ঢাকা, বুধবার, ১৮ চৈত্র ১৪২৬, ০১ এপ্রিল ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

পশ্চিমাদের ‘সন্ন্যাসী’ সু চি এখন মানবতার শত্রুদের দোসর

শাহেদ হোসেন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-১৫ ৯:৩২:৪৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১২-১৫ ১০:৫৫:২২ পিএম

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সু চির মতো খুব কম ব্যক্তিত্বই সুনাম-প্রশংসার চূড়া থেকে একেবারে নিন্দার অতলে গিয়ে পড়েছেন। ২০১৩ সালে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী সু চি গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বলা হয়েছিল, সু চি হচ্ছেন ‘একটি দেশের বিবেক ও মানবতার নায়িকা’।

দুই বছর পর মিয়ানমারের জাতীয় নির্বাচনে সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) যখন জয় পেলো তখন তাকে বলা হলো এশিয়ার নেলসন ম্যান্ডেলা। গত সপ্তাহে সেই ‘মানবতার নায়িকা’ রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর গণহত্যা চালানোর অভিযোগের বিরুদ্ধে লড়তে নেদারল্যান্ডসের হেগে বিচার আদালতে হাজির হয়েছিলেন।

সাধু-সন্ন্যাসী হিসেবে চরিত্রকে চিত্রিত করার পর খুব লোকই তাদের সেই ভাবমূর্তিকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারে। মিয়ানমারের সামরিক শাসন আমলে বাবার কাছ থেকে পাওয়া আপোষহীন রাজনৈতিক চরিত্র এবং শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বদৌলতে নিজেকে প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন সু চি। আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগানোর ব্যাপারে তিনি ছিলেন সফল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের সরকার ছিল সু চির কড়া সমর্থক।

নরওয়ে সু চিকে কেবল নোবেল দিয়েই ক্ষান্ত হয় নি। নির্বাসিত বার্মিজ সরকার ও গণতন্ত্রপন্থীদের রেডিও স্টেশন ডেমোক্রেটিক ভয়েস অব বার্মার খরচও যোগান দিত দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রের নব্যরক্ষণশীলরা সু চিকে উদার গণতন্ত্রের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিল। এ ধরণের সরকার প্রধানই ইরাকে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করতো। এর অংশ হিসেবেই জর্জ বুশের প্রশাসন ২০০৩ সালে মিয়ানমারের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের পর অনেক কম পৌরাণিক চরিত্রই ইতিহাসে টিকে থাকে। খুব সম্ভবত সু চি হচ্ছেন সেই স্বল্প সংখ্যক মানুদের মধ্যে অন্যতম যাদের পাবলিক ইমেজের পতন খুব দ্রুত হয়েছে। একসময় তার যে দোষত্রুটিগুলি পর্দার অন্তরালে ছিল এখন সেগুলিই একে একে সামনে আসতে শুরু করেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্ষমতালিপ্সা ও স্বৈরতন্ত্রবাদ। অবশ্য মুসলিমবিরোধিতা তার পুরোনো অবস্থান হলেও তা প্রকাশ্যে এসেছে হাল আমলে।

সাংবাদিক ফ্রান্সিস ওয়েইড তার ‘মিয়ানমার’স এনিমি উইদিন : বুদ্ধিস্ট ভায়োলেন্স অ্যান্ড দ্য মেকিং অব অ্যা মুসলিম আদার’ লেখায় বলেছেন, চলমান রোহিঙ্গা সংকটের আগেও ‘সু চির বিরুদ্ধে মুসলিমবিরোধী বিতর্ক উস্কে দেওয়ার অভিযোগ ছিল। এর কারণ হচ্ছে তিনি হচ্ছেন অভিজাত বার্মিজ এবং যে গোষ্ঠীগত যাজকতন্ত্রের ওপর মিয়ানমার গঠিত সেই সুবিধাবাদদেরই একজন তিনি’।

২০১৩ সালে সু চি তখনো ক্ষমতায় আসেন নি। ওই সময় তিনি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে রাখাইনে যে সহিংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে তা সোজাসাপ্টা নাকচ করে দিয়েছিলেন। উল্টো তিনি দাবি করেন, ‘বৈশ্বিকভাবে মুসলিমদের ক্ষমতা’ বাড়ায় আতঙ্কে আছে রাখাইনের বৌদ্ধরা। ২০১৬ সালে সেনাবাহিনী যখন রাখাইনে জাতিগত নিধন অভিযান চালায় তখনও নীরব ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি। ভোটের রাজনীতির জন্য তিনি কখনোই সংখ্যাগুরু বৌদ্ধদের ঘাটাতে যান নি। এমনকি ২০১৭ সালে যখন তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান রোহিঙ্গা ইস্যুতে ফোন করলেন তখন সু চি তাকে জানান, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিপুল পরিমাণ ভুল তথ্য’ রয়েছে। আর এই সংকটের কথা ছড়ানো হচ্ছে সন্ত্রাসীদের লাভের জন্য’।

জাতিসংঘে প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রদূত বিল রিচার্ডসন সু চিকে চেনেন ৩০ বছর ধরে। মিয়ানমার নেত্রী যখন গৃহবন্দী ছিলেন সেই সময়ও পাশে ছিলেন তিনি।

গত বছর রিচার্ডসন বলেছিলেন, সু চি ‘বদলে গেছেন। দুভার্গ্যজনকভাবে তিনি সেনাবাহিনীর ভয়ে ভীত রাজনীতিবিদে পরিণত হয়েছেন এবং ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে মানবিক সংকটগুলোর অন্যতম যে সংকটটি তার সমাধানে সিদ্ধান্ত নিতে তিনি এখন ভীত’।

তবে সার্বিক বিশ্লেষণে বলা যায়, হয়তো তিনি বদলে গেছেন, অথবা তাকে যেভাবে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা হয়েছিল তিনি কখনোই তেমন ছিলেন না। পশ্চিমারা তাকে সাধু-সন্যাসীর তকমা দিয়ে আকাশে তুলেছিল। আজ সময়ই সু চির প্রকৃত চেহারা প্রকাশ করে তাকে একটানে মাটিতে নামিয়ে এনেছে।


ঢাকা/শাহেদ