ঢাকা, শুক্রবার, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

খাদ্যে ভেজাল কিংবা ফরমালিন

জুয়েল আহ্সান কামরুল : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৭-২৭ ৭:৩৫:৩১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৭-২৭ ৭:৩৫:৩১ পিএম

জুয়েল আহ্সান কামরুল : খাদ্যে ভেজাল! কথাটি শুনলেই কলিজা কেঁপে ওঠে। হৃদয়ের বন্দরে ভূমিকম্প হয়! সমুদ্রবন্দরগুলোতে ভূমিকম্প-উত্তর সুনামিও হয়ে থাকে। সুনামির জলে অর্থাৎ জলোচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে নিয়ে যায় সবকিছু। তেমনি আমরা যা খাচ্ছি তা ভেজালমুক্ত নয়; বিষয়টি ভাবলেই পাকস্থলিতে প্রবেশ করা খাবার সহজে হজম হতে চায় না! নানান দুশ্চিন্তায় আঁকড়ে ধরে।

ওই যে বললাম, সুনামির জলস্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যায় সবকিছু। তেমনি ভেজাল খাবার বা ফরমালিনযুক্ত খাবার খেয়ে আমরা আমাদের সবকিছুকে জলে ভাসিয়ে দেব হয়ত কোনো একদিন।

মূল কথা হচ্ছে এই দায়িত্ব কার? মাছ, শাকসবজি, ফলমূলসহ কত কত খাবার থেকে ফরমালিনমুক্ত করার জন্য অসংখ্য পন্থা অবলম্বন করতে হচ্ছে গ্রহীতাকে। খাওয়া বা রান্না করার আগে ঠান্ডা বা গরম পানিতে ভিজিয়ে রাখছেন, কেউ আবার লবণপানিতে; কেউ কেউ আবার ভিনেগার মেশানো পানিতে ইত্যাদি। এসব প্রক্রিয়ায় খাবার থেকে ফরমালিন দূর করা বা খাবারকে বিশুদ্ধ করার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন। প্রায় সবাইকে প্রতিদিন সংগ্রাম করতে হচ্ছে খাবার বিশুদ্ধ করার কাজে। খাবার হচ্ছে জীবন। খাবার না খেয়ে প্রাণী বাঁচতে পারে না। প্রাণী চায় দীর্ঘজীবন পেতে। সেটাই স্বাভাবিক। ওই যে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রাণ কবিতায় প্রারম্ভেই রয়েছে, ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই’।

আশ্চর্য! কোনো কোনো ব্যবসায়ী চায় খাদ্যে ভেজাল মিশিয়ে অথবা ফরমালিন মাখিয়ে ব্যবসায় আরো মুনাফা করতে! চায় ধনী হতে, অনেক টাকাওয়ালা হতে। মানুষ মরুক। দেশের অবস্থা যা ইচ্ছে তাই হোক। তাতে কার কী! নিজে বাঁচলে বাবার নাম।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমার বাবা না হলে এই পৃথিবীতে আমার অস্বিত্ব থাকত না। সুতরাং আমাদেরকে সারাক্ষণ কেবল নিজের চিন্তা নয়, আমাদের বাবা অর্থাৎ অস্বিত্বের চিন্তাও করা উচিৎ। বাবা অথবা মা, যা-ই বলুন না কেন, তা দিয়ে বুঝে নিতে হবে আমাদের দেশ-জাতি-মানুষ ও সমাজ কিংবা এই ধরিত্রী।

আমরা সাধারণত ভেবে থাকি ব্যক্তি সফলতার জন্যে, ব্যবসায়ী হিসেবে সফল হতে হবে। তাহলে আমাকে আর কে নাগাল পায়। কার সাধ্য আছে আমার ধারে-কাছে আসতে পারে?

আসল ব্যাপারটি আমরা খুব গভীরে ভেবে দেখি না কেউ। আমিও যে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে নই। আমাকেও স্পর্শ করা যাবে। আমাকেও পাবে। কারণ, আমি ও আমাদের সন্তান বা পরিবারের সকলে এখানে-সেখানে ভেজালযুক্ত খাবার কিংবা ফরমালিন দেয়া খাবার খেয়ে যাচ্ছি। আর এসবের কারণেই আমাদের মানবশরীর প্রায়ই অসুস্থ হতে দেখা যায়। ধীরে ধীরে ভয়ঙ্কর অসুখগুলোও বৃদ্ধি পাচ্ছে। দিনকে দিন আমাদের এলডিএল কোলেস্টেরল বেড়ে যাচ্ছে। হৃদযন্ত্রের ধমনীতে আগের চেয়ে অধিক ব্লক দেখা দিচ্ছে। ঘরে ঘরে এখন অনেকে বহুমূত্র (ডায়াবেটিস) রোগে একাকার! আর এই বহুমূত্র রোগ যে কতটা নীরব ঘাতক, যিনি ভুক্তভোগী তিনিই জানেন। কর্কট রোগের (ক্যানসার) কথা তো বলে বোঝাতে হবে না আমাদেরকে। কারণ, আমরা দেখতে পাচ্ছি চারদিকে আজ অগণিতজন এই দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত! ক্রমশ ধ্বংসের উৎস যেন গেড়ে বসছে মানবদেহে।

সুতরাং এখনো আমাদের হাতে সময় রয়েছে, আসুন সাবধান হই। মানুষকে বাঁচাই, আমিও বাঁচি।

খাবারে ফরমালিন দেয়া বা খাদ্যে ভেজাল দেয়া বন্ধ করবে কে? আমি, আপনি, সমাজ, দেশ না রাষ্ট্র? একবার খুব গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে দেখুন তো এই দায়িত্ব কি কেবল রাষ্ট্রের? রাষ্ট্রের দায়িত্ব তো অবশ্যই। পাশাপাশি এই দায়িত্ব কি আমার বা আপনার নয়? নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব কিন্তু অন্যের নয়। কারণ, আমি এই বিপুলা পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা উন্নত মানসিকতার বিবেক বুদ্ধিসম্পন্ন মানবজাতির একজন। সৃষ্টিকর্তা যেহেতু আমাকে বিবেক দিয়েছেন, দীর্ঘজীবী হওয়ার রাস্তা দেখিয়েছেন, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে রক্ষা করার ভাবনা দিয়েছেন, তবে কেন আপনি কিংবা আমি অসৎ কাজ করছি? মানুষ হয়ে মানুষের খাবারে ভেজাল মেশাচ্ছি! নকল ওষুধ বানাচ্ছি!

লেখক : জাপান প্রবাসী লেখক ও নাট্যকার


রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৭ জুলাই ২০১৯/সাইফ/রফিক

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন