ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩০ আশ্বিন ১৪২৬, ১৫ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

স্বীকৃতি দিতে বাধা কোথায়?

রাহাত সাইফুল : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৮-২১ ৬:৪৭:২৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৮-২২ ৯:১১:২৮ এএম

রাহাত সাইফুল: আব্দুল জব্বার খান, জহির রায়হান, রাজ্জাক, জাফর ইকবাল, জসিম, সালমান শাহ, মান্নাসহ অনেকেই ঢাকাই চলচ্চিত্রে বিশেষভাবে জড়িয়ে আছেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের দীর্ঘ ইতিহাস ও গৌরবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের নাম। তারা দর্শকদের ভালোবাসা হৃদয়ে নিয়ে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। অগণিত দর্শক এখনো তাদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। কিন্তু স্বীকৃতিস্বরূপ কী পেয়েছেন তারা? গুণীজনদের স্বীকৃতি দিতে বাধা কোথায়?

বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নায়ক রাজ্জাক। এই অভিনেতা ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট অগণিত ভক্তকে চোখের জলে ভাসিয়ে ইন্তেকাল করেন। তখন জোর দাবি উঠেছিল তার নামে শুটিং ফ্লোর করার। এফডিসির এমডির কাছে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি লিখিতভাবে এই দাবি জানিয়েছিল। দেখতে দেখতে দুই বছর পার হয়ে গেলেও এর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।  দেশ বিভাগের পর পশ্চিম পাকিস্তানের চলচ্চিত্র প্রযোজক এফ দোসানির পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্র প্রযোজনার ব্যাপারে নেতিবাচক মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে ১৯৫৬ সালে জব্বার খান ‘মুখ ও মুখোশ’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। চলচ্চিত্রের এই দিকপালের নামে নেই কোনো স্থাপনা।

সত্তর দশকে ঢাকাই চলচ্চিত্রে যুক্ত হন জনপ্রিয় অভিনেতা জাফর ইকবাল। তিনি একাধারে মুক্তিযোদ্ধা, অভিনেতা ও সংগীতশিল্পী ছিলেন। বাংলা চলচ্চিত্রের স্টাইলিশ নায়কদের অন্যতম জাফর ইকবাল। শহুরে রোমান্টিক ও রাগী তরুণের ভূমিকায় দারুণ মানালেও সব ধরনের চরিত্রে ছিল তার স্বাচ্ছন্দ্য বিচরণ। অভিনয়ের পাশাপাশি চমৎকার গান গাইতে পারা এ অভিনেতা বেশকিছু সিনেমায় গায়কের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ১৯৮৪ সালে আনোয়ার পারভেজের সুরে রাজ্জাক অভিনীত ‘বদনাম’ সিনেমায় ‘হয় যদি বদনাম হোক আরো’ তার জনপ্রিয় গানগুলোর অন্যতম। ‘আপন পর’ সিনেমায় কবরীর বিপরীতে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে পা রাখেন তিনি। সব মিলিয়ে প্রায় ১৫০ সিনেমায় অভিনয় করেন। যার বেশিরভাগই ছিল ব্যবসাসফল। স্টাইলিশ এই তারকার আলোও নিভে যায় অকালে। ১৯৯২ সালের ২৭ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন তিনি। তার নামেও নেই কোনো স্থাপনা।

জাফর ইকবালের মৃত্যুর এক বছর পর ঢাকাই চলচ্চিত্রে পা রাখেন নায়ক সালমান শাহ। ১৯৯৩ সালে তার অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ মুক্তি পায়। জনপ্রিয় এই নায়ক নব্বইয়ের দশকে সাড়া জাগানো অনেক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ‘সুজন সখি’, ‘বিক্ষোভ’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘বিচার হবে’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘জীবন সংসার’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘আনন্দ অশ্রু’সহ ২৭টি চলচ্চিত্র অভিনয় করেন। যার সব ক’টি-ই ছিল ব্যবসাসফল। ঢাকাই চলচ্চিত্রে আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তা ছিল সালমান শাহর। ক্যারিয়ারের তুঙ্গে থাকা অবস্থায় অর্থাৎ ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। নব্বই দশকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এ নায়কের নামে শুটিং ফ্লোর করার জোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন সালমান ভক্তরা। মৃত্যুর দুই দশক পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত তার নামেও কোনো স্থাপনা তৈরি করা হয়নি।

১৯৫৭ সালে চলচ্চিত্র জগতে পদার্পণ ঘটে জহির রায়হানের। ‘কখনো আসেনি’, ‘সঙ্গম’, ‘কাঁচের দেয়াল’ নির্মাণ করেন। তার নির্মিত অন্যান্য চলচ্চিত্র হলো— ‘বেহুলা’, ‘সঙ্গম’, ‘আনোয়ারা’। কলকাতায় তার নির্মিত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’র বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয়। চলচ্চিত্রটি দেখে সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা এবং ঋত্বিক ঘটক ভূয়সী প্রশংসা করেন। জহির রায়হান ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি ভাইয়ের সন্ধানে মিরপুরে যান এবং সেখান থেকে আর ফিরে আসেননি। এভাবেই হারিয়ে গেছেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের একজন দিকপাল জহির রায়হান। বিএফডিসিতে তার নামে ‘জহির রায়হান ডিজিটাল কালার ল্যাব’ তৈরি করা হয়েছে। এটা প্রসংশনীয়। এছাড়া অ্যাকশন মাস্টার নায়ক জসিমের নামে বিএফডিসিতে ২নং শুটিং ফ্লোর করা হয়। ১৯৯৮ সালের ৮ অক্টোবর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে অকাল মৃত্যু হয় এই অ্যাকশন হিরোর।

৯০ দশকের শেষের দিকে অশ্লীলতার ভূত এসে ভর করে এদেশের চলচ্চিত্রে। এরপর থেকে ঢাকাই চলচ্চিত্রের শক্ত অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যায়। ধীরে ধীরে হলবিমুখ হয় দর্শক। অশ্লীলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন এস এম আসলাম তালুকদার মান্না। অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র প্রযোজনাও করেছেন তিনি। ‘দাঙ্গা’, ‘লুটতরাজ’, ‘তেজী’, ‘আম্মাজান’, ‘আব্বাজান’, ‘লাল বাদশা,’ ‘স্বামী স্ত্রীর যুদ্ধ’, ‘দুই বধূ এক স্বামী’, ‘মনের সাথে যুদ্ধ’, ‘পিতা মাতার আমানত’সহ তিন শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করে জনপ্রিয়তার চূড়া ছুঁয়েছিলেন মান্না। ২০০৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তার নামে মান্না ডিজিটাল কমপ্লেক্স করা হয়। তাদের প্রস্থানে আজ ঢাকাই চলচ্চিত্র যেন খেই হারিয়ে ফেলেছে। সিনিয়র শিল্পীর অভাবে নির্মাতারা এখন নায়ক-নায়িকাকে কেন্দ্র করে সিনেমা নির্মাণ করছেন। একই ধরনের গল্পের সিনেমা দেখে দর্শক বিরক্ত। দর্শক হল বিমুখ হচ্ছেন। দর্শকবিহীন সিনেমা হলগুলো ধুঁকে ধুঁকে চলছে। গুণীদের মধ্যে এখনো জীবিত রয়েছেন সোহেল রানা, ফারুক, ওয়াসিম, আলমগীর, ইলিয়াস কাঞ্চন, জাভেদ, ববিতা, শাবানাসহ অনেক গুণী অভিনয়শিল্পী।

গুণীজনদের মনে রাখতে আগামী প্রজন্মের জন্য তাদের চলচ্চিত্র ছাড়া আর কিই-বা আছে। আবার এসব চলচ্চিত্রের অধিকাংশ ফিল্ম আর্কাইভে এখন পাওয়া যাচ্ছে না। একটা সময় তাদের স্মৃতিচিহ্ন মুছে যাওয়ার আশঙ্কা কাজ করছে! সুতরাং এসব শিল্পীদের নামে অন্তত স্থাপনা নির্মাণ করেও আগামী প্রজন্মকে স্মরণ করানো যেতে পারে। অন্তত এসব স্থাপনা থেকে যাতে পরবর্তী প্রজন্ম এই গুণীজনদের নাম জানতে পারে, গর্ব করে বলতে পারে— আমাদেরও আব্দুল জব্বার খান, জহির রায়হান, রাজ রাজ্জাক, জাফর ইকবাল, জসিম, সালমান শাহ, মান্নার মতো সুপার স্টার ছিল!


রাইজিংবিডি/ঢাকা/২১ আগস্ট ২০১৯/রাহাত/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন