার চলে যায়। এর মধ্যে শেরপুর-ময়মনসিংহ এলাকায় যেসব হাতির অস্তিত্ব দেখা যায় সেগুলো মূলতঃ ভারত থেকে আসে আবার ভারতে চলে যায়। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের হাতিগুলো বাংলাদেশের স্থায়ী হাতি।

আইইউসিএন ২০১৫-১৬ সালের জরিপে বাংলাদেশের ১২টি এলাকাকে হাতির করিডোর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। করিডোরগুলোর মধ্যে রয়েছে- কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের অধীনে ৩টি, কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের অধীনে ৫টি এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের অধীনে ৪টি। এগুলো হলো, উখিয়া-ঘুমধুম সীমান্ত,তুলাবাগান-পানেরছড়া, বান্দরবানের নাইক্ষংছড়ি- রাজারকুল। ভ্রমরিয়া ঘোনা-রাজঘাট, তুলাতলী-ঈদঘর, খুটাখালী-মেধাকচ্ছপিয়া, খাসিয়াখালী-সাইরুখালী ও সাইরুখালী-মানিকপুর।

পার্বত্য চট্টগ্রামে হাতির আবাস মূলতঃ রাঙামাটির কাপ্তাই-চুনতি-বরকল-লংগদু-কাউখালীতে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘এলিফ্যান্ট করিডোর’। কিন্তু হাতির এই নিরাপদ করিডোরে আবাস নির্মাণ এবং বনাঞ্চল উজাড় করে ফেলার ফলে হাতি এখন মানুষের মুখোমুখি। হাতি এবং মানুুষের দ্বন্দ্ব বেড়েই চলেছে প্রতিনিয়ত।

সম্প্রতি হাতির একটি পাল বেশ কয়েক বছর আগে রাঙামাটি শহরের রাঙাপানি এলাকায় প্রবেশ করে। প্রায় পনেরটি হাতির এই পালের অন্ততঃ দুইটি হাতি পাহাড়ের খাদে পড়ে মারা যায়। আর মারা যাওয়ার সাথে সাথেই কে বা কারা হাতির মাংস, হাড়, দাঁত স্বল্পতম সময়ের মধ্যে নিয়ে যায়।

রাঙামাটির বিশিষ্ট উন্নয়ন কর্মী অম্লান চাকমা বলেন, ‘আগে পাহাড়ে হাতির খাবারের কোন অভাব ছিলনা। কিন্তু বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি হওয়ার কারণে জুমের ফসলও কমে গেছে।একসময়ে পাহাড়ে প্রচুর ফসল হতো এখন আগের মতো তেমন ফসলাদি হচ্ছে না। হাতির বিচরণ ক্ষেত্রও কমে গেছে এবং তাদের বাসযোগ্য স্থান তারা হারাচ্ছে। এ কারণে হাতির পাল মাঝে মাঝে খাবারের জন্য লোকালয়ে চলে আসে এবং মানুষের উপর আক্রমণ করে। এ থেকে উত্তরণের জন্য বনবিভাগগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।'

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ও লেখক শাওন ফরিদ এ প্রসঙ্গে বলেন- ‘আমরা আমাদের এই ঐতিহ্যবাহী প্রাণী হাতির অস্তিত্ব নিয়ে খুব চিন্তিত। পার্বত্য চট্টগ্রামে যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে প্রতিনিয়ত এই প্রাণীটি ঝুঁকির মুখে পড়ছে।'

পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিন বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো: রফিকুজ্জামান বলেন, ‘রাঙামাটির কাপ্তাই হচ্ছে হাতির করিডোর। এখানে প্রায় ৫৫টি হাতি আছে।কাপ্তাইয়ের নেভি ক্যাম্প ও নতুন বাজার এলাকা এর পুরোটাই হাতির এলাকা।'

এ বন কর্মকর্তা আরো বলেন, ‌‘হাতির করিডোরে মানুষ বাড়িঘর স্থাপনা তৈরি করছে। এইসব নানা কারণে আজ হাতি এবং মানুষ মুখোমুখি। তাদের খাবার স্বল্পতাও দেখা দিয়েছে। হাতি কিন্তু মানুষের জায়গায় আসছে না বরং মানুষ হাতির চলাচলের পথ বন্ধ করে ঘরবাড়ি নির্মাণ করছে এবং হাতির আবাসস্থল ধ্বংস করে দিচ্ছে।'

বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের চট্টগ্রাম বিভাগীয় বনকর্মকর্তা আবু নাছের মো: ইয়াছিন নেওয়াজ বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে প্রায় ১০০-১৫০টি হাতি রয়েছে।পাহাড়ে বনাঞ্চল উজাড় হওয়ার কারণে হাতির খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে।'

তিনি বলেন, ‘একটি হাতির দৈনিক ২৫০ কেজি খাবার প্রয়োজন হয়।এখন প্রতিদিন হাতির জন্য আড়াইশ কেজি খাবারের পাওয়া খুবই কঠিন। হাতি বেশিরভাগ খেয়ে থাকে গাছপালা ও লতা পাতা। পার্বত্য চট্টগ্রামে হাতি এবং মানুষের যে সংঘাত তা নিরসনের জন্য কিছু পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। মানুষ নিজে নিরাপদ থাকার জন্য হাতি লোকালয়ে আসার পথে বায়ো ফেন্সিং (কাটা গাছ, বেড়া ইত্যাদি দিয়ে) তৈরি করতে হবে। কোনভাবেই হাতির আবাসস্থল নষ্ট করা চলবে না।  হাতির চলাচলের নিয়মিত পথ বা এলিফ্যান্ট করিডোরে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে না। হাতির জন্য সরকারি উদ্যোগে নিরাপদ অভয়ারণ্য গড়ে তোলা যেতে পারে।এই জন্য প্রচুর বনাঞ্চল বাড়তে হবে এবং গাছপালা রোপণ করেতে হবে।'

 

রাঙামাটি/টিপু

     
 

আরো খবর জানতে ক্লিক করুন : রাঙামাটি, চট্টগ্রাম বিভাগ