ঢাকা, সোমবার, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬, ১৪ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

অদম্য এক নারী প্রতিমাশিল্পী অনামিকা

জাহিদ সাদেক : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১০-০৬ ৮:১০:২৮ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১০-০৬ ৯:৩৪:২৬ এএম

ছোটবেলা থেকে বাবার প্রতিমা তৈরি করা দেখতে দেখতে বড় হওয়া। তখন থেকেই প্রতিমা তৈরি করায় তার আগ্রহ। বারকয়েক নিষেধের পরও থামানো যায়নি তাকে। পড়াশোনার পাশাপাশি এখন পুরোদমে বাবাকে সাহায্য করেন। নিজেই তৈরি করেন প্রতিমা। এবার পূজায় বাবার সঙ্গে তিন সেট প্রতিমা বানিয়েছেন। অর্থাৎ অনামিকা নন্দী নিজেই এখন প্রতিমাশিল্পী।

আমাদের দেশে নারী প্রতিমাশিল্পী নেই বললেই চলে। যে কারণে বাবা সুশীল নন্দী মেয়ের উৎসাহ দেখে খুশি হয়ে দোকানের নাম দিয়েছেন ‘অনামিকা ভাস্কর শিল্পালয়’। পুরোনো ঢাকার শাঁখারীবাজার কৈলাস ঘোষ লেনের পাশেই এই শিল্পালয়। এক শুক্রবার সন্ধ্যায় সেখানে গিয়ে দেখা যায় মনের মাধুরী মিশিয়ে প্রতিমা তৈরির শেষ মুহূর্তের কাজ নিয়ে ব্যস্ত অনামিকা নন্দী। দেবী দুর্গা, তার সাথে বিদ্যাদেবী সরস্বতী, ধন সম্পদের দেবী লক্ষ্মী, কার্তিক, গণেশের রূপ ফুটিয়ে তুলছেন শিল্পীর নিপুণ হাতের ছোঁয়ায়। সাংবাদিক পরিচয় পেয়েই মুখ লুকালেন। কথা বললেন কিন্তু ছবি তুলতে রাজি হলেন না। 

অনামিকা নন্দী জানালেন প্রথম দিকে বাবা নিষেধ করতেন। কিন্তু আমার শখ ছিল প্রতিমা বানানো শিখব। মাটির ছোট ছোট প্রতিমা নিয়ে খেলব। ফলে বাবা যেভাবে যা করত লুকিয়ে আমিও তাই করতাম। মেয়ের নাছোড়বান্দা স্বভাবে পরাস্ত হয়ে বাবা এখন সবকিছু সহজভাবে মেনে নিয়েছেন। মাটির কাজ পুরোপুরি রপ্ত করতে না পারলেও অনামিকা প্রতিমা রং করা, শাড়ি পরানো কিংবা নকশার কাজগুলো পারেন। নিজেই জানালেন মাটির কাজ শিখতে আর কিছুদিন লাগবে। বাবা রাজি থাকলে কাজটি আরো সহজ হবে বলেই তার বিশ্বাস।

এবার দুর্গাপূজায় বাবা-মেয়ে মিলে প্রতিমা তৈরি করেছেন। প্রতিটিতেই মেয়ের হাতের ছোঁয়া লেগে আছে বলে জানালেন বাবা সুশীল নন্দী। তিনি বলেন, ‘অনামিকা ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজে স্নাতক তৃতীয় বর্ষে পড়ছে। ওর পড়াশোনায় যাতে ক্ষতি না হয় এজন্য নিষেধ করতাম। কিন্তু শোনেনি। একমাত্র সন্তান হওয়ায় আদর আর জেদ দুটিই বেশি। আমাদের বছরের অধিকাংশ সময় প্রতিমা বানাতে হয়। কখনো কখনো শ্রমিক নিয়েও কাজ করতে হয়। অনেক সময় দেখা যেত শ্রমিকরা কাজে ফাঁকি দিত। অগ্রীম টাকা নিয়ে কাজে অবহেলা করত।  এসব তিক্ত অভিজ্ঞতা মেয়ে নিজেও দেখেছে। ফলে ও যখন এই কাজ করবে বলে সিদ্ধান্ত নিল তখন আর না করিনি।’

কাজের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে অনামিকা বলেন, ‘প্রতিমায় যখন রং তুলির কাজ করি, তখন দর্শনার্থীরা এসে ভিড় করে দোকানের বাইরে। এটা আমার ভালো লাগে না। গত প্রায় দেড়মাস ধরে ভিন্ন ভিন্ন ডিজাইনের প্রতিমা তৈরি করেছি। বাবার কাজে সাহায্য করতে পারছি এটাই হলো আসল কথা।’ তবে প্রতিমার মূল্য নিয়ে ক্ষোভের কথা জানালেন সুশীল নন্দী। বললেন, ‘গত কয়েকদিন তো পাশ ফিরবারও জো ছিল না। তবে পরিশ্রম অনুযায়ী মূল্য পাই না। এটা তো শিল্প। শিল্পমূল্য এবং পারিশ্রমিক পর্যাপ্ত  না হলে কাজের প্রতি আকর্ষণ বাড়ে না। এ কারণেই মেয়েকে এই কাজের সঙ্গে জড়াতে চাইনি। তাছাড়া একদিন ওর বিয়ে হয়ে যাবে। সেখানে ওর এই কাজ কতটুকু সমাদর পাবে কে জানে? তবে বাধা দেয়ার পরও যখন কাজ হলো না তখন ওকে ইচ্ছে মতো কাজ করার সুযোগ দিয়েছি। আমার মেয়েও একদিন বড় শিল্পী হবে এমন প্রত্যাশা আছে আমার।’

এবছর পূজার কাজে বাবা মেয়ে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করেছেন। তবে বিগত বছরের তুলনায় মুজুরি কিছুটা বাড়লেও দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতির এই বাজারে তা সামান্য। এতে ভালোভাবে জীবন যাপন করা কষ্টের। সে দিকটি বিবেচনার কথাও বললেন তিনি।

 

ঢাকা/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন