ঢাকা, শনিবার, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

গ্রেটা থানবার্গ ও বৈশ্বিক জলবায়ু পরিস্থিতির বাস্তবতা

অলোক আচার্য : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৯-২৮ ১:১৭:০৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১০-০৮ ২:১১:১৬ পিএম

জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক সম্মেলনে সুইডেনের কিশোরী গ্রেটা থানবার্গের ভাষণ বিশ্ব নেতাদের অন্তর নাড়িয়ে দিতে সক্ষম হলেও তাতে আদৌ অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে- একথা নিশ্চিত বলা যায় না। সম্মেলনের শুরু থেকেই সবার চাওয়া ছিল টেকসই পরিবেশের জন্য বিশ্ব নেতারা কী প্রস্তাব দেন সেদিকে। থানবার্গের ভাষণ কেবল তার কথা নয়, বরং বিশ্বের তরুণ প্রজন্মের কথা। যে প্রজন্ম আন্দোলন করে যাচ্ছে একটি সুন্দর পৃথিবীর জন্য। একটি দূষণমুক্ত নিরাপদ পৃথিবীর দাবি আজ সবার। বিশ্ব নেতাদের কাছে এটাই চাওয়া।

জলবায়ু নিয়ে বিভিন্ন সম্মেলনে বহু সিদ্ধান্ত এসেছে। কিন্তু আমরা তার বাস্তবায়ন এবং প্রভাব দেখেছি খুবই কম। পরিস্থিতি বিরূপ হতে হতে এতটাই বিরূপ হয়েছে যে, কত দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা যায় তার ওপর নির্ভর করছে আমাদের পরবর্তী সময়। এতদিন পর্যন্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রে কেবল পরিকল্পনা ও সদিচ্ছাতেই সিমাবদ্ধ থেকেছে সবাই। আজ কি একজন কিশোরীর কথায় তা পরিবর্তন হবে? হলে কতটুকু হবে?

সোমবার থেকে শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী জাতিসংঘ জলবায়ু বিষয়ক সম্মেলনে ৭৭টি দেশ কার্বন নিঃসরণের হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে। ‘ইউএন ক্লাইমেট অ্যাকশন সামিট’ থেকে আসা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে তা হবে এক অভূতপূর্ব অর্জন। না হলে আগের মতোই তা থেকে যাবে খোলসে বন্দি। গ্রেটা থানবার্গ ভাষণে বলেন, ‘আমরা ব্যাপকমাত্রায় বিলুপ্তির পথে চলতে শুরু করেছি। আর আপনারা শুধু টাকা-পয়সা এবং অনন্তকাল ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির রুপকথার কাহিনি শুনিয়ে চলেছেন- কি সাহস আপনাদের!’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে আপনারা ব্যর্থ হচ্ছেন। কিন্তু তরুণ প্রজন্ম আপনাদের বিশ্বাসঘাতকতা বুঝতে পেরেছে। থানবার্গ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা আরও ১৫ তরুণ জলবায়ু অধিকার কর্মী এই সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন।

থানবার্গের কথাগুলো নেতারা যদি আমলে নেন তাহলে বুঝতে পারতেন কেবল উন্নয়নের বুলি দিয়ে পৃথিবীকে বাঁচানো সম্ভব হবে না। বরং শিল্পের যাতাকলে পৃথিবীর অবস্থা আজ অত্যন্ত করুণ। দেশগুলোর মধ্যে শিল্পোন্নত দেশ জার্মানি জলবায়ু সুরক্ষা তহবিলে বরাদ্দ দ্বিগুণ করার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়- উল্লেখযোগ্য কিছু দেশ এখানে অংশগ্রহণ করেনি। জলবায়ু পরিবর্তনের দায় কেউ এড়াতে পারে না। কিন্তু কেবল উন্নয়নের দোহাই দিয়ে পৃথিবীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে ফেলে তা থেকে পরিত্রাণের উপায় না খোঁজাটা বড় ধরনের বোকামি। ব্রাজিল, সৌদি আরব সম্মেলনে অংশ নেয়নি। গত বছর পোল্যান্ডের কাটোভিৎসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেস সে সময় বলেছিলেন, পোল্যান্ডের এ সম্মেলন ব্যর্থ হলে তা সবুজ অর্থনীতির অপেক্ষায় থাকা মানুষের কাছে একটি বিপর্যয়মূলক বার্তা পাঠাবে। মূলত প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নই দেশগুলোর জন্য একটি বড় লক্ষমাত্রা। প্যারিস চুক্তিতে শিল্প বিপ্লবের পূর্ববর্তী সময়ে যা ছিল তার চেয়ে দুই ডিগ্রী সেলসিয়াসের বেশি না বাড়তে দেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর প্রতিটি দেশ কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে। গত বছর প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের চতুর্থ ন্যাশনাল ক্লাইমেট অ্যাসেসমেন্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র শত শত কোটি ডলার খরচ করলেও লাগামহীন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশটির মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে হুমকির মুখে পড়বে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঐতিহাসিক হারে কার্বন নিঃসরণ অব্যাহত থাকলে চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ কয়েকটি অর্থনৈতিক খাতে বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ শত শত কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে। এই ক্ষতির পরিমাণ বহু রাজ্যের জিডিপির চেয়েও বেশি। ক্ষতির প্রকারে পার্থক্য থাকলেও বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোও রয়েছে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে ফসল নষ্ট হচ্ছে, মরে যাচ্ছে মিঠা পানির মাছ, কমে যাচ্ছে বিশুদ্ধ খাবার পানি। সেই লবণাক্ত পানি পানের কারণে বাড়ছে রোগ আর গর্ভের সন্তানের মৃত্যু ঝুঁকি। দুই সপ্তাহব্যাপী এই সম্মেলনের এবারের মূল লক্ষ্য- প্যারিসে স্বাক্ষরিত চুক্তি বাস্তবায়নে একটি নীতিমালা তৈরি করা। কীভাবে প্যারিস চুক্তি দেশগুলো বাস্তবায়ন করবে তা নির্ধারণ করার জন্যই এই নীতিমালা করা অত্যাবশ্যক বলে মনে করছেন অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিরা।

আবহাওয়ার চরিত্র দীর্ঘ অনেক বছর যাবৎ বদলাচ্ছে। বিশ্বের কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর অন্যতম হলো চীন ও যুক্তরাষ্ট্র। আমরা মূলত এরকম বড় বড় শিল্পোন্নত দেশের কার্বন উৎপাদনের ফলে পরিবেশ বিপর্যয়ের শিকার। এর সঙ্গে রয়েছে নিজেদের ভারসাম্যহীনতা। সব মিলিয়ে অবস্থা যে ভজঘট বোঝা যায়। আমরা পরিস্থিতির শিকার। কিন্তু বসে থাকার কোনো উপায় নেই। নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নিতে হবে। আমরা যদি মনে করি, এর প্রতিকার সরকার একা করবে- তাহলে এটা ভুল চিন্তা। আমরা নিজেদের উদ্যোগেও কাজ শুরু করতে পারি। আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশগুলো আশাবাদী ছিল যে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় উন্নত দেশগুলোকে আমরা পাশে পাবো। যদিও এই জলবায়ু পরিবর্তনে আমাদের দেশের দায় তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু ফল ভোগ করছি আমরাই বেশি। বিশ্বের ১৮০টি দেশের সমর্থনে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের মত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে আর্থিকভাবে সহায়তা করা। কিন্তু সহসা তা হচ্ছে কোথায়? মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ বিষয়ে নিষ্ক্রিয়তা পুরো বিষয়টিকেই হুমকির মুখে ফেলেছে। তবে এই সম্মেলনে তিনি জানিয়েছেন, তিনি পরিষ্কার বাতাস ও পানিতে বিশ্বাস করেন। কিন্তু বর্তমানে আবহাওয়ার যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তাতে পরিষ্কার বাতাস আর নিরপাদ পানি পাওয়া ভয়াবহ সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে মাত্র কয়েকদিন আগেই পানি নিয়ে ভারতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে ভারতের ৭০ শতাংশ ভূগর্ভস্থ এলাকা শুকিয়ে গেছে। তীব্র পানি সংকটে কোটি কোটি মানুষ পানি শরণার্থী হবে। পানি শরণার্থী ধারণাটি খুব বেশিদিনের না হলেও ভবিষ্যত যে ভয়ঙ্কর তা বলা যায়। এই দুরবস্থা যে কেবল ভারতের ভাগ্যেই আছে তা নয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের লক্ষণগুলো ক্রমেই প্রকৃতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পরিবেশ বিপর্যয়জনিত কারণে সবচেয়ে দুর্ভোগে ভুগবে যে দেশ তার মধ্যে প্রথম সারিতেই বাংলাদেশের নাম রয়েছে। আমাদের দেশ নিয়ে চিন্তা তো আমাদেরই হবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির যে প্রবণতা এজন্য সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবেই। ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটবে তখন। এর ফলে আমাদের মত নিচু দেশগুলির একটা বিরাট অংশ সাগরের পানিতে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা হুঁশিয়ারী  দিয়েছেন বহু আগেই। যখনই সংকট সামনে এসেছে তখনই আমরা মাথা ঘামিয়েছি। তারপর ধীরে ধীরে বিষয়টি আমরা ভুলে গেছি। শুধু সেইসব মানুষের মনে দাগ থেকে যায় যারা এর শিকার হয়েছে। বহু বছর তারা এর ক্ষতচিহ্ন বহন করেছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশে নতুন নয়। বিভিন্ন সময় প্রচুর মানুষ মারা গেছে। ১৯৭০ সালে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ১০ লাখ লোক মারা গিয়েছিল। পার্শ্ব ক্ষয়ক্ষতি ছিল আরও ভয়ঙ্কর। ১৯৯১ সালের ঝড়ে প্রায় দেড় লাখ লোক নিহত হয়েছিল। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে পৃথিবী প্রাণীকুলের বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে যাচ্ছে। ফলে জলবায়ু স্বাভাবিক মাত্রায় ফিরিয়ে আনতে প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। কার্বন নিঃসরণের মাত্রা কমাতেই হবে। এজন্য কেবল ভাষণে আর চুক্তিতে সিমাবদ্ধ না থেকে কার্যকরী উদ্যোগ নিতে হবে। গ্রেটা থানবার্গের মতো অসংখ্য ভবিষ্যত প্রজন্মের ভবিষ্যত সুরক্ষিত করতে বিশ্ব কি করবে তা সময়ই বলে দিবে। কিন্তু বিষয়টি উপেক্ষা করলে প্রকৃতির রোষানল থেকে আমাদের কেউ রক্ষা করতে পারবে না। থানবার্গের ভাষণের বাস্তবতা হলো সেই প্রবাদের মতো- the sooner, the better.

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট


ঢাকা/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন