ঢাকা, সোমবার, ২৯ আষাঢ় ১৪২৭, ১৩ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

হাত ধোয়ার পরামর্শে পাগল হতে হয়েছিল তাকে

এম এ রহমান মাসুম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৩-২৫ ১১:৫৮:০৭ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-২৫ ১২:৪৯:৪২ পিএম

মহামারি করোনাসহ সব ধরনের ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয় সাবান দিয়ে হাত ধোয়া। ইতিহাসে এমন এক ব্যক্তি আছেন, যিনি মানুষকে হাত ধোয়ার কথা বলায় ‘পাগল’ সম্বোধন পেয়েছিলেন। এমনকি চাকরি হারিয়ে শেষ পর্যন্ত তাকে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল।  

তিনি হলেন ইগনাজ ফিলিপ সেমলভাইস। জন্মসূত্রে হাঙ্গেরিয়ান। তাকে বলা হয় মেডিক্যাল সার্জারিতে অ্যান্টিসেপ্টিক পদ্ধতি অনুসরণের পথিকৃৎ। তাকে অভিহিত করা হয় ‘Saviour of Mothers’ নামে।

১৮৫০ সাল। তখনকার যুগে ইউরোপে সন্তান জন্মদানের অবস্থা খুব একটা সুবিধাজনক ছিলো না। সেখানকার চাইল্ড কেয়ার ক্লিনিকগুলোতে প্রায়ই Puerperal Fever জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মা ও শিশুর মৃত্যু ঘটতো।  এটাকে ‘চাইল্ডবেড ফিভার’ নামেও ডাকা হয়। সে সময় যদি বাড়িতে ধাত্রীর মাধ্যমে সন্তান প্রসব করানো হতো, তবে হাজারে হয়তো ৫ জন মা মারা যেতেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে হাসপাতালে মৃত্যুর হার ছিলো প্রায় ১০-১৫ গুণ! কিন্তু কেন?

ইগনাজ সেমলভাইস ১৮৪৬ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় এক জেনারেল হাসপাতালে প্রসূতি সেবা বিভাগের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর থেকে এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন। সেই সময়ে হাসপাতালে তার অধীনে দুটি ওয়ার্ড ছিলো। প্রথমটায় প্রফেশনাল ডাক্তাররা সেবা দিতেন, ধাত্রীবিদ্যা জানেন কিন্তু ডাক্তারি ডিগ্রি নেই, এমন সাধারণ মানুষজন সেবা দিতেন। দ্বিতীয়টা খোলা হয়েছিলো মূলত পরিবার ও সমাজ যেসব মা ও সন্তানের দায়ভার নিতে চায় না (যেমন যৌনকর্মী), তাদের কথা স্মরণে রেখে। যাদের পকেটের অবস্থা ভালো, তারা প্রথম ওয়ার্ডে সেবা নিতেন। আর যাদের বাচ্চা জন্মদানের খরচ বহন করার সামর্থ্য নেই, তারা যেতেন দ্বিতীয় ওয়ার্ডে। প্রথম ওয়ার্ডে রোগীদের চাইল্ডবেড ফিভারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুহার ছিলো ১০ শতাংশ। আর দ্বিতীয় ওয়ার্ডে এই মৃত্যুহার ছিলো ৪ শতাংশ। 

যে ওয়ার্ডে প্রফেশনাল ডাক্তারেরা সেবা দিতেন, সেখানে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুহার ছিলো দুস্থ-গরীবদের জন্যে খোলা ওয়ার্ডের মৃত্যুহারের চেয়ে বেশি। সাধারণ ধাত্রীদের হাতে অনেক বেশিসংখ্যক শিশু সুস্থ শরীরে জন্ম নিয়ে মায়ের কোলে বাসায় ফিরে যাচ্ছিলো। এমন পরিস্থিতে অনেকেই প্রফেশনাল ডাক্তারদের ওয়ার্ডে ভর্তি না হয়ে দ্বিতীয় ওয়ার্ডে ভর্তি হতে চাইতেন। ডিপার্টমেন্টের দায়িত্ব পেয়েই কাজ শুরু করলেন সেমলভাইস। দুই ওয়ার্ডকে পর্যবেক্ষণে রাখা শুরু করলেন। দুই ওয়ার্ডে যেসব বিষয়ে পার্থক্য আছে, সেগুলো নোট করা শুরু করলেন।

শুরুতেই মানুষের জনসমাগমকে সেমলভাইস শুরুতেই বাদ দিয়ে দিলেন। কারণ দ্বিতীয় ওয়ার্ডে মানুষ বেশি ভর্তি হতে চাইতো। তাতে রোগীর সংখ্যা ছিলো অত্যধিক। কিন্তু মৃত্যুহার ছিলো ওখানেই কম। সুতরাং এই পথে আগানো অর্থহীন।

কিছুদিন পর সেমলভাইস দেখলেন, প্রথম ওয়ার্ডে মায়েদের পিঠের ওপরে ভর দিয়ে শুইয়ে সন্তান প্রসব করাচ্ছেন ডাক্তারেরা, যেখানে দ্বিতীয় ওয়ার্ডে ধাত্রীরা মায়েদের পাশ ফিরিয়ে শুইয়ে সন্তান প্রসব করান। এটাই কি তবে কারণ? তাই সেমলভাইস নির্দেশ দিলেন প্রথম ওয়ার্ডেও মা-দের পাশ ফিরিয়ে শুইয়ে সন্তান প্রসব করাতে। তাতেও ফল পাওয়া গেলো শূন্য। চাইল্ডবেড ফিভারে মৃত্যুহার সেই একই।

কিছুদিন পর আর একটি বিষয় নজরে পড়লো সেমলভাইসের। যখন কোনো রোগী মারা যেতেন চাইল্ডবেড ফিভারে, তখন হাসপাতালের চার্চের একজন যাজক সেই রোগীর বেডের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতেন। তার পেছনে পেছনে একজন অ্যাটেনডেন্ট হাতে ঘণ্টা বাজাতেনে আর হাঁটতেন। সেমলভাইস ভাবলেন, যাজককে দেখে এবং তার ঘণ্টার শব্দ শুনে রোগীরা কি আঁতকা ভয় পেয়ে ওঠে নাকি, যাতে গায়ে জ্বর চলে আসে আর রোগী মারা যায়? এসব ভেবে তিনি যাজককে রোগী মারা গেলে হাসপাতালের ভিতর দিয়ে তিনি যাতে অন্য পথ ধরে হাঁটার অনুরোধ করলেন। কিন্তু তাতেও ফলাফল শূন্য।

একপর্যায়ে দীর্ঘ ছুটি কাটিয়ে যখন তিনি হাসপাতালে ডিউটিতে ফিরলেন, তখন প্যাথলজিস্ট সহকর্মী অসুস্থ হয়ে মারা যান। জ্বর হয়েছিলো তার। সে সময়ে প্যাথলজিস্টদের জ্বরের ফলে মৃত্যু সংবাদ একটু বেশিই নিয়মিত ছিলো। জানলেন সেমলভাইসের ওই কলিগের লাশ অটোপসি করার সময়ে সুঁইয়ের খোঁচা খেয়েছিলেন আঙ্গুলে। এরপরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মারা যান। তাই তিনি জ্বরের লক্ষণগুলো ভালোমতো পর্যবেক্ষণ করলেন। করে দেখলেন, হাসপাতালের গর্ভবতী মায়েদের মতো তার কলিগও ঠিক একই জ্বরে মারা গেছেন। এটাই ছিলো পুরো ঘটনার মোড় ঘুরে যাওয়ার মতো বিষয়।

সেমলভাইস হাইপোথিসিস অনেক যাচাই-বাছাই শেষে উদঘাটন করলেন কেন প্রথম ওয়ার্ডে প্রফেশনাল ডাক্তারদের হাতে অনেক বেশি পরিমাণে রোগী মারা যাচ্ছে! কারণ প্রথম ওয়ার্ডের ডাক্তারেরা প্রায়ই লাশের অটোপসি করেন, যেটা দ্বিতীয় ওয়ার্ডের ধাত্রীদের করতে হয় না। তার মানে লাশের শরীরে এমন কিছু বিষাক্ত পদার্থ থাকতে পারে, যেগুলো অটোপসি করা ডাক্তারদের হাতে করে চলে যাচ্ছে মায়েদের শরীরের ভেতরে। পরে শরীরে বিষক্রিয়ায় পর মৃত্যু হচ্ছে।
 


সেমলভাইস বিষাক্ত ওই পদার্থগুলোর নাম দিলেন ‘Cadaverous Particles’ বা শব কণা। এরপরই নির্দেশনা জারি করলেন, ডাক্তারেরা যাতে ক্লোরিন দিয়ে হাত ও সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি ধুয়ে তারপরে মায়েদের সন্তান প্রসব করান। ক্লোরিন সেরা জীবাণুনাশকগুলোর মধ্যে একটি। হাত থেকে লাশের গন্ধ দূর করতে ক্লোরিন বেশ ভালো এক পরিষ্কারক পদার্থ। তাই সেমলভাইস সবাইকে ক্লোরিন দিয়ে হাত এবং সার্জিকাল যন্ত্রপাতি ধোবার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এই নির্দেশনা পালন শুরু হবার পরেই নাটকীয়ভাবে প্রথম ওয়ার্ডে রোগীদের মৃত্যুহার কমে যায়।

কিন্তু ঘটনা প্যাঁচ লাগতে শুরু করে। ডাক্তারেরা জীবন বাঁচান তারাই রোগ ছড়িয়ে রোগীদের মারছেন, এমনটাই উপস্থাপন হতে লাগলো সমাজে। ফলে সেমলভাইসের ধারণার বিপরীতে তীব্র প্রতিরোধ আসা শুরু করলো। ‘চার্লস ডেলুসেনা মেইগস’ নামের আরেক ডাক্তার ঘোষণা করলেন, কোনো ডাক্তার হাত ধুবে না। ডাক্তারেরা হচ্ছেন ভদ্রলোক। আর ভদ্রলোকদের হাতে ময়লা থাকে না।

মেইগসের গলার সুরে সুর মিলিয়ে এগিয়ে এলেন অন্য ডাক্তাররাও। তারা কেউ হাত ধুবেন না। হাত না ধুয়েই তারা প্রসূতিদের সেবা দিবেন। ডাক্তারদের হাত ধোয়া মানে তারাই যে জ্বর ছড়াচ্ছে, সে কথা স্বীকার করে নেওয়া। এটা হতে দেওয়া যাবে না। ডাক্তার মেইগের সাথে ‘জোহান ক্লাইন’ নামের আরেক ডাক্তার এসে যোগ দিলেন। এই দুজনের তীব্র বিরোধিতার মুখে চাকরি চলে গেলো ডাক্তার সেমলভাইসের। তিনি ভিয়েনা ছেড়ে চলে গেলেন বুদাপেস্টে।

এরপরেও কয়েকবার তিনি বিভিন্ন হাসপাতালে চাকরির জন্যে আবেদন করেছিলেন। তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছিলো তাকে। ১৮৫১ সাল নাগাদ ‘যেইন্ট রোকুস’ হাসপাতালে বিনা বেতনে হেড ফিজিশিয়ানের দায়িত্ব নেন তিনি। সেখানেও ভীষণ চাইল্ডবেড ফিভারের সমস্যা ছিলো। সেমলভাইসের ক্লোরিন দিয়ে হাত ধোয়ার থেরাপিতে আশাতীত ফলাফল পাওয়া যায়। সেখানেও মায়েদের মৃত্যুহার হ্রাস পায়। তার কাজের রিপোর্ট চলে যায় ওপর মহলে। তারা যথারীতি খিক খিক করে হেসে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেন সেসব রিপোর্ট। কেউ মানতেই চাননি ডাক্তারদের হাতের মাধ্যমে প্রসূতি মায়েদের শরীরে জ্বর ছড়ায়।

তৎকালীন কয়েকটা পেপারও লিখেছিলেন সেমলভাইসের আবিস্কার। কিন্তু তার পেপারের বিপরীতে অন্য আরেকটি পেপার লিখে হাত ধোয়ার ব্যাপারটাকে নাকচ করে দেন অনেকে। পুরো ডাক্তার সমাজে হাসির পাত্র হয়ে উঠেন সেমলভাইস।

এই বৈপ্লবিক আবিষ্কারের মাত্র এক যুগের মাথায় সেমলভাইস পুরো হতাশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। প্রায়ই মাতাল হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ডাক্তারদের ‘কসাই, জানোয়ার, অশিক্ষিত গণ্ডমূর্খের দল’ বলে সমালোচনা করতেন। তার পরিবারের লোকজনও এই মেন্টাল ব্রেক ডাউনে অস্থির হয়ে ১৮৬৫ সালে ভিয়েনার এক মানসিক হাসপাতালে চিঠি লিখেন সেমলভাইসের মানসিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে। সেই হাসপাতালের প্রধান ডাক্তার ফার্দিনান্দ রিটার ভন হেবরা এসে সেমলভাইসের সাথে পরিচিত হলেন। তাকে ভিয়েনার মানসিক হাসপাতালটা ঘুরে দেখার আমন্ত্রণ জানান। সেমলভাইস খুশি মনেই রওনা হলেন তার সাথে।

১৮৬৫ সালের ৩০ জুলাই উপস্থিত হলেন সেখানে। কিন্তু সেখানে  আটকে ফেলা হলো তাকে। এরপর শুরু হলো পাগলের চিকিৎসা, হাত-পা বেঁধে শক্ত করে মার দেওয়া ইত্যাদি। মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায়, ১৮৬৫ সালের ১৩ আগস্ট মারা যান সেমলভাইস। ১৫ আগস্ট ভিয়েনাতে সমাহিত করা হয় তাকে।

কয়েক দশক পরে, তার ধারণাগুলি ‘জীবাণু তত্ত্ব’ অবদানের জন্য কৃতিত্ব পেয়েছিল। বর্তমানে অস্ট্রিয়া এবং হাঙ্গেরিতে বর্তমানে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয় ডাক্তার সেমলভাইসকে। এখনকার মতো ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটারের মতো ইন্টারনেটের যুগ হলে হয়তো তার এমন করুণ পরিণতি হতো না। যদিও হাস্যকর সব ট্রল থেকে মুক্তিও মিলতো না।

 

এম এ রহমান/সাইফ