ঢাকা, শুক্রবার, ৫ আশ্বিন ১৪২৬, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

উঁচু ভবনের ছায়ায় কাজ করছে না সূর্যঘড়ি

জাহিদ সাদেক : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৮-৩১ ৪:২২:৪৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৮-৩১ ৮:২২:১৪ পিএম
উঁচু ভবনের ছায়ায় কাজ করছে না সূর্যঘড়ি

জাহিদ সাদেক: ইতিহাস বলছে, সূর্যঘড়িই হচ্ছে সময় দেখার জন্য মানুষের তৈরি প্রথম প্রকৃতিনির্ভর মাধ্যম। আনুমানিক সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে মিশর ও ব্যাবিলনে এমন ঘড়ির উৎপত্তি হয়েছিল। সেই সূর্যঘড়িই ওয়ারীর বলধা গার্ডেনের জৌলুশ বাড়িয়েছে উদ্যান প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই। ১৯০৯ সালে বলধা এস্টেটের জমিদার নরেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরীর উদ্যোগে বাগানে প্রতিষ্ঠিত হয় সূর্যঘড়ি।

কেমন সেই সূর্য ঘড়ি? জানতে হলে যেতে হবে গুলিস্তানের অদূরে অবস্থিত বলধা গার্ডেনে। ঘড়ির কাটা নেই। টিকটিক শব্দ নেই। নেই কোনো ব্যাটারি বা কাটার অবিরত ঘূর্ণন। তারপরও সঠিক সময় বলে দেয় সেই ঘড়ি। এককথায় সূর্যের আলোর সাহায্যে যে ঘড়ির সময় নির্ণয় করা হয় তাকে সূর্যঘড়ি বলে। কবে থেকে সূর্যঘড়ির ব্যবহার শুরু হয়েছে সঠিকভাবে জানা না গেলেও ধারণা করা হয়, মিশরীয়রাই প্রথম প্রকৃতিনির্ভর সূর্যঘড়ি নির্মাণ করেছিল। পরবর্তী সময়ে ইউরোপিয়ানরা যে আধুনিক ঘড়ি তৈরি করে তা এই তত্ত্বের মাধ্যমেই। 

বলধা গার্ডেনে এখনো আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু বিলুপ্তপ্রায় দুর্লভ গাছ। তার সঙ্গে রয়েছে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী এই সূর্যঘড়ি। ইতিহাস থেকে জানা যায়, জমিদার নরেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী দুটি উদ্যান তৈরি করেন। প্রথম উদ্যানটির নাম রাখেন সাইকী। পরবর্তী সময়ে তৈরি করা হয় দ্বিতীয় উদ্যান শিবলী। অর্থাৎ প্রকৃতির দেবী। তার মৃত্যুর পর কোনো এক সময়ে এ দুটি উদ্যানকে সম্মিলিতভাবে বলধা গার্ডেন নামে আখ্যায়িত করা হয়। এখানকার মাঝের রাস্তা বাগানটিকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। বাগানে ঢুকে এই রাস্তা ধরে কিছুদূর গেলে হাতের বামে পড়বে শঙ্খনদ পুকুর। ডান পাশে লোহা দিয়ে ঘেরা একটা অর্ধবৃত্তাকার সিমেন্টের স্থাপনা, যার পশ্চিম থেকে পুবে ঢালু হয়ে আবার উঁচু হয়ে উঠেছে। উদ্যানের ভেতরে শঙ্খনদ লাগোয়া দোতলা বাড়ির নাম জয় হাউস। সেখানে বসেই বলধা গার্ডেনের ক্যামেলিয়া ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন ‘ক্যামেলিয়া’ কবিতাটি। বারান্দা থেকে সূর্যঘড়িটাও হয়তো তাঁর নজর এড়ায়নি!

সূর্যঘড়ির অর্ধবৃত্তাকার চাকতির ওপর একটি নির্দেশক কাটা এবং এর নিচে ছোটে ছোট দাগ। দেখা যায়, দিক নির্দেশক তীরের ফলার মতো আনুভূমিক লোহার পাত, নিচে ওই চাকতিতে এর ছায়া পড়ছে। ১৮০ ডিগ্রি কোণে বাঁকানো এই চাকতি একদিকে ইংরেজিতে ৬ থেকে ১৯ পর্যন্ত সংখ্যায় দাগাঙ্কিত আছে। অপরদিকে ১ থেকে ৩২ পর্যন্ত দাগ কাটা আছে। দাগগুলোর চিহ্ন নির্দেশক সংখ্যাগুলো ঘণ্টা ও মিনিট নির্দেশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সূর্যঘড়ির লোহার পাতটির ওপর সূর্যের আলো পড়লে তার ছায়া সমতল চাকতির যে সংখ্যার ওপর পড়ে তখন তত ঘণ্টা নির্দেশ করে। তার পাশে আরো একটি ছোট আকৃতির মিনিট নির্দেশক রয়েছে। সূর্যের অবস্থান পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এর ছায়ার অবস্থান পরিবর্তন হয়। আর ছায়ার অবস্থান পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সময়েরও পরিবর্তন হয়। সূর্যের সাথে তাল মিলিয়ে এ ঘড়ির সময় ওঠানামা করায় দিনের বেলা কাজে লাগলেও রাতে কোনো কাজে লাগে না।  কিন্তু এখন ছায়ার কারণে রৌদ্রোজ্জ্বল দিনেও বিকেল চারটার পর সূর্যঘড়ির কার্যকারিতা থাকে না। পূর্ব দিকের সুউচ্চ ভবনের কারণে আটকা পড়েছে আলো আসার পথ। তাই আলোর অভাবে সকালে কাজ করে না শতবর্ষী বলধা গার্ডেনের সমবয়সী সূর্যঘড়ি। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্য যখন মাথার ওপর উঠতে শুরু করে তখন ঘিড়ি সক্রীয় হয়ে ওঠে। বলধা গার্ডেনে ঘুরতে আসা কবি নজরুল কলেজের শিক্ষার্থী সানজিদ বলেন, ‘সাপ্তাহিক ক্লান্তি মোচনের জন্য আমরা প্রায়ই এখানে আসি। প্রথম যখন সূর্যঘড়ি দেখি তখন বুঝতে না পারলেও পরে এই ঘড়ির ঐতিহ্য অনুভব করি। তবে ঘড়িটির অবস্থা দেখে বুঝার উপায় নেই যে, এটা আমাদের শত বছরের ঐতিহ্য। অনেকটা রং চটে গেছে।’

সরেজমিনে দেখা যায়, যত্নের অবহেলায় সূর্যঘড়ির কাটার অঙ্কিত দাগগুলো মিশে গেছে। জানা যায় প্রতিবছর এই পার্কটি সরকারিভাবে ইজারা দেয়া হয়। এবছর ইজারা নিয়েছেন সিরাজুর রহমান সুমন। কথা হয় উদ্যানের বন প্রহরী রেজাউল হকের সঙ্গে। তিনি এখানে কাজ করছেন ১৭ বছর ধরে। রেজাউল বলেন, উদ্যানের পূর্ব অংশের উঁচু ভবনটার কারণে সকালের আলো ঘড়ি পর্যন্ত পৌঁছায় না। তবে রোদ থাকলে বেলা ১১টার পর থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত এই ঘড়িতে সময় দেখা যায়। উদ্যানের তত্ত্বাবধায়ক অহিদুল ইসলাম জানান, এই ঘড়ি নিয়ে নতুন দর্শনার্থীদের মধ্যে এখনো আগ্রহ কাজ করে। আমরা ঘড়িতে নতুন করে রং করব।


রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩১ আগস্ট ২০১৯/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন