ঢাকা, শনিবার, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৬ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

আব্বাগো আমরা তোমার লাশ পাইনি

মনিরা ইসলাম জিনা : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৬-১৭ ৩:০০:৪০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৬-১৭ ৩:৪৫:৪৯ পিএম

মনিরা ইসলাম জিনা: আব্বাগো শেষ সময় তোমার কার মুখ মনে পড়েছিল? যখন ওরা তোমার গলায় ছুরি চালায় তখন তুমি কি খুব ব্যথা পেয়েছিলে? তোমার কি খুব কষ্ট হয়েছিল? জানি আব্বা, এসব প্রশ্নের উত্তর তোমার পক্ষে দেয়া সম্ভব না। কারণ তুমি তো এখন অনন্তলোকে লক্ষ-কোটি যোজন দূরে। যেখানে মানুষ গেলে আর ফিরে আসে না। তবে অন্য আর দশজন মানুষের মতো তুমি আমাদের ছেড়ে যাওনি। তুমি এই পৃথিবী ছেড়ে আকাশের ঠিকানায় গিয়েছ দেশের জন্য।

আব্বা তোমাকে যেদিন খানসেনারা হত্যা করল, সেদিন আমার বয়স মাত্র সাড়ে তিন বছর। আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার শেষ দিনটি আজও অস্পষ্ট স্মৃতিতে মনে আছে। সান্তাহারে দুই বোন ও মাকে নিয়ে কতই না সুখের সংসার ছিল আমাদের! মাত্র ৫ বছর সংসার করতে পেরেছে তোমার সাথে আমার মা। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিবার পরিজনের প্রাণ বাঁচাতে তুমি যেদিন সান্তাহার ছেড়ে পালিয়ে মুরাদনগরে এক পাইকারের বাড়িতে আশ্রয় নিলে তখন আমার মা সন্তানসম্ভবা। নৌকার ঘোর সর্মথক ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রেমই তোমাকে আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে।

আব্বাগো তুমি এখনো কায়া হয়ে, না হলে ছায়া হয়ে স্বপ্নে আমাদের মাঝে আছ। একাত্তরের ৯ জুন তুমি নওগাঁয়ের হাবিব ব্যাংকে টাকা জমা দিতে গেলে। সেদিন আমি মাটিতে তোমার ছবি এঁকে বারবার আল্লাহকে বলেছিলাম আল্লাহ আমার বাবাকে এনে দাও। সেদিন আল্লাহ আমার কথা শুনেছিল। সন্ধ্যায় তুমি ফিরে এলে। তোমার ফিরে আসার আনন্দ শুধু আমরা নই, মুরাদপুর গ্রামের মানুষও পেয়েছিল।

আব্বাগো শুনেছি তুমি খুব সৌখিন ছিলে। বাজারের সবচেয়ে দামি কাপড় ও দামি জিনিস ছাড়া কিনতে না। মানুষ বলতো ‘কাপড়ের ব্যবসা করলেও মোহন ঢালি খুব সৌখিন মানুষ’।  আমার এখনো মনে আছে- আমাদের বাড়িতে দুটি রেডিও ছিল। রেডিও’র খবর শুনতে আশপাশের মানুষ আমাদের বাসায় ভিড় করতো। খবরে তুমি শুনতে পেলে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা দিয়েছে ১০ জুনের মধ্যে টাকা বদল করতে হবে। সেই ঘোষণা শুনে প্রথমে তুমি টাকা তুলতে যেতে চাওনি। তারপর কি মনে করে পরদিনই টাকা তুলতে গেলে। সেই যে গেলে আর ফিরে এলে না।

আব্বাগো তুমি যেদিন হাবিব ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে নওগাঁ গেলে। সেদিন আমার ছোট বোন রুনা; তখন ওর বয়স মাত্র এক বছর। হামাগুড়ি দিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে তোমাকে বাড়ির বাইরে যেতে ইঙ্গিতে নিষেধ করেছিল সে। তুমি তখন ওকে বলেছিলে- আমি যাচ্ছি তোমার জন্য চকলেট, খেলনা নিয়ে আসব। কিন্তু তুমি কথা রাখনি।

আব্বাগো হাবিব ব্যাংকের ভিতরে পাকিস্তানি খানসেনারা যখন তোমাকে ধরে তখন তোমার কেমন লেগেছিল? তুমি কি খুব ভয় পেয়েছিলে? নাকি তুমি জানতে ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে! তাই নির্ভয়ে ছিলে দেশের জন্য প্রাণ দিতে।

আব্বাগো আমরা পরে শুনেছি, ওইদিনই আত্রাই নদীর তীরে জল্লাদরা তোমাকে জবাই করে হত্যা করেছিল। আমরা তোমার লাশ পাইনি। আব্বাগো কোথাও তোমার জানাযা হয়নি। তোমার কপালে এক টুকরো কাফনের কাপড়ও জোটেনি। পাওনি কবরের জন্য সাড়ে তিন হাত মাটি। আব্বাগো আমার ছোটভাই জন্মেছে দেশ স্বাধীনের পরপরই। কোনো দিন আব্বা বলে ডাকতে পারেনি আমার আদরের ছোট ভাইটি।

দেশ স্বাধীনের পর আমরা অনেক দিন অপেক্ষা করেছি আব্বা তুমি হয়তো ফিরে আসবে। কিন্তু অভিমান করে তুমি আর ফিরে আসনি। প্রতিবছর বিজয় দিবস এবং স্বাধীনতা দিবস পালন হয় নানা অনুষ্ঠানে। কিন্তু আমরা কোনো অনুষ্ঠান করতে পারি না। এই দিবস দুটি এলে চোখের পানি ছাড়া আর কিছু আসত না। তবে এখন আর চোখের পানি আসে না। আসে শুধু দীর্ঘশ্বাস। ভাবি আমার আব্বা তো দেশের জন্য জীবন দিয়েছে। যেমন ৩০ লাখ বাঙালি দিয়েছে। তাদের চেয়ে আমার আব্বা ব্যতিক্রম নয়। আব্বা তোমাকে হারানোর আগে মামাকেও হায়েনারা নির্মমভাবে হত্যা করে। আমার খালাও লালমণির হাট সীমান্তে স্বাধীনতাবিরোধী এক ডাকাতের নির্যাতনে মারা গিয়েছে। আশাকরি তুমি তাদের নিয়ে ভালো আছ।

আব্বাগো এক সময় তুমি প্রতি বৃহস্পতিবার স্বপ্নে আমার মায়ের কাছে আসতে। মায়ের সাথে কথা বলতে। অনেক দিন হয় তুমি আর মায়ের সাথে দেখা কর না। এ নিয়ে মা খুবই চিন্তিত। আদরের ছোট ভাইটি এখন মাকে নিয়ে সুদূর কানাডা থাকে। তুমি কি তাদের সাথে দেখা করো?

আব্বাগো তোমার অনুমতি না নিয়ে মা আমার বিয়ে দেয়ায় তুমি স্বপ্নে মার সাথে রাগ করেছিলে। সেই থেকে তুমি আর আগের মত আমাদের সাথে দেখা দাও না। তাই মাঝে মধ্যে মনে হয় আব্বা তুমি কি আমাদের ভুলে গেছ?

আব্বাগো সর্বশেষ তুমি দেখা দিয়েছিল আমার স্বামীর যখন অসুখ হলো। হাসপাতালের বিছানায় স্বামী আমার সাথে রাগ করায় আমি বাড়িতে এসে ছোট দুটি ছেলেমেয়ে কোলে নিয়ে সারা রাত কেঁদেছিলাম। মধ্যরাত পেরিয়ে হঠাৎ তুমি এলে। সান্ত্বনা দিলে- কাদিস না মা, সব ঠিক হয়ে যাবে। এখনও যখন নিজেকে খুব অসহায় মনে হয় তখন তোমাকে মনে করে নিজের মাঝে সাহস সঞ্চয় করি। মনে করি তুমি তো রয়েছ তারাদের দেশে। মেয়ের বিপদ-আপদ, ভালো-মন্দ সব কিছুই দেখছ।

আব্বা একটি কথা ভাবলে এখনো অবাক লাগে। যে দেশের জন্য তুমি জীবন দিলে, প্রশ্ন জাগে সেই দেশ, সেই জাতি তোমাকে কি দিলো? অবশ্য কিছু পাওয়ার আশায় তো তোমার মত শহীদেরা জীবন উৎসর্গ করেনি। আব্বাগো তুমি জেনে হয়তো খুশি হবে তোমার নৌকা মার্কাই এখন দেশ পরিচালনা করছে। তবে দুঃখের বিষয় এই, তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত করলেও শহীদ কিংবা শহীদ পরিবারগুলোর জন্য কিছু করছে না। আব্বাগো তুমি যেখানে রয়েছ, সেখানে কি তোমার মতো আরো ৩০ লাখ শহীদ রয়েছে? যদি তোমরা একসঙ্গে থাকো তাহলে সরকারকে একটু বুঝাও- দেশের জন্য যারা মৃত্যুবরণ করেছে তাদের সবাইকে যেন তারা শহীদের মর্যাদা দেয়।

লেখিকা শহীদ পরিবারের সন্তান




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৭ জুন ২০১৯/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন