ঢাকা, শুক্রবার, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

আইন প্রণেতা, আইনের শাসন, আইনজীবী; সব গেল কই?

প্রভাষ আমিন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৭-২০ ৯:০৯:২৮ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৭-২০ ১১:৩৭:৪৯ এএম

|| প্রভাষ আমিন ||

ঘটনাটা যে এমন হবে, সে আশঙ্কা আমি আগেই করেছিলাম। আমি লিখেছিলামও: ‘যত দোষ, নারী ঘোষ’। সব ঘটনার পেছনেই নারীর দায় খোঁজেন, এমন এক বিচারকের কথা লিখেছিলাম আগের লেখায়। নারীটা কে? এই প্রশ্নের জবাব পেলেই যার বিচারকাজ শেষ হয়ে যেতো। আমি জানতাম বরগুনার ঘটনায় কোনো না কোনোভাবে নিহত রিফাত শরীফের স্ত্রী আয়েশা আক্তার মিন্নীকে জড়াতে পারলেই, বিচার হয়ে যাবে। যদিও আমরা ভিডিওতে দেখেছি মিন্নী তার স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু এখন পুলিশ বলছে, মিন্নী তার স্বামী হত্যা পরিকল্পনায় জড়িত। শুরুতে আমি ধরে নিচ্ছি, পুলিশের দাবিই সত্য। কিন্তু তারপরও কয়েকটি প্রশ্ন থেকে যায়- স্বামীকে হত্যা করে মিন্নীর লাভ কী? আর সবার সামনে হত্যা করালেন কেন? মিন্নী যদি পরিকল্পনার অংশ হন, তাহলে তো খুনীরা রিফাতের সব খবর পেতে পারতো এবং সুবিধাজনক সময়ে গোপনে হত্যা করতে পারতো? আর মিন্নী যদি পরিকল্পনার অংশ হবেনই, তবে তিনি ঘটনাস্থলে স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেন কেন? এটা তো সহজ হিসাব, যে কোনো একজন আসামী ধরা পড়লেই মিন্নীর সম্পৃক্ততা থাকলে সেটা বের হয়ে যাবে। স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টা দেখিয়েও যে নিজে বাঁচতে পারবেন না, এটা তো মিন্নীর অজানা থাকার কথা নয়।

এতগুলো প্রশ্নের পরও আমি পুলিশের কথা বিশ্বাস করছি। নিশ্চয়ই কোনো না কোনো শক্ত ক্লু'র ভিত্তিতেই পুলিশ মিন্নীকে সাক্ষি থেকে আসামী বানিয়েছে। তবে আরো কিছু প্রশ্ন ও সংশয় জানিয়ে রাখি। ঘটনার পরপরই মিন্নীকে ফাঁসানোর একটা চেষ্টা ছিল। বোঝাই যাচ্ছে, বরগুনায় ‘০০৭ বন্ড’দের সৃষ্টিকর্তাদের আড়াল করার সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। সেই চেষ্টার অংশ হিসেবে প্রথম সুযোগেই নয়ন বন্ডকে ক্রসফায়ারে দেয়া হয়েছে। নয়ন বন্ডের হত্যার সাথে সাথে বন্ধ হয়ে গেছে বিশাল এক অন্ধকার জগতের দরজা। নয়ন বন্ডের মৃত্যু হলেও রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজী যে বেঁচে যাবেন- সেটা আমি আগেই জানতাম। কারণ তাদের খালু জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। এমন খালু-মামা থাকলে সাত খুন মাফ! রিফাত ও রিশানকে ক্রসফায়ারে না দেয়ায় আমি খুশি। কিন্তু আমার ধারণা শুধু ক্রসফায়ার থেকে নয়, খুনের বিচারেও তারা রক্ষা পেয়ে যাবে। তাদের বাঁচাতেই চলছে নানান আয়োজন। মিন্নীকে গ্রেপ্তারের পর সবার নজর এখন তার দিকে। এই ফাঁকে আড়ালে কত খেলা হবে, কে জানে!

প্রথমে মিন্নীকে ‘চরিত্রহীন’ বলে চিত্রিত করার চেষ্টা হয়েছে। নারীদের হেনস্থা করার প্রাচীনতম অস্ত্র এটি। মিন্নীর নাকি নয়নের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। ধরে নিচ্ছি- ছিল। তাতে কার কি অসুবিধা? যে কোনো সম্পর্কে বিশ্বস্ত থাকাটা জরুরি। কিন্তু সেই জরুরি বিষয়টা নারী-পুরুষ সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। একজন নারী দুইজন পুরুষের সঙ্গে হেসে কথা বললেই তিনি ‘চরিত্রহীন’। আর একজন পুরুষ ১০ জনের সঙ্গে মেলামেশা করলে তিনি ‘প্লেবয়’, সবাই তাকে ঈর্ষা করবে, গোপনে গিয়ে বলবে- বস, ক্যামনে পটান? একটু টিপস দেন। নারী-পুরুষের চরিত্র মাপার এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড না বদলানো পর্যন্ত আমাদের চিন্তা স্বচ্ছ হবে না। আপনি সবার সাথে ঘুরে বেড়াবেন, আর বিয়ের সময় কুমারী পাত্রী খুঁজবেন- এ কেমন বিচার? তাহলে আপনি যাদের ‘কুমারিত্ব’ হরণ করলেন, তাদের কি বিয়ে হবে না? গ্রামে পাত্রী দেখার নামে মেয়েদের চুল টেনে, হাঁটিয়ে দেখা হয়- কী অপমান! কদিন আগে শুনলাম চাঁদপুরে এক মেয়ের চাচা পাত্রের বিশেষ অঙ্গ দেখতে চেয়েছিলেন। মেয়েদের সম্মান বাঁচাতে এমন আরো অরেক চাচা দরকার। চরিত্রহীন গল্পে সুবিধা করতে না পেরে ঘটনার ১৭ দিন পর মাঠে নামানো হয় নিহত রিফাত শরীফের বাবাকে। তিনি পুত্র হত্যার দায়ে পুত্রবধূ মিন্নীকে গ্রেপ্তারের দাবি জানান। পরদিন মিন্নীকে গ্রেপ্তারের দাবিতে মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধির ছেলে। দুয়ে দুয়ে চার মেলানোর চেষ্টা করতে থাকুন। এরপর আসামীদের শনাক্ত করার কথা বলে পুলিশ লাইনে নিয়ে ১৩ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর মিন্নীকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় পুলিশ। অনেক প্রশ্ন, অনেক সংশয় সত্বেও মিন্নীকে গ্রেপ্তার পর্যন্ত ঠিক আছে। সন্দেহ হলে পুলিশ গ্রেপ্তার করতেই পারে। আর সন্দেহ করার অনেকগুলো কারণ ও প্রমাণের কথা বলছে পুলিশ। আমাদের যত অবিশ্বাসই হোক, সত্য কখনো কখনো গল্পের চেয়েও ভয়ঙ্কর। তবে মিন্নী খুনী হোক, চরিত্রহীন হোক; তার গ্রেপ্তার পরবর্তী প্রক্রিয়া নিয়ে আমার প্রবল আপত্তি আছে। আদালতে মিন্নীর পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না, এটা প্রচলিত আইনী ধারণার লঙ্ঘণ। রায় না হওয়া পর্যন্ত সবাই নির্দোষ। আইনের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার সবারই আছে। এমনকি পলাতক যুদ্ধাপরাধী ও বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার পলাতক আসামীদের পক্ষেও রাষ্ট্র আইনজীবী দিয়েছিল। গণআদালতেও গোলাম আযমের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন। আগে আমি ভাবতাম, সব মামলাতেই তো এক পক্ষ সত্য, আরেক পক্ষ মিথ্যা। আইনজীবীরা তো জেনেশুনে মিথ্যার পক্ষে লড়াই করেন। আমার ভাবনা ছিল, আইনজীবীরা জেনেশুনে মিথ্যার পক্ষে লড়েন কেন? তাদের পেশার এথিক্স কী বলে? আইনজীবীরাই বলছেন, প্রত্যেক নাগরিকের আইনের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার আছে। আইনজীবীদের লড়াইটা আসলে মিথ্যার পক্ষে নয়, সত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লড়াই। আইনজীবীদের এথিক্স হলো- যে পক্ষেই থাকুন, তারা সত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবেন; মামলা জিততে তারা কোনো মিথ্যার আশ্রয় নেবেন না। মিন্নীর পক্ষে কোনো উকিল ছিলেন না, এটা আইনের শাসনের লঙ্ঘণ। বরগুনার আইনজীবীরা তাদের পেশাকে অপমান করেছেন। যে মেয়ের বিরুদ্ধে স্বামী হত্যার অভিযোগ, যার বিরুদ্ধে দুজনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার অভিযোগ; পুলিশ রিমান্ডে তার সঙ্গে কী ধরনের আচরণ হতে পারে; সেটা কি বিচারক ভেবে দেখেননি? পুলিশ মুখে কী বলবে, এটা ভেবেই আমি শঙ্কিত।

আমাদের মূল সমস্যা হলো- আইনের শাসন না থাকা, ন্যায়বিচারে দীর্ঘসূত্রতা। আইনের শাসন থাকলে রিফাত শরীফকে এভাবে মরতে হতো না, কুমিল্লায় আদালতে বিচারকের সামনে মানুষ খুন হতো না, শিশুরা ধর্ষিত হতো না, শিশুর কাটা মুণ্ডু হাতে নিয়ে মানুষ ঘুরে বেড়াতো না।

আইনের শাসন না থাকা, আইনজীবীদের এথিক্স ভুলে যাওয়া এবং এক আইন প্রণেতার আইন হাতে তুলে নেয়া অনেকের নজর কেড়েছে। এক সংসদ সদস্য গত সপ্তাহে স্থানীয় পার্কে গিয়ে ১৮ জন তরুণ-তরুণীকে ধরে পুলিশের মাধ্যমে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের হাতে তুলে দিয়েছেন। স্থানীয় অভিভাবকরা নাকি সাংসদের পুলিশিং-এ খুশি। কিন্তু তিনি যেটা করেছেন, সেটা অন্যায় এবং বে-আইনী। তরুণ-তরুণীরা পার্কে প্রেম করতে যায়। আর প্রেম করা অন্যায় নয়, বে-আইনী বা অসামাজিকও নয়। তরুণ-তরুণী প্রেম করছে; এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর কিছু নেই! এমপি সাহেব কখনো প্রেম করেছেন কিনা জানি না, করলে জানবেন, যে তরুণ প্রেম করে, সে ধর্ষণ করে না, মাদকাসক্ত হয় না। পার্কে তরুণ-তরুণীরা প্রেম করছে, এই দৃশ্য এমপি সাহেবের মনে ক্রোধের আগুন জ্বালালো কেন- জানি না। তবে তিনি আইন লঙ্ঘণ করেছেন। বাংলাদেশে সে সুযোগ নেই, কিন্তু ১৮ তরুণ-তরুণীর যে কেউ চাইলে এমপির বিরুদ্ধে মানহানীর মামলা করতে পারতেন। যে এমপি’র ছেলে মাতাল হয়ে গাড়ি চালিয়ে মানুষ খুন করে, সেই এমপি মাঠে নেমেছেন, আরেকজনের সন্তানকে ঠিক করতে! শুরুটা তিনি ঘর থেকে করলেই ভালো করতেন। মাননীয় সংসদ সদস্য পার্কে অভিযান চালিয়ে বে-আইনী কাজ করেছেন। কারণ এমপি’র যতই গা জ্বলুক; তরুণ-তরুণীরা পার্কে যেতে পারবে না, প্রেম করতে পারবে না; এমন কোনো আইন নেই দেশে। সংসদের আগামী অধিবেশনেই পার্কে যাওয়া এবং প্রেম করা নিষিদ্ধ করে তিনি একটি বিল আনতে পারেন। আইন প্রণয়ন করুন, তারপর পুলিশকে বলুন আইন প্রয়োগ করতে। মনে রাখবেন, আপনার দায়িত্ব আইন প্রণয়ন করা, প্রয়োগ করার দায়িত্ব পুলিশের।

আমরা সবাই যদি ঠিকমত নিজ দায়িত্ব পালন করি- আইন প্রণেতা যদি ঠিক আইন বানান, পুলিশ যদি আইনটি সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করে, ঠিক সময়ে তদন্ত করে, আইনজীবীরা যদি সবার পক্ষে দাঁড়ান, বিচারক যদি দ্রুত বিচার করেন; তাহলেই আইনের শাসন আসবে। নইলে খুন হবে, ধর্ষণ হবে, কোপাকুপি হবে; বিচার হবে না বলে ক্রসফায়ার হবে। দুর্ভাগ্যজনক!

লেখক : বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২০ জুলাই ২০১৯/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন