ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৪ আশ্বিন ১৪২৬, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

সংবাদকর্মীদের প্রিয় একজন ‘আদা চাচা’

কেএমএ হাসনাত : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৮-২১ ১:৩১:৪০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৮-২১ ৫:১০:২৩ পিএম
সংবাদকর্মীদের প্রিয় একজন ‘আদা চাচা’
Walton E-plaza

কেএমএ হাসনাত : ছাত্র জীবনে ছাত্রলীগের একজন কর্মী হিসেবে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচীতে আমাদের সরব উপস্থিতি সবার চোখ পড়ার মত ছিল। আমাদের সূর্যসেন হলের ভিপি ছিলেন আতাউর রহমান ডিউক আর সাধারন সম্পাদক ছিলেন ড.গোলাপ হোসেন দেওয়ান। তখন গোলাপ ভাই খুব ভাল শ্লোগান দিতেন। তাদের নেতৃত্বে মিছিল সহকারে আমরা আওয়ামী লীগের সমাবেশে যোগ দিতাম। তখন দেখতাম একজন বয়স্ক লোক সবাইকে লবণ লাগানো শুকনো আদা বিতরণ করছেন।

বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারি এবং সংবাদকর্মীদের কাছে তিনি ‘আদা চাচা’ বলে পরিচিত ছিলেন। আদা বিলিয়ে তার পৈত্রিক নামটিও প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল। অনেক পরে জেনেছি তার আসল নাম রফিকুল ইসলাম। আজ ২১ আগস্টের হামলার ১৫তম বার্ষিকীতে সেই আদা চাচার মুখটি বারবার ভেসে আসছে চোখের সামনে।

আমাকে দেখলেই তিনি জিঞ্জেস করতেন, ‘ভাতিজা সাধন কই’। সাধন সরকার জগন্নাথ হলের ছাত্র ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুঃসময়ে যারা সাহসী ভূমিকা রেখে ছিলেন তাদের একজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সামরিক সরকার প্রধান জিয়াউর রহমান যাদের হাতে নিগৃত হয়েছিলেন সাধন সরকার তাদের মধ্যে একজন ছিলেন। বর্তমানে কানাডা প্রবাসী।

হ্যাঁ, আদা চাচার কথা বলছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে সে সময় ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে পরিচয় দেওয়াটাও ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। নিজ নিজ হলে ছাত্রলীগ কর্মীদের থাকাটা ছিল দুষ্কর। হয় পুলিশের ভয় না হয় সামরিক সরকারের লেজুর ছাত্র সংগঠনের সশস্ত্র হামলার ভয়। সাধন দা ভাল শোøাগান দিতেন যা সবার মনে নাড়া দিতো। মিছিলে কেউ মুখ বন্ধ করে রাখতে পারতো না। আদা চাচা সাধনের শ্লোগানের খুব ভক্ত ছিলেন। শুনেছি হলে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে তিনি আদা চাচার পুরান ঢাকার বাসায় আশ্রয় নিতেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাশেষে নিজ এলাকায় ফিরে গিয়ে পারিবারিক চাপে একটি কলেজে শিক্ষকতা শুরু করি। দীর্ঘদিন পর আবার ঢাকা ফিরে সাংবাদিকতা পেশা বেছে নেই। আমি তখন দৈনিক মানবজমিনে কাজ করি। অর্থনৈতিক রিপোর্টার হলেও মাঝে মধ্যে সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর নির্দেশে আওয়ামী লীগের কর্মসূচীর সংবাদও সংগ্রহ করতাম।

এমন এক কর্মসূচীর সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে নতুন করে পরিচয় হয় আদা চাচার সঙ্গে। আমাকে ভুলে গেলেও সাধন সরকারের কথা বলতেই তিনি আমাকে চিনে ফেলেন। আমার হাতে দুই টুকরা আদা তুলে দেন। সহকর্মী দৈনিক জনকণ্ঠের উত্তম চক্রবর্তী দা’ আদা চাচাকে প্রশ্ন করেছিলেন দুই টুকরা দেওয়ার কারণ কি। এর উত্তরে আদা চাচা বলেছিলেন, ‘ও পুরাতন সহযোদ্ধা হিসেবে এক টুকরা আর সাংবাদিক হিসেবে এক টুকরা’

পানখাওয়া লাল টুকটুকে হাসিমাখা মুখটা ধরে উত্তম দা আদা চাচার কপালে চুমু খেয়ে বলেছিলেন, চাচা এ ভাবেই তুমি আমাদের সঙ্গে থেকো। চাচার উত্তর ছিল, ‘বাবারে বয়স হয়েছে আর কতদিন বাঁচবো। মরার আগে যদি খুনিদের বিচারটা দেখে যেতে পারতাম। মরেও শান্তি পেতাম।’

না আদা চাচা তা আর দেখে যেতে পারেননি। তার আগেই ইতিহাসের আর এ নিকৃস্টতম এবং ভয়াল ২১ আগস্ট হানাদারদের উত্তরসূরীরা গ্রেনেড ছুড়ে প্রাণ প্রদীপ কেড়ে নেয় প্রিয় আদা চাচার।

২০০৪ সালের ভয়াল ২১ আগস্টে আওয়ামী লীগের জনসভার সাইড নিউজ করার জন্য চিফ রিপোর্টার অন্যদের সঙ্গে অ্যাসাইনমেন্টে আমার নামও দিয়েছিলেন। কিন্তু সম্পাদক সাহেব অন্য একটি সংবাদের জন্য আমাকে গুলশান পাঠালে আমার আর সেদিন বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর সমাবেশে যাওয়া হয়নি। আর আদা চাচার সঙ্গেও শেষ দেখা হয়নি। 

সাংবাদিকদের মধ্যে জনকন্ঠের উত্তম দাকে আদা চাচা যেন আলাদা করে একটু বেশি ¯েœহ করতেন। তাকে দেখলেই জড়িয়ে ধরতেন। যেন দুই বন্ধু। পরে তার কাছ থেকে শুনেছি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সভাস্থলে আসার কিছুক্ষন আগেও সাংবাদিকদের সঙ্গে একটি ভবনের সিঁড়িতে বসে ছিলেন আদা চাচা। শেখ হাসিনা সভাস্থলে আসার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেদিকে ছুটে গিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার বক্তব্য চলাকালে হঠাৎ গ্রেনেড হামলা শুরু হলে ভীত সন্ত্রস্ত্র মানুষ দিকবিদিক ছুটোছুটি করে। অবস্থা একটু শান্ত হলে সবার প্রিয় আদা চাচার  রক্তাক্ত দেহ আওয়ামী লীগ অফিসের পাশে পড়ে থাকতে দেখা যায়।  দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

আদা চাচার আনুষ্ঠানিক পদবী ছিল তিনি ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফের খুব স্নেহভাজন ছিলেন তিনি। ষাটের দশক থেকে আওয়ামী লীগের প্রতিটি কর্মসূচীতে তার সরব উপস্থিতি দেখা যেতো বলে  আওয়ামী লীগের পুরাতন নেতা কর্মীদের কাছ থেকে জানা গেছে। তিনি সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের কাছে অবস্থান করতেন। তাদের কখন কি লাগে সে খোঁজখবর নিতেন। আদা বিতরণের পাশাপাশি অনেক সময় তাদের নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে চাও খাওয়াতেন।

জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আদর্শ এবং তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার একনিষ্ঠ ভক্ত রফিকুল ইসলাম প্রিয় আদা চাচার মর্মান্তিক প্রয়ান দিনে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২১ আগস্ট ২০১৯/হাসনাত/এনএ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন