ঢাকা, শনিবার, ৫ আশ্বিন ১৪২৬, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে আছে দুধরাজ পাখি

শামীম আলী চৌধুরী : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৫-২০ ৫:৪৩:৪৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৫-২০ ৯:২৫:০২ পিএম
প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে আছে দুধরাজ পাখি

শামীম আলী চৌধুরী: অনেকের ধারণা যে, এই পাখিটি পরিযায়ী পাখি। তাদের এমন ধারণা হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। কারণ এই পাখিটিকে একটি নির্দিষ্ট ঋতুতে বা সময়ে অন্যান্য পরিযায়ী পাখির মতো লোকালয়ে দেখা যায়। আমাদের দেশে পরিযায়ী পাখির সমাগম হয় মূলত শীত মৌসুমে। আবার কিছু পাখি দেখা যায় গ্রীষ্মে। মোট কথা শীত ও গ্রীষ্মে পরিযায়ী পাখির বিচরণ আমাদের দেশে। পরিযায়ী পাখিগুলো আমাদের দেশে আসে খাবারের জন্য। যে পাখিগুলো শীতে আসে তারা তিন থেকে চার মাস পর্যাপ্ত খাবারের মাধ্যমে ক্যালরী গ্রহণ করে নিজ নিজ আবাসস্থলে চলে যায়। তারা আমাদের দেশে প্রজনন করে না।

অথচ এই পাখিটি আমাদের দেশীয় পাখি এবং তারা আমাদের দেশেই প্রজনন করে। তাদের প্রজনন সময় হচ্ছে এপ্রিল থেকে জুন। এই তিন মাস লোকালয়ে এই পাখিটি দেখা যায়। তাই অনেকের ধারণা এটি পরিযায়ী পাখি। প্রজননের পর ডিম থেকে বাচ্চা ফুঁটিয়ে তারা লোকালয় থেকে চলে যায়। এখন প্রশ্ন থাকতেই পারে তারা কোথায় যায়?

এই পাখির মূল খাবার হচ্ছে প্রজাপতি, ফড়িংসহ উড়ন্ত কীট-পতঙ্গ। এরা নিজেরাও উড়ন্ত অবস্থায় তাদের আহারের জন্য শিকার ধরে থাকে বলে তাদের নাম ‘ফ্লাইক্যাচার’। প্রজননের পর বাকি সময় তারা উঁচু বাঁশ ঝাড়ে অবস্থান করে। সব গাছের পাতা একটি নির্দিষ্ট ঋতুতে ক্রমান্বয়ে ঝরে যায়। আবার নতুন পাতা গজায়। একমাত্র বাঁশ পাতা একেবাবে ঝরে না। প্রজাপতি ও অন্যান্য কীটপতঙ্গ বাঁশ পাতায় বাসা বুনে ও বংশ বৃদ্ধি করে। আর এই সুযোগটাই এই পাখিরা নেয় বলে তাদের খাবারের জন্য লোকালয়ে আসার প্রয়োজন হয় না।



আমি গত দুই বছর টানা ৫ মাস ময়মনসিংহ ও রাজশাহী জেলায় এই পাখি নিয়ে কাজ করেছি ও ছবি তুলেছি (বাসা বুঁনা থেকে শুরু করে বাচ্চা উড়ানো পর্যন্ত)। সেসময় আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তাতে দেখেছি যে, এই পাখি প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকে। যেমন এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত আমাদের দেশে ঝড়-বাদল, কালবৈশাখীসহ নানান ধরনের প্রকৃতির বিরূপ আচরণ দেখা যায়। আর এই সময়টাই হচ্ছে এদের প্রজনন সময়।

এরা দু’বার ডিম দেবার ক্ষমতা রাখে। সে জন্য প্রথমবার যদি কোনো কারণে তাদের ডিম নষ্ট হয়ে যায় তবে তারা আবার প্রজননের মাধ্যমে ডিম পাড়ে। সে ক্ষেত্রে কোনো কোনো পাখির লোকালয়ে অবস্থান জুলাই পর্যন্ত দেখা যায়। এদের অদ্ভুত একটি চরিত্র হচ্ছে, এরা একের অধিক বাসা বুনে। আবার অনেক সময় পুরাতন বাসায় এমনভাবে বসে থাকে যেন মনে হয় ডিমে তা’ দিচ্ছে। কোন বাসায় তারা ডিম দেবে বুঝতে পারা যায় না। আর এই অভিনয়টা করে থাকে মূলত শত্রুদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য।

সাধারণত এরা নিচুতে বাসা বানায়। মাটি থেকে আনুমানিক ১০-১৫ ফুট উঁচুতে তিন ডালের সংযোগ স্থলে বাসা বানায়। জনপথের পাশে আম, কাঁঠাল, পেয়ারা বা অশোক গাছের ডালে বাসা বাঁধে। লোকজনের চলাচলের পথের ধারে বাসা বাঁধার কারণ অন্যান্য শত্রু পাখি বা প্রাণী যেন তাদের আক্রমণ করতে না পারে। তাদের বাসার ধারে জলাশয় থাকতে হবে। পুরুষ ও মেয়ে পাখি পালাক্রমে ডিমে তা দেয়। প্রতিদিনিই পুরুষ ও মেয়ে পাখি পানিতে গোসল করে। তাই জলাশয় বা পানির আধারের আশেপাশে তাদের বাসা বাঁধার আরেকটি কারণ।



বাসার সামনে বড় বড় পাখি যেমন কাক, চিল, বাজ দেখামাত্র তাড়া করে বেড়ায়। এরা অন্য কোনো পাখি তাদের বাসার সামনে আসুক পছন্দ করে না। প্রকৃতির বিরূপ আচরণ ও শত্রুদের মোকাবিলা করে এরা বংশ বিস্তার করে আজও বেঁচে আছে। গত দুই বছরে বিভিন্ন জায়গায় ১৬ জোড়া পাখির বাসা দেখেছি। এদের মধ্যে প্রতিটি পাখি ডিম দেয় নিজ নিজ বাসায়। ন্যূনতম ৪টি করে ডিম পাড়ে। সে হিসেবে যদি সবগুলি বাসা থেকে বাচ্চা ফুটতো তা হলে গত দুই বছরে ৩২ জোড়া বা ৬৪ টি বাচ্চা প্রকৃতির অলঙ্কার হিসেবে শোভা পেত।  কিন্তু বিধি বাম। দুই বছরে মাত্র দুটি বাসা থেকে সফলভাবে বাচ্চা বড় করে উড়িয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে এই দুধরাজ পাখি। একটি হলো ময়মনসিংহে আর একটি রাজশাহীতে।

এদের শত্রু ঝড়, বৃষ্টি, বাদল, গুইসাপ, সাপ ও হাঁড়িচাচা পাখি। ঝড়ে গাছ ভেঙে কিছু ডিম নষ্ট হয়। কিছু সাপ জাতীয় প্রাণী খেয়ে ফেলে। আর কাক, হাঁড়িচাচা পাখি বাচ্চা খেয়ে ফেলে। পাখিকুলের মাঝে সবচেয়ে প্রতিকূল অবস্থায় প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে এই দুধরাজ বা প্যারাডাইজ ফ্লাইক্যাচার পাখি বেঁচে আছে। তাই এই সময়টাতে দল বেঁধে দুধরাজ পাখির ছবি না তোলাই ভালো। যদি ছবি তুলতেই হয় তবে যেন নিজেকে লুকিকে রেখে এবং পাখিটিকে বিরক্ত না করে ছবি তোলার চেষ্টা করার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ রইলো।

পাখিটির ইংরেজি নাম: Asian paradise flycatcher

বৈজ্ঞানিক নাম: Terpsiphone paradisi

বাংলা নাম: দুধরাজ, শাহ বুলবুল, সাহেব বুলবুল

ছবি: লেখক

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২০ মে ২০১৯/হাসনাত/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন