ঢাকা, বুধবার, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ২৭ মে ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

শার্টের গান: এ সময়ের বাস্তবতা

নাসির উদ্-দ্বীন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৪-০৬ ১:৪৫:০৯ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৪-০৬ ১২:৫৮:১৯ পিএম

টমাস হুড 'শার্টের গান' নামে একটি করুণ কবিতা লিখেছিলেন ১৮৪৩ সালে। কবিতাটিতে শার্ট সেলাইকারী এক বালিকার দুঃখ-দারিদ্র্য-যন্ত্রণা পুঁজিবাদের কলে পড়া প্রাণির চিৎকার হয়ে বেজেছে। তার আঙুল অবশ ও জীর্ণ হয়ে পড়েছে, ভারী ও লাল হয়ে উঠেছে চোখের পাতা, তবু সে সুতো গেঁথে চলেছে সুচে, সেলাই করে চলেছে ভোরের মোরগের ডাক শোনার সময় থেকে সন্ধ্যার পর আকাশে তারা ফোটা পর্যন্ত। তার জীবনে দু'টি শব্দ সেলাই! সেলাই! সেলাই! কাজ! কাজ! কাজ! শব্দ দু'টি তার জীবনে বেজে চলে সেলাই কলের শব্দের মতো। ফিতা, পটি, জোড়া আর জোড়া, পটি, ফিতা করতে করতে বোতাম লাগানোর সময় সে ঘুমিয়ে পড়ে এবং স্বপ্নেই সে সেলাই করে ফেলে জামার বোতামের ঘরগুলো। তবে তার জীবনসঙ্গী ক্ষুধা ও দারিদ্র্য। পুঁজিবাদের অসহায় ক্রীতদাসী সে।

বাংলাদেশের বস্ত্র বালিকারা বয়ে চলছে তারই উত্তরাধীকার। চৌদ্দ ঘণ্টা খাটতে হয় ওদের।  বেতন সামান্য। শোনা যায় মাস শেষে পুরো বেতন দেয়া হয় না। যার বেতন পাঁচ হাজার, তাকে দেয়া হয় তিন হাজার। বাকিটা চিরকালের জন্য বাকি থেকে যায়। অভিযোগ করার জায়গা নেই। বস্ত্রশিল্প ওদের পরিণত করেছে ক্রীতদাসীতে।

বস্ত্রশিল্প শোষণশিল্পরূপে দেখা দিয়েছে। বস্ত্রবালিকারা মালিকদের যৌন শোষণেরও শিকার হয়ে থাকে। অর্থ ও যৌন শোষণ মিলে বস্ত্রশিল্প অমানবিক রূপ নিয়েছে।

ওদের অধিকাংশেরই বয়স কম। থাকে হয়তো কোনো বস্তিতে, ওরা রোগা, হয়তো শিশুকাল থেকে ভালো করে খায়নি, হয়তো বাসাবাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করতো, এখন দেশের পুঁজিবিকাশের জন্য কাঠখড় লাকড়ির মতো পুড়ছে।

লিপস্টিক রাঙা আধুনিকদের থেকে ওরা অনেক শ্রদ্ধার। বস্ত্রবালিকারা লিপস্টিক রঞ্জিতদের মতো সারাক্ষণ নিজেদের যৌনসামগ্রী ভাবে না, ভাবে কর্মী।

পুঁজিবাদ দাতা নয়, শোষক। ওই সকল বস্ত্রবালক বালিকাদের জন্য গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি খোলা হয়নি, খোলা হয়েছে পুঁজিপতিদের পুঁজি বাড়ানোর জন্য। বস্ত্রশিল্পের মালিকরা অনেক চতুর, যারা সরকারি টাকা বাগাতে ওস্তাদ। ওদের উদ্দেশ্য অল্প সময়ে প্রচুর টাকা উৎপাদন করা। বস্ত্রশিল্প দেশের পুঁজির বিকাশ ঘটাতে গিয়ে বিকাশ ঘটিয়েছে শোষণ-পীড়নের। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলো পরিণত হয়েছে এক কে‌লেঙ্কা‌রি‌তে। সরকারের অনুগৃহীতরা মালিক রূ‌পে দেখা দিয়েছে বস্ত্রশিল্পের। অনেক সুবিধা আদায় করে নিয়েছে তারা রাষ্ট্রের কাছ থেকে।

বস্ত্রশিল্পের জন্য অবিলম্বে তৈরি করা দরকার মানবিক শ্রম আইন। এখন যেভাবে চলছে, সেভাবে চললে বস্ত্রশিল্প একটি জাতীয় কেলেঙ্কা‌রি‌তে পরিণত হবে। যারা ভোর হবার সাথে সাথে ছুটছে কারখানার দিকে, চোখ আর আঙুল জীর্ণ করে সেলাই করছে সভ্যতার মুখোশ তাদের সাথে বিশ্বব্যাপী করোনামহামারির এই ভয়াবহ সময়ে এমন অসভ্য আচরণ না করাই ভালো। পুঁজিবাদের মুখ রক্ষার জন্যেই তাদের জন্য সুষ্ঠু শ্রমনীতি প্রয়োজন। বস্ত্র শ্রমিকদের খাদ্য, বাসস্থান, নিরাপত্তা দিতে হবে। দিতে হবে মানুষের মর্যাদা, যা তাদের প্রাপ্য সহজাতভাবেই।


ঢাকা/তারা/নাসিম