ঢাকা, সোমবার, ৭ শ্রাবণ ১৪২৬, ২২ জুলাই ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:
উপকূলে নারী-৫

বহুবিবাহ, বঞ্চনায় হাজারো নারী

রফিকুল ইসলাম মন্টু : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৯-২২ ৮:১১:৪৭ এএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৯-২৩ ৬:৪৩:৩০ পিএম
বহুবিবাহ, বঞ্চনায় হাজারো নারী
Voice Control HD Smart LED

উপকূলে নারী- অবহেলা, বৈষম্য আর নির্যাতনের শিকার ভাগ্য বিড়ম্বিত এক জীবন। যে জীবনে সংকট নিত্যদিনের, নেই সমাধান। দুর্যোগ-দুর্বিপাকে স্বামীর অনুপস্থিতিতে সংসারের বোঝা চাপে নারীর ওপর। পুরুষবিহীন সংসারে নারী হয়ে ওঠেন পরিবারের প্রধান। অথচ কোথাও নেই এতটুকু স্বীকৃতি। তবুও টিকে থাকার লড়াইয়ে সে শামিল হয়। উপকূলে নারীর সংগ্রামের ইতিবৃত্ত নিয়ে প্রকাশিত হলো ‘উপকূলে নারী’ শীর্ষক ধারাবাহিকের পঞ্চম পর্ব। লিখেছেন রফিকুল ইসলাম মন্টু

বহুবিবাহ উপকূলের নারী জীবনে বাড়াচ্ছে বঞ্চনা। সেইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পরিবারিক কলহ। পুরুষ প্রধান গ্রামীণ সমাজে নারী হয়ে পড়ে অসহায়। ক্ষমতার প্রভাব-দাপট, অর্থের জোর পুরুষদের ধাবিত করে বহু বিবাহের দিকে। এক্ষেত্রে আইন থাকলেও সে আইন গ্রামাঞ্চলের মানুষের অজানা। আবার বহুবিবাহ বিষয়ে বিশেষ কোন জরিপ কিংবা এ প্রবণতা রোধে সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে কোন কার্যক্রমও চোখে পড়ে না। স্থানীয় সূত্র বলছে, এক সময় উপকূলের প্রান্তিক জনপদে ‘মৌসুমী বিয়ে’ প্রচলন ছিল। সম্পদশালী ব্যক্তি কিংবা সাধারণ শ্রমিক শ্রেণীর মানুষের মাঝেও এই প্রবণতা ছিল। আবার কখনো জোড়া ইলিশের বিনিময়েও বিয়ে হতো, অল্প কয়েকদিনের জন্যে। লোকালয় থেকে সম্পদশালী ব্যক্তিরা মৌসুমী কাজের প্রয়োজনে উপকূলের দ্বীপ-চর এলাকায় কিছুদিন অবস্থান করলে সেখানে দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় বিয়ে করে। কাজ শেষে ক্ষণিকের ওই ঘর সংসার শেষ। এছাড়াও উপকূলের গ্রাম সমাজে বহুবিবাহের প্রচলন রয়েছে। বাইরে থেকে কাজে আসা কৃষক, জেলে কিংবা দিন মজুরেরা স্ত্রী-সন্তান নেই বলে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিয়ে করে। কিছুদিন পরই লাপাত্তা। এসব কারণে নারী বঞ্চিত হচ্ছে পদে পদে। এমন অনেকের সঙ্গে দেখা মেলে।

ভোলার চরফ্যাসনের দ্বীপ কুকরী মুকরীর বাবুগঞ্জে দেখা নূরজাহান বেগমের সঙ্গে। বয়স কতোই বা, ২৩-২৪। এই বয়সে দুই স্বামীর ঘর করেছেন। দুই ঘরেই দুই সন্তান। প্রথমটি ইতি, ৮ বছর; দ্বিতীয়টি রবিউল হাসান, ৫ দিন। স্বামীর অনুপস্থিতিতে সন্তানদের নিয়ে বিপাকে নূরজাহান। সন্তানদের কাউকেই বাবার মুখ দেখাতে পারেননি তিনি। নূরজাহান জানালেন, তার প্রথম বিয়ে হয় রাজশাহীর এক ছেলের সঙ্গে। চট্টগ্রামে গার্মেন্টসে কাজ করতে গিয়ে পরিচয় শফিকুলের সঙ্গে, অবশেষে বিয়ে। কিছুদিন পর শফিকুল উধাও। নূরজাহান বাড়ি আসে। কিছুদিন পর বিয়ে হয় হারুন মাঝির সঙ্গে। হারুন মাঝির প্রথম স্ত্রী রয়েছে। পটুয়াখালীর চরমোন্তাজের ময়না বেগমের বয়স কতই বা, ২৬ বছর হবে! বিয়ে হয়েছিল ১১ বছর আগে। সে হিসাবে মাত্র ১৫ বছর বয়সে আন্ডারচরের বাসিন্দা হারুন বেপারীর দ্বিতীয় বউ হয়ে ঘরে আসেন। ২৬ বছর আগে শাহিদা বেগম নামের একজনকে প্রথম বিয়ে করেছিলেন হারুন বেপারী। কিন্তু সে স্ত্রীর সন্তান না হওয়ায় দ্বিতীয় বিয়ে করেন ময়নাকে। ১১ বছরের বিবাহিত জীবনে ময়নার ঘরে আসে তিনটি সন্তান। ময়নার ইচ্ছে ছিল, সন্তানদের নিয়ে স্বামীর বাড়িতেই থাকবেন; ছিলেনও। কিন্তু সতীনের অত্যাচার, নির্যাতন সয়ে সেখানে আর থাকা হয়নি ময়নার। স্বামীর বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে ভাইদের সহায়তায় বসতি গড়ে বাঁধে। ময়না বেগম জানান, সন্তান জন্মের পর ময়নার প্রতি আগ্রহ হারাতে থাকেন হারুন বেপারী। ময়নার খোঁজখবর নেওয়া বন্ধ করে দেন তিনি। ফলে তিনটি সন্তান নিয়ে বিপাকে পড়েন ময়না। সন্তান এবং নিজের খাওয়া পড়ার খরচ চেয়ে অনেকবার সালিশি বৈঠক হয়েছে। সালিশে খরচপাতি দেওয়ার জন্য হারুন বেপারীকে চাপ দেওয়া হলেও তিনি বিষয়টি আমলে নেননি। এভাবে চলে যায় বেশ কয়েক বছর। বারবার হেরেছেন; ঠকেছেন; তবুও হাল ছাড়েননি ময়না। শেষ আশ্রয় হিসাবে তিনি থানায় গিয়ে আবেদন করেন। থানা থেকে হারুন বেপারীকে ডেকে শাসিয়ে দেওয়ার পর সমস্যার সমাধান হয়েছে; জানালেন ময়না।  ময়না জানান, তার ৯ বছর ৫ মাস বয়সী বড় ছেলে বনি আমিনকে তার বাবা নিয়েছে। সে এখন সেখানেই থাকে। মাঝে মাঝে মায়ের কাছে আসে। ৫ বছর বয়সী মেয়ে সানজিদা এবং ছোট ছেলে জুনায়েদ থাকে মায়ের কাছে। হারুন বেপারী সপ্তাহে দু’দিন সোম ও মঙ্গলবার ময়নার সঙ্গেই থাকেন। হাটবাজারও করে দেন। তবে এ অবস্থা অব্যাহত মাত্র ২-৩ মাস। এরপরে কী হবে জানেন না ময়না। তবে আপাতত নিজেকে জয়ীই মনে করেন তিনি।
 


একে একে তিনটি বিয়ে করেছেন ভোলার দৌলতখানের দ্বীপ ইউনিয়ন মদনপুরার লগ্নি চাষি কাঞ্চন আলী, ৪০। প্রথম স্ত্রী মারা গেলেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্ত্রী নিয়ে সংসার করছেন। দ্বিতীয় বিয়ে করতে হলে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি লাগার বিষয়টি কাঞ্চন জানেন না। স্বাভাবিকভাবেই বললেন, ‘প্রথম স্ত্রী মারা গেছে দ্বিতীয় বিয়ে করেছি। একজনে কাজ সামাল দিতে পারে না, তাই আরেকজন বিয়ে করেছি। ইসলামে তো একাধিক বিয়ে করার বিধান আছে।’ আলাপে জানা গেল, মাত্র ২৭ বছর বয়সে নূরজাহান বেগমকে প্রথম বিয়ে করেন কাঞ্চন আলী। প্রথম স্ত্রী সন্তান প্রসবকালে মারা যান। এরপর দ্বিতীয় বিয়ে করেন পারভীন বেগমকে। দ্বিতীয় বিয়ের মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তৃতীয় স্ত্রী হিসাবে ঘরে তোলেন মাহমুদা খাতুনকে। মদনপুর দ্বীপের ৩নং ওয়ার্ডে নিজ ঘরে আলাপ কাঞ্চন আলীর সঙ্গে। একই বাড়িতে দুটো ঘর। একটিতে দ্বিতীয় স্ত্রী পারভীন, অপরটিতে মাহমুদা। কাঞ্চন আলী দিন ভাগ করে দুই স্ত্রীর সঙ্গে থাকেন। আলাপের দিনসহ আরও কয়েকদিন পারভীনের ঘরে অবস্থান করায় ক্ষোভ মাহমুদার। কাঞ্চন আলী সহজ জবাব দেন, পারভীন বেশ কিছুদিন বাপের বাড়ি ছিল বলে কয়েকদিন এ ঘরে আছেন তিনি। ছেলেমেয়ে ক’জন- জানতে চাইলে কাঞ্চন আলী একটু বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন। কয়েকজনের নামও ঠিক মতো বলতে পারলেন না। একেকজনকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন- ‘এই তোর নাম যেন কী?’ এভাবে হিসাব পাওয়া গেল তার সন্তান সংখ্যা ১২। এর মধ্যে প্রথম স্ত্রীর ৫ জন, দ্বিতীয় স্ত্রীর ৫ জন এবং তৃতীয় স্ত্রীর ২ জন। ঘরে কিছুক্ষণ অবস্থান করেই বোঝা গেল, কাঞ্চন আলীর ঘরে পারিবারিক কলহ তীব্র।

নোয়াখালীর সুবর্ণচরে ট্রলার ঘাটের দোকানদার মফিজউদ্দিনের তিন সংসার। বয়স ৬৫ পেরোলেও বেশ শক্ত। নিজেই দোকান পরিচালনা করেন। প্রথম স্ত্রী আফরোজকে বিয়ের সময় তার বয়স ছিল ২০ বছর। প্রায় ৯ বছর পরে দ্বিতীয় বিয়ে করেন উড়িরচরের নূরজাহানকে। সেখানে জমি পাবার প্রয়োজনে সংসার করতে হয়েছে, সে কারণেই বিয়ে। এর ১১ বছর পরে তৃতীয় বিয়ে করেন চরলন্ডীর জরিনা খাতুনকে। মফিজউদিনের কথায়, জরিনা বিপদে পড়েছিল। তার ভাইদের অনুরোধে তাকে বিয়ে করেন। তিন স্ত্রীর জন্য পৃথক বাড়ি করে দিয়েছেন। মফিজ থাকেন তৃতীয় স্ত্রীর সঙ্গে। মফিজউদ্দিনের তিন সংসারে ছেলেমেয়ের সংখ্যা ২০জন। এর মধ্যে মাত্র একটি মেয়ে। ছেলেমেয়েদের অনেকেই লেখাপড়া করে। দ্বিতীয় বিয়ে করতে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া প্রসঙ্গে মফিজ বলেন, ‘আইন কানুন তো অনেক কিছুই আছে। গ্রাম সমাজে অনেক সময় সম্পত্তি রক্ষার প্রয়োজনে একাধিক বিয়ে করতে হয়। আইন কানুন দেখে তো এসব হয় না। তবে আমার ঘরে কারও কোন আপত্তি নেই। ছেলেমেয়েরা আমার কাছে আসে, আমি যাই। কোন সমস্যা নেই।’
 


মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ৬ ধারামতে, দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে সালিসি পরিষদের কাছে অনুমতি না নিলে বিয়ে নিবন্ধন হবে না। অনুমতির জন্য ফি দিয়ে চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করতে হবে এবং আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিয়ের অনুমতি দিতে যেসব বিষয়ের প্রতি বিবেচনা করা হবে তার মধ্যে অন্যতম হলো ১. বর্তমান স্ত্রীর বন্ধ্যাত্ব, ২. শারীরিক মারাত্মক দুর্বলতা, ৩. দাম্পত্য জীবন সম্পর্কিত শারীরিক অযোগ্যতা, ৪. দাম্পত্য অধিকার পুনর্বহালের জন্য আদালত থেকে প্রদত্ত কোনো আদেশ বা ডিক্রি বর্জন, ৫. মানসিকভাবে অসুস্থতা ইত্যাদি। আইনের ভাষ্য মতে, এক স্ত্রীর বর্তমানে আরেকটি বা একাধিক বিয়ে করাকে ‘বহুবিবাহ’ বলে। আইন অনুযায়ী এক স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় আরেকটি বিয়ে করা যাবে না। তবে কোনো ব্যক্তির যদি এক স্ত্রী বর্তমান থাকাকালে আরেকটি বিয়ে করার প্রয়োজন হয়, তাহলে তাঁকে তাঁর বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের মধ্যে শেষ স্ত্রীর এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে আরেকটি বিয়ে করার অনুমতি চেয়ে আবেদন করতে হবে।’ আইনে উল্লেখ রয়েছে, কোনো পুরুষ যদি সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তবে তিনি অবিলম্বে তাঁর বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের আশু বা বিলম্বিত দেনমোহরের সম্পূর্ণ টাকা তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করবেন। বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীরা আদালতে মামলা করে বিবাহবিচ্ছেদ করতে পারেন। দ্বিতীয় বিয়ে করার কারণে প্রথম স্ত্রী আলাদা বসবাস করেও ভরণপোষণ পাবেন। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বসবাসরত নাবালক সন্তানদের ভরণপোষণ দিতে বাবা আইনত বাধ্য।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপকূলের গ্রামীণ সমাজে বহুবিবাহ এবং এর আইন কানুন সম্পর্কে অনেকেরই অজানা। প্রথমত, ঘটনার শিকার কোন নারী আইন সম্পর্কে না জানার কারণে কোন ব্যবস্থা নিতে পারেন না। আবার অভিযোগ নিয়ে কার কাছে যেতে হবে, সে বিষয়েই জানেন না। অন্যদিকে বিয়ে করার পর কিছুদিনের মধ্যেই স্বামী উধাও হয়ে যাওয়ার কারণে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েও কোন লাভ হয় না। ফলে ভোগান্তিটা শেষ পর্যন্ত নারীর কাঁধেই ওঠে। এ বিষয়ে উপকূল অঞ্চলের একাধিক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বলেন, বহুবিবাহ বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদে অনেক অভিযোগ আসে। কিছু অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়। কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তি এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার কারণে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হয় না। তবে এ বিষয়ে বিয়ের আগেই অভিভাবক পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে বিয়ের পর সমস্যা না হয়। কিংবা সমস্যা হলেও যেন ব্যবস্থা নেওয়া যায়। তারা বলেন, বাল্যবিয়ে নিয়ে সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম থাকলেও বহুবিবাহ বিষয়ে এ ধরণের কোন কার্যক্রম নেই।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮/তারা

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       

Walton AC
Marcel Fridge