ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ২১ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

আহ্‌ সাকিব! || দেবব্রত মুখোপাধ্যায়

দেবব্রত মুখোপাধ্যায় : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১০-৩১ ২:৩৬:৫২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-০৮ ৪:২৬:৫৩ পিএম

সাকিব আল হাসান।

গত প্রায় দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের নতুন এক পরিচয়ের নাম সাকিব। এই ছোট্ট দেশটি থেকে তিনি হয়ে উঠেছেন বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের একজন। ব্যাট হাতে, বল হাতে একটার পর একটা বিশ্বরেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন। একের পর এক সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারদের পাশে নাম লিখিয়েছেন।

কখনো ইমরান খান, কখনো ইয়ান বোথাম, কখনো গ্যারি সোবার্সদের রেকর্ড ম্লান করে দিয়েছেন আমাদের একজন সাকিব আল হাসান। মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাবের (এমসিসি) মতো দুনিয়ার সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত ও ক্রিকেট আইনের অভিভাবক সংস্থার বৈশ্বিক ক্রিকেট কমিটির সদস্য হয়েছেন। এই তো ২০১৯ বিশ্বকাপেই সাকিব হয়ে উঠেছিলেন দুনিয়াজুড়ে ক্রিকেটের নতুন এক ব্র্যান্ড। সেই সাকিব আল হাসানকে নিয়ে এক বিষাদময় গল্প লিখতে হচ্ছে! সেই সাকিব আল হাসান এখন ক্রিকেট বাজিকরদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার দায়ে এবং তাদের সঙ্গে কথোপকথন গোপন করার দায়ে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ!

বাংলাদেশের ক্রিকেট বা বিশ্ব ক্রিকেট গত কয়েক মাস ধরেই আসলে সাকিবময়। প্রথমে বিশ্বকাপে অতিমানবীয় পারফরম্যান্স করে ফিরলেন দেশে। এবারের বিশ্বকাপে ব্যাট হাতে ৬০৬ রান করেছিলেন এবং বল হাতে ১১টি উইকেট নিয়েছিলেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন ভয়ানক অলরাউন্ড পারফরম্যান্স আর কখনোই দেখতে পাওয়া যায়নি। মনে করা হয়েছিলো, শুধু এই কারণেই বছরটা সাকিব আল হাসানের বছর হয়ে থাকবে। কিন্তু আরও অনেকটা গল্প তখনও বাকী রয়ে গেছে।

সাকিব এই বছরেই এসে নেতৃত্ব দিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ক্রিকেট আন্দোলনের। ঘরোয়া ও আর্ন্তজাতিক ক্রিকেটারদের অধিকার রক্ষায় ও প্রাপ্য বাড়ানোর ইচ্ছায় ধর্মঘটে গেলো ক্রিকেটাররা। তারা প্রথমে ১১ দফা, পরে ১৩ দফা দাবি করলেন। সে নিয়ে পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন হলো। পরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন ও ক্রিকেটারদের নেতা সাকিব আল হাসান যৌথ সংবাদ সম্মেলন করে জানালেন যে, তাদের ভেতরে সমঝোতা হয়ে গেছে। এরপর ক্রিকেটারদের দাবি-দাওয়া বিসিবি দ্রুতই মেনে নেয়। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ক্রিকেটারদের জাতীয় ক্রিকেট লিগ সংক্রান্ত দাবি কার্যকর করার ঘোষণা দেয় বিসিবি। উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানো হয় প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের ম্যাচ ফি, দৈনিক ভাতা, যাতায়াত ভাতা, ভালো হোটেলে আবাসন এবং বিমানে ও এসি বাসে যাতায়াতের সুবিধা।

অধ্যায়টা এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু তাও হলো না। নতুন করে দ্বন্দ্ব তৈরি হলো। আর সেটা তৈরি হয় সাকিব আল হাসান বিসিবিকে না জানিয়ে একটি টেলিকম প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে ফেলায়। বিসিবির আইন অনুযায়ী কোনো ক্রিকেটার তাদের অনুমতি না নিয়ে টেলিকম প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করতে পারবে না। গত কয়েক মাসে এই আইনের কারণে আরো অন্তত দুইজন ক্রিকেটার টেলিকম প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করতে পারেননি। কিন্তু সাকিব চুক্তিটা করেই ফেলেন।

সাকিবের এই চুক্তির পর বিসিবি তাকে নোটিশ দেয়। এদিকে এক সাক্ষাৎকারে বিসিবি প্রধান নাজমুল হাসান দাবি করেন, খেলোয়াড়দের আন্দোলনটা ছিল ভারত সফর নস্যাৎ করার একটা ষড়যন্ত্র। সেই ষড়যন্ত্র এখনো চলছে। তিনি বলেন, তার কাছে খবর আছে, সাকিবসহ কয়েকজন ক্রিকেটার ভারত যাওয়ার আগ মুহূর্তে বেঁকে বসতে পারেন। এমনকি তামিমের ছুটি নেয়াটাকেও সহজভাবে দেখেননি তিনি। এই অবস্থায় সাকিবরা ভারত সফরে যাবেন কি না, তা নিয়ে একটা গুঞ্জন তৈরী হয়। মনে করা হচ্ছিলো, এ নিয়ে কোনো বোমা ফাটতে পারে।

বোমা ফাটলো! তবে সেটা সাকিব বা বিসিবির তরফ থেকে নয়; খোদ আইসিসির দুর্নীতি দমন ইউনিট বা আকসু জানালো, এক বাজিকরের কাছ থেকে তিন তিনবার প্রস্তাব পাওয়ার পরও নিয়ম অনুযায়ী আকসুকে জানাননি সাকিব আল হাসান। আর সেই অপরাধে তাকে দুই বছরের জন্য সব ধরনের ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ করা হলো। এর মধ্যে এক বছর প্রত্যক্ষ নিষেধাজ্ঞা এবং এক বছর স্থগিত নিষেধাজ্ঞা। অর্থাৎ সাকিব যদি প্রথম এক বছরের নিষেধাজ্ঞা চলা অবস্থায় নতুন কোনো ভুল না করেন, তাহলে বাকী এক বছর আর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে না।

প্রথমটা এই খবরে বিস্মিত, ক্ষুব্ধ ও হতভম্ব হয়ে গেলো বাংলাদেশ। সকলেই একসঙ্গে মনে করলেন, এই ঘটনার সঙ্গে ক্রিকেটারদের আন্দোলন ও সাকিবের টেলিকম চুক্তির একটা সম্পর্ক আছে। এই মনে করা থেকে বিসিবির কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভে মাতলেন কয়েকশ সাকিবভক্ত। তারা সেখানে নাজমুল হাসান পাপনের বিপক্ষে স্লোগান দিলেন। কিন্তু এদিকে নাটকীয়তার আরও বাকী ছিলো।

২৯ অক্টোবর দুপুর থেকেই বিসিবি কার্যালয়ে জড়ো হতে শুরু করেন বোর্ড সভাপতি ও অন্যান্য পরিচালকরা। তারা অপেক্ষায় ছিলেন আইসিসি থেকে পূর্ণাঙ্গ রায় এসে পৌঁছানোর জন্য। এর মধ্যে বাসা থেকে এসে উপস্থিত হলেন বিধ্বস্তপ্রায় সাকিব আল হাসান। হাতে এসে পৌঁছালো আইসিসির রায়। এই ঘটনার পর প্রথমবারের মতো সাংবাদিকদের সামনে এসে দাঁড়ালেন সাকিব। কোনোক্রমে অশ্রু আটকে বললেন, ‘আমি যে খেলাটি ভালোবাসি, সেটা থেকে নিষিদ্ধ হওয়াটা অবশ্যই দুঃখের। কিন্তু আমি এই প্রস্তাবগুলো (আকসুকে) না জানানোর দায়ে আমার সব শাস্তি মেনে নিয়েছি।’

এরপর সাকিব বলেছেন, তিনি ক্রিকেটকে দুর্নীতিমুক্ত রাখার লক্ষ্যে আইসিসির সঙ্গে কাজ করবেন। তিনি বলেন, ‘বেশির ভাগ খেলোয়াড় ও সমর্থকের মতো আমিও এই খেলাটাকে দুর্নীতিমুক্ত দেখতে চাই। আমি সেজন্য আইসিসির সঙ্গে তাদের শিক্ষা কার্যক্রমে কাজ করার জন্য মুখিয়ে আছি। আমি চাই, কোনো তরুণ খেলোয়াড় যেন আমার মতো ভুল না করে।’

সাকিবের সঙ্গে আলোচনার পর বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন পুরো ব্যাপারে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা শকড। এর চেয়ে বড়ো শকিং ব্যাপার আর নেই। দুজন খেলোয়াড়ের বদলি হয় না- অধিনায়ক মাশরাফি আর খেলোয়াড় সাকিব। সাকিবের খেলতে না পারাটাই শকিং। ভারতের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ। ওকে নিয়েই সব পরিকল্পনা করা হয়েছে।’

দেবব্রত মুখোপাধ্যায়

পাপন আরো বললেন, সবকিছু মিলিয়ে সাকিব যে সরলতা দেখিয়েছেন এবং যেভাবে আইসিসিকে সহায়তা করেছেন, সেটা প্রশংসাযোগ্য ব্যাপার, ‘প্রথম শুনে আমি ওর উপর রাগ করেছিলাম। পরে আমি সাকিবের সরলতায় খুশি হয়েছি। এই কারণে খুশি হয়েছি যে, সাকিব আকসুকে পুরো সহায়তা করেছে। সব স্বীকার করে নিয়েছে। জানুয়ারি থেকে তদন্ত চলছিল। আমরা কিছুই জানতাম না। সাকিবই প্রথম আমাদের ধর্মঘটের পর এটা জানায়।’

রাত বাড়তে থাকে আর আস্তে আস্তে সামনে আসতে থাকে আইসিসির বিশাল পূর্ণাঙ্গ রায়। সেই রায় বলে দেয়, সাকিব আল হাসান কেবল বাজিকরের একবার আলাপ অবহেলা করেছেন তাই নয়; মাস তিনেক সময়কাল ধরে তার সঙ্গে কথোপকথনও চালিয়েছেন। আকসু দাবি করে, ২০১৭ সালের নভেম্বরে এই ঘটনার সূত্রপাত হয়। সে বছর সাকিব বিপিএল খেলেছিলেন ঢাকা ডায়নামাইটসের হয়ে। আর সেই আসর চলা অবস্থাতেই জনৈক আগারওয়াল সাকিবের ফোন নম্বর সংগ্রহ করেন। সাকিব আকসুর তদন্তে স্বীকার করেন যে, তিনি জানতেন ওই আগারওয়ালকে তার পরিচিত একজন তার নম্বর দিয়েছেন। শুধু সাকিব নন, বাংলাদেশের শীর্ষ পর্যায়ের প্রায় সব ক্রিকেটারের নম্বর সংগ্রহ করেন এই আগারওয়াল।

২০১৭ সালের নভেম্বরের কোনো এক সময়ে আগারওয়াল প্রথম ম্যাসেজ দেন সাকিব আল হাসানকে। এক পর্যায়ে সাকিব তার সাথে কথোপকথনও শুরু করেন। এর এক পর্যায়ে তিনি সাকিবের সাথে দেখা করতে চান।

২০১৮ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয় শ্রীলঙ্কা ও জিম্বাবুয়েকে নিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজ। আর ওই টুর্নামেন্টের সময় সাকিবের কাছ থেকে বিভিন্ন তথ্য চেয়ে হোয়াটসঅ্যাপে ম্যাসেজ দেন আগারওয়াল।  একই বছর, একই মাসের ১৯ তারিখে আগারওয়াল সাকিবকে একটি অভিনন্দন বার্তা পাঠান। একটা ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় হওয়ায় এই অভিনন্দন বার্তা পাঠানোর পর সাকিবকে আগারওয়াল বার্তা পাঠান, ‘কাজটা কী আমরা এখনই করবো, নাকি আমি আইপিএল পর্যন্ত অপেক্ষা করবো।’

আকসু বলেছে, এই ‘কাজ’ বলতে আগারওয়াল ফিক্সিং সংক্রান্ত কিছু বোঝাতে চেয়েছেন।

২০১৮ সালেরই ২৩ জানুয়ারি আগারওয়াল আরেকটি বার্তা দেন। সেখানে তিনি বলে, ‘ব্রো, এই সিরিজে কিছু হবে?’ সেই সাথে তিনি ত্রিদেশীয় সিরিজের ভেতরের কিছু খবরাখবর জানতে চান। ওই বছর ২৬ এপ্রিল সানরাইজার্স হায়দারাবাদের পক্ষে কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের বিপক্ষে খেলেন সাকিব। ওই দিন সাকিবের কাছে আগারওয়াল জানতে চান একজন নির্দিষ্ট খেলোয়াড় ওই ম্যাচে খেলবেন কি না?

এরপরও সাকিবের সাথে চলতে থাকে আগারওয়ালের কথোপকথন। এর মধ্যে সাকিবকে আগারওয়াল বিট কয়েন নামে অনলাইন লেনদেনের মুদ্রার ব্যাপারে ধারণা দেন। এরপর সাকিবের কাছে তার ডলার অ্যাকাউন্ট নম্বর চান আগারওয়াল। তখন সাকিব প্রথমবারের মতো উত্তর দেন। বলেন, ‘আগে আমরা দেখা করি।’ 

আকসু তার রিপোর্টে বলেছে, এর মধ্যে আলাপের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসে সাকিব কিছু ম্যাসেজ ডিলিট করে দিয়েছেন। তাতে আকসুর সন্দেহ আরও ঘনিভূত হয়।

বাংলাদেশের একটি পত্রিকা দাবি করেছে, গত বছর আগারওয়ালের কাছ থেকে তার ফোন ছিনিয়ে নিয়েছিলেন একজন আকসু কর্মকর্তা। সেই ফোনে তল্লাশী চালাতে গিয়েই সাকিবের সঙ্গে এই কথোপকথনের প্রথম সন্ধান পায় তারা। আর এর ভিত্তিতে ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে তদন্ত শুরু করে আকসু। ২৩ জানুয়ারি ও ২৭ আগস্ট সাকিব আল হাসানকে দু’ বার জিজ্ঞাসাবাদ করে আকসু। দু’ বারেই সব তথ্য স্বীকার করে নেন সাকিব। এই তথ্য স্বীকার করা, নিজের ফোন আকসুর হাতে তুলে দেওয়া এবং কল লিস্ট দেখানো; এভাবে আকসুকে সহায়তা করেন বাংলাদেশের এই অলরাউন্ডার। আর আকসু দাবি করেছে, তাতেই শাস্তিটা কমে আসে। আর এই শাস্তি নিয়ে দুই পক্ষ একমত হয়।

শেষ পর্যন্ত সত্যিটা হলো, সাকিবকে শাস্তি পেতে হয়েছে। আর বিশ্বের সেরা এই খেলোয়াড়টিকে ছাড়াই এক বছর চলতে হবে বাংলাদেশকে। যাকে ছাড়া একদিন চলা কঠিন; তাকে ছাড়া একটা বছর!

লেখক: ক্রীড়া সাংবাদিক, সাহিত্যিক

 

ঢাকা/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন