ঢাকা, বুধবার, ১ কার্তিক ১৪২৬, ১৬ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

ক্যাসিনো সাম্রাজ্যে হঠাৎ ঝড় কিসের আলামত?

মাছুম বিল্লাহ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৯-২১ ৪:৪৮:২০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৯-২১ ৮:৫৩:১১ পিএম

গত ১৮ সেপ্টেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে পড়লাম রাজধানীর বিভিন্ন স্পটে ৬০টি ক্যাসিনো রয়েছে। এ ছাড়াও অলি-গলিতে না কি ছোট আকারেও ক্যাসিনো আছে। এসব ক্যাসিনোতে অবৈধ ব্যবসাসহ হাউজি খেলা ও নারী সম্ভোগের ব্যবস্থাও রয়েছে। এগুলো পরিচালনার জন্য নেপাল, থাইল্যান্ডসহ চারটি দেশ থেকে প্রশিক্ষিত নারী আনা হয়েছে। ক্যাসিনোগুলোতে প্রতি রাতেই কোটি টাকার খেলা হয়। এসব নিয়ন্ত্রণ করেন রাজনৈতিক নেতারা। রাত যত বাড়তে থাকে ততই এসব ক্যাসিনো জমে ওঠে। ভিড় করতে থাকেন প্রভাবশালীরা। অনেক সময় তাদের সঙ্গে থাকেন উঠতি কোনো নায়িকা কিংবা মডেল।

উন্নত বিশ্ব, পর্যটন সিটি ও মাদকের আখড়ার শহরগুলোর কালচার হচ্ছে ক্যাসিনো। আমাদের যানজটের শহর, ঘন বসতির শহর এবং পরিবেশ ও নাগরিক সুবিধার দিক দিয়ে বসবাসের অযোগ্য শহরে ক্যাসিনো- অবাক করার মতো বিষয় বটে! এগুলো তো উন্নয়নের চিহ্ন নয়, নাকি এর পিছনে রয়েছে অন্য কিছু? যেমন আফ্রিকার অনেক দেশে মানুষের পেটে খাবার নেই, গায়ে জামা নেই, অথচ রাতভর ক্যাসিনো থাকে সরগরম।

সকালে পত্রিকার পাতায় খবর দেখার পর সন্ধ্যায় টেলিভিশনে দেখলাম ক্যাসিনোগুলোতে হানা দিয়েছে র‌্যাব। সবই যেন হঠাৎ ঘটে গেল। দেশবাসী ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখল ক্যাসিনোর অস্তিত্ব খোদ রাজধানীতেই। যুবলীগ চেয়ারম্যানকেও দেখলাম আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বলছেন- হঠাৎ কেন? আপনারা এতদিন কি আঙুল চুষছিলেন?

গত ১৯ তারিখ পত্রিকা পড়ে জানতে পারলাম দুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং বলেছেন, ‘যুবলীগ ঢাকা মহানগরের একজন নেতা যা ইচ্ছে করে বেড়াচ্ছে, চাঁদাবাজি করছে। আরেকজন দিনের বেলায় প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে চলেন। যারা অস্ত্রবাজি করেন, ক্যাডার পোষেন তারা সাবধান হয়ে যান। তা না হলে যেভাবে জঙ্গি দমন করা হয়েছে, একইভাবে তাদেরকেও দমন করা হবে।’ মূলত দল ও অঙ্গ সংগঠনের ভেতর থাকা অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রী ইঙ্গিত দেয়ার পরই  রাজধানীতে র‌্যাবের অভিযান শুরু হয়েছে। ১৯ সেপ্টেম্বর বিকেলে প্রথমেই ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাধারণ কর্মী থেকে এই খালেদ হয়ে উঠেছিলেন অপকর্মের গডফাদার। রাজধানীর উত্তর-দক্ষিণাঞ্চলে আধিপত্য ছিল তার। তার বাড়ি থেকে তিনটি অস্ত্র, গুলি ও ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে।

প্রায় একই সময় ফকিরাপুল এলাকায় খালেদের নিয়ন্ত্রিত ইয়ংমেন্স ক্লাবে চালানো ক্যাসিনোতে অভিযান চলে। সেখান থেকে ১৪২ জনকে আটক করে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়। রাতে আরও তিনটি ক্লাব কাম ক্যাসিনোতে অভিযান চালানো হয়। অভিযান চালানো হয় গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ ওয়ান্ডার্স ক্লাবসহ আরও কয়েকটি ক্যাসিনোতে। ক্যাসিনোগুলো থেকে উদ্ধার করা হয়েছে নগদ টাকা, ক্যাসিনো সামগ্রী, কষ্টিপাথরের মূর্তি। রাজধানীর মতিঝিল, ফকিরাপুল এলাকার কমপক্ষে ১৭টি ক্লাব নিয়ন্ত্রণ করেন যুবলীগ নেতা খালেদ। এর মধ্যে ১৬টি ক্লাব নিজের লোকজন দিয়ে আর ফকিরাপুল ইয়ংমেন্স নামের ক্লাবটি সরাসরি তিনি পরিচালনা করেন। প্রতিটি ক্লাব থেকে প্রতিরাতে কমপক্ষে এক লাখ টাকা করে নেন। লেগুনা ও গণপরিবহন থেকেও টাকা নেন। শাজাহানপুর কলোনি মাঠ, মেরাদিয়া ও কমলাপুর পশুর হাট নিয়ন্ত্রণ করে পান লক্ষ লক্ষ টাকা। প্রতিমাসে এক কোটি টাকার বেশি নেন শাজাহানপুর রেললাইনসংলগ্ন মাছের বাজার থেকে। এ সবকিছুর বলি সাধারণ জনগণ। তাদের চাঁদা দিতে হয় সর্বত্র। নিজের দেশে উৎপাদিত যেসব পণ্য মানুষ কিনতে পারে পাঁচ টাকায় সেই পণ্যই কিনতে হয় পঁচিশ-ত্রিশ টাকায়। কারণ চাঁদা দিতে হয় বিভিন্ন স্তরে, বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্নভাবে। কেউ পিছিয়ে নেই চাঁদা তোলায়- পাতি মাস্তান, ছাত্রনেতা থেকে বড় বড় নেতা পর্যন্ত। এত চাঁদা যদি জনগণকে দিতে হয়, তাহলে জিনিসপত্রের দাম তো বাড়বেই। জনগণ কাকে জানাবে এই ফরিয়াদ? তারা শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু সরকার যারা পরিচালনা করেন তারা কেন এসব দুর্ধর্ষ মানুষদের পার্টিতে জায়গা দেন? শুধু জায়গা দেয়া নয়, বড় বড় পদ দেয়া, সীমাহীন ক্ষমতা দেয়া- এসব আমাদের বুঝে আসে না। অবশ্য আমাদের মতো মানুষের এগুলো বোঝার কথাও নয়। শুধু এটুকু বুঝলাম যে, এদের ছাড়া বোধহয় রাজনীতি চলে না।

বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর একটি  ক্লাবের কমিটিতে যুবলীগের কয়েকজন নেতা অন্তর্ভূক্ত হন। এরপর তাদের প্রভাব বাড়তেই থাকে। ক্লাবে নিয়মিত মদ্যপানের আসর বসানোর পাশাপাশি হাউজি খেলা চালু করেন। এরপর বসে জুয়ার আসর। সেগুনবাগিচার আটটি স্থানেও যুবলীগ মহানগর দক্ষিণের এক শীর্ষ নেতার তত্ত্বাবধানে ক্যাসিনো ব্যবসা চলে। এক্ষেত্রে কয়েকটি বহুতল ভবনের ছাদ দখলে নিয়ে ক্যাসিনো চালানো হয়। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ছয় নেতাসহ অনেকেই আনাগোনা করেন এসব ক্যাসিনোগুলোতে। বড় ৬০টি ক্যসিনোতে প্রতিটিতে গড়ে প্রতিদিন দুই কোটি টাকা করে ১২০ কোটি টাকার খেলা হয়। এই টাকার একটি বড় অংশ হুন্ডির মাধ্যমে চলে যায় বিদেশে। সাধারণ মানুষ নিরাপদ ভেবে অর্থ রেখে দেয় কিছু অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে। কারণ সেখান থেকে কিছু ইন্টারেস্ট আসবে, তা দিয়ে সংসার চলবে। অনেক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী এই আশায় এসব প্রতিষ্ঠানে অর্থ জমা রেখে পথে বসেছেন। কোথায় গেছে টাকা কেউ জানে না। সেগুলো খালি হয়ে গেছে। পথে বসেছেন অনেকে। অথচ বড় বড়  নেতারা লক্ষ লক্ষ নয়, কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন এভাবে, আর তা পাচার করছেন বিদেশে। হায়রে অভাগা দেশ!

একজন মানুষের কত টাকা প্রয়োজন? ৬০, ৭০ কিংবা ৮০ বছরের এই জীবনে কত টাকা প্রয়োজন? এই সুন্দর দেশ, এই সোনার দেশের প্রায় সব মানুষই তো খেয়ে পড়ে শান্তিতে থাকতে পারে। কিন্তু পুরো দেশটাকে তো জাহান্নাম বানায় এসব লোকজনই। আজকে পত্রিকাগুলো লিখছে যুবলীগ নেতা খালেদের কথা। যদি কেউ চাঁদা দিতে রাজি না হতো তাদের উপর চলতো নির্মম নির্যাতন। নির্যাতনের জন্য তিনি তৈরি করেছেন টর্চার সেল। র‌্যাবের অভিযানে টর্চার সেল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে শক দেয়ার অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, গায়ের চামড়া জ্বলে-জ্বালাপোড়া করে এমন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, বিপুল পরিমাণ লাঠি ও হকিস্টিক। যেন মগের মুল্লুকের চেয়েও অন্য কিছু। এদেশের মানুষ স্বাধীনতার ফল ভোগ করবে অথচ তারা তা হতে দেবে না। ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রীকে এত বড় একটি পদক্ষেপ নেয়ার জন্য।

সাধারণ মানুষ কোথাও স্বস্তি পাচ্ছে না। কথায় বলে- পুলিশে ছুঁলে আঠারো ঘা। এখন কেউ যদি বলে ছত্রিশ ঘা- তাহলে কি বাড়িয়ে বলা হবে? মানুষ যাবে কোথায়? জনগণের যারা প্রতিনিধি তারাও দেখুন জনগণের জন্য কি চমৎকার ব্যবস্থা করে রেখেছেন- টর্চার সেল! মিডিয়া এসব তুলে না আনলে দেশের মানুষ কখনও জানতে পারতো না। ধন্যবাদ মিডিয়াকে। জনগণের জন্য অন্তত কাউকে না কাউকে কাজ করতে হবে। জনগণ বাধ্য হয়েই তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন যাতে তারা দেশটাকে ভালো ভাবে পরিচালিত করেন। কিন্তু তারাই যখন ভক্ষক সেজে বসে থাকে তখন আমাদের কপালের দোষ দেয়া ছাড়া কিছু করার থাকে না। এসব নেতারাই দিনে হাজারবার বঙ্গবন্ধুর নাম মুখে নিয়ে এসব অপবিত্র কাজ করে যাচ্ছে দিনের পর দিন। এদের রাজনীতিতে কি খুব প্রয়োজন? ভেবে দেখার সময় এসেছে। আশাকরি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ কথাটুকুও বুঝবেন এবং পদক্ষেপ নিবেন। তার এই পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই প্রশংসিত হয়েছে। যে কারণে ধন্যবাদ তিনি পেতেই পারেন।


ঢাকা/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন