ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০২ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

রমজান আসে যায়, জীবন কি বদলায়?

শেখ ফজলুল করীম মারুফ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-১১ ১:০৪:০৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-১১ ১:১৮:১১ পিএম

আমাদের বয়স যাদের ২৫-৩০-এর  কোঠায় তারাও জীবনে অন্তত ১০টি রমজান পেয়েছি যখন আমাদের ওপরে রোজা রাখা ফরজ ছিল। বয়স যাদের আরও বেশি তারা আরও বেশিসংখ্যক রোজা পেয়েছি। প্রতি রমজানে আমরা আয়োজন করে ইবাদতে মগ্ন হই। সরকারিভাবে রমজান উদযাপন করা হয়। অফিসের সময়সূচি বদলে যায়। ব্যক্তিগত জীবনেও আমরা ধর্মে-কর্মে মনোযোগী হই। পরিবারসহ রোজা রাখি, পার্টির মতো করে ইফতারির আয়োজন করি। সেহরি পার্টিও করি। দলবেঁধে তারাবির নামাজ আদায় করি। উৎসাহের সাথে দান-খয়রাত করি। হিসেব করে হোক বা না-হোক জাকাত আদায় করি।

রমজানে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থ প্রবাহ বেড়ে যায়। অর্থনীতি রমরমা অবস্থায় থাকে। মার্কেট ও শপিংমলগুলোতে অতিরিক্ত ভিড় জমে। ঈদের আগে পরিবহন সেক্টরে হুলুস্থুল হয়। মানুষ জীবনবাজি রেখে বাড়িতে যায়। এ সময় দুর্ঘটনাও ঘটে। ঈদের দিন সকালে নামাজ পরে এসে আমাদের মতো করে ঈদ পালন করি। যাতে শরিয়াহ-এর নির্দেশনার খুব একটা পরোয়া থাকে না। সব মিলিয়ে রমজান মাস বাংলাদেশে ও আমাদের জীবনে সত্যিই একটি উৎসবের নাম। যাকে আমরা মহা উৎসাহে উদযাপন করি।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, রোজা কি এজন্যই আসে আমাদের জীবনে? মাসব্যাপী জাতীয় উৎসবের উপলক্ষ্য হয়ে?

পবিত্র কুরআন কী বলে?

يٰٓـاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا كُتِبَ عَلَيْکُمُ الصِّيَامُ کَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِکُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ

অর্থ: হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, যেন তোমরা পরহেজগারী অর্জন করতে পারো।

(সূরা আলবাকারা (البقرة), আয়াত: ১৮৩)

এই আয়াতটা আমরা জীবনে এতোবার শুনেছি যে, যারা কখনোই মাদ্রাসায় পড়েননি এমনি যারা নির্দিষ্ট কয়েকটি সুরা ছাড়া কুরআন পড়তে পারেন না তারাও এই আয়াত ও তার অর্থ বলতে পারেন।

এটা একটা ভালো দিক। কিন্তু কুরআন যেহেতু কেবলই পড়া ও জানার নাম না বরং তা কাজে পরিণত করার নাম, সেজন্য এই বলতে পারার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না। এই আয়াতের ভাষ্য একেবারে স্পষ্ট। রোজা ফরজ করা হয়েছে তাকওয়া অর্জনের জন্য। রোজা জাতীয় উৎসবের উপলক্ষ্য করে ফরজ করা হয়নি। হ্যাঁ, উৎসবের আমেজ আসতে পারে, এমনকি রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও রোজা এলে খুশি হতেন, সাহাবি ও ইসলামি খেলাফতের পুরোটা সময়ে রমজান মাস আনন্দের অনুভূতি ছড়িয়ে দিতো রাজ্যময়। তবে সেই আনন্দের ভিত্তি ছিলো তাকওয়া অর্জনের আরেকটি সুযোগ পাওয়ার আনন্দ। সওয়াব অর্জনের আরেকটি মওসুম পাওয়ার আনন্দ।

তাকওয়া কী?

এই সংক্রান্ত অনেক দীর্ঘ ও তাত্ত্বিক আলোচনা আছে। সহজে বললে তাকওয়ার তিনটি স্তর।

১.সব ধরনের শিরক ও কুফুরি থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

২.সব ধরনের কবিরাহ গুনাহ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

৩. সব ধরনের ছগিরা গুনাহ থেকেও নিজেকে রক্ষা করা।

এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো। তাকওয়ার বাংলা অর্থ করা হয়, "খোদা ভীতি বা আল্লাহর ভয়"। এই অর্থ যথাযথ নয়। আমরা সবাই জানি তাকওয়া আরবি শব্দ। কিন্তু ইসলামি শরিয়াহ-এ তাকওয়া একটি পরিভাষা। পরিভাষার একক শব্দে ভাষান্তর করা সবক্ষেত্রে যায় না। তাকওয়ার বাংলা ভাষান্তর "খোদা ভীতি বা আল্লাহর ভয়" হিসেবে করা যায় না। কারণ মহান আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ক কেবলই ভয়ের না। তাঁর সাথে আমাদের সম্পর্ক প্রেমের, ভালোবাসার, শ্রদ্ধার, ভক্তির, কৃতজ্ঞতা বোধের ও আবেগের। ভয়ের সম্পর্কও আছে কিন্তু সেটাই মূখ্য না। এখন তাকওয়ার অর্থ এরূপ করলে আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্কের অন্যদিকগুলো আড়াল হয়ে যায়।

তাকওয়ার একটি চমৎকার ব্যাখ্যামূলক সংজ্ঞা হজরত উমর (রাঃ) থেকে পাওয়া যায়। তিনি বলেন, তাকওয়া হলো সেই ব্যক্তির সতর্কতা যে একটি ঘন কাঁটাযুক্ত বনের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। কিন্তু তার গায়ে কাঁটা লাগছে না। কাঁটার খোঁচা থেকে বাঁচতে সেই ব্যক্তিকে যে সতর্কতা অবলম্বন করতে হয় তাই হলো তাকওয়া। দুনিয়ার জীবনে প্রতিনিয়ত পাপাচারের প্রলোভন থেকে বাঁচতে সদা সতর্ক থাকার নাম তাকওয়া।

তাকওয়ার প্রথম স্তর হলো, শিরক ও কুফুরি থেকে বেঁচে থাকা। শিরক হলো, আল্লাহর গুণাবলীতে অন্য কাউকে অংশীদার করা। আল্লাহ রিজিক দাতা, জীবন-মৃত্যুর একক সিদ্ধান্ত দাতা, ভাগ্যের একক নিয়ন্ত্রা। তিনিই বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন। তিনিই বিশ্বের একক আইনদাতা ও একক সার্বভৌমত্বের মালিক। এগুলোর ক্ষেত্রে অন্য কাউকে তার অংশীদার করা শিরক। কুফুরি হলো আল্লাহকে বা তার কোনো গুণাবলীকে অস্বীকার করা। যদি কেউ এসব ক্ষেত্রে কাউকে মহান আল্লাহর অংশীদার সাব্যস্ত করে বা অস্বীকার করে তাহলে একমাস কেন সারাজীবন রোজা রাখলেও কোনো কাজ আসবে না।

তাকওয়ার দ্বিতীয় স্তর হলো, কবিরাহ গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। মনে রাখতে হবে, রমজান মাসে যা কবিরাহ গুনাহ তা সারা বছরের জন্যই কবিরাহ গুনাহ। কবিরাহ গুনাহের তালিকা সম্পর্কে আমরা কমবেশি সবাই জানি। এরমধ্যে বাংলাদেশে গণহারে যে কবিরাহ গুনাহ করা হয় তা হলো বেপর্দা। রমজান মাসে অন্য কবিরাহ গুনাহের লাগাম কিছুটা টানা হলেও বেপর্দার কবিরাহ গুনাহ সম্পর্কে উদাসীনতা থেকেই যায়। পারিবারিকভাবে আয়োজিত ইফতার ও সেহরির আয়োজনেও এই কবিরাহ গুনাহ সংঘটিত হয়। (পর্দাকে যাদের কাছে নারীর প্রতি অবিচার বলে মনে হয় তাদেরকে শুধু এতটুকু বলবো, ইংল্যান্ডেও নারীর ভোটাধিকার দেওয়া হয়েছে ১৯ শতকে। আর ইসলামে ৭ম শতকেই নারীরা রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ পরামর্শ সভার শীর্ষ সদস্যা ছিলেন। নারীর প্রতি শতাব্দির পর শতাব্দি অবিচার করা পশ্চিমাদের মুখরোচক বয়ানে প্রভাবিত না হতে অনুরোধ করব। ইসলাম নারী মুক্তি, নারী স্বাধীনতা বা নারী উন্নয়নের নিজস্ব পন্থা, নির্দেশক ও কৌশল অনুসরণ করে। যা মানব প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও টেকসই)।

এছাড়া আরও অনেক কবিরাহ গুনাহের কথা আমরা জানি। এর মধ্যে কিছু আছে সামাজিক কবিরাহ গুনাহ। যেমন মানুষ ঠকানো, প্রতারণা, দুর্নীতি, মিথ্যা কথা বলা, ওজনে কম দেওয়া এবং মানুষকে কষ্ট দেওয়া।

আমাদের জীবনে এতোগুলো রমজান এলো। আমরা এতো আয়োজন করে রোজা পালন করি তারপরেও বাংলাদেশ দুর্নীতিতে শীর্ষ দেশগুলোর একটি। রাষ্ট্র দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেও দুর্নীতি রোধ করতে পারছে না। খাদ্যে ভেজাল সর্বত্র। যারা এগুলো করে তারাও তো বছরের পর বছর রোজা রাখছেন। তারপরেও কি করে এগুলো করতে পারে? আদতে তাকওয়া অর্জন হয়নি। তাকওয়ার তৃতীয় স্তর হলো, সব ধরনের ছগিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা।

যে আলোচনা দিয়ে শুরু করেছিলাম, রমজান আমাদের জীবনে আগেও বহুবার এসেছে। এবার এসেছে। আমরা রমজানকে উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়েই পালন করি। কিন্তু তাকওয়া কি আমরা অর্জন করতে পারি বা পেরেছি? রমজানের মাঝামাঝি এসে এই আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করা উচিৎ। আমি কি শিরকমুক্ত হতে পেরেছি? আমি কি কবিরাহ গুনাহ ছাড়তে পেরেছি? বেপর্দা হওয়া কি বন্ধ করতে পেরেছি? আমার মাধ্যমে মানুষের কি প্রতারিত হওয়া বন্ধ হয়েছে? আমি কি নিজেকে দুর্নীতিমুক্ত করতে পেরেছি? মিথ্যা বলা কি বন্ধ করেছি?

এভাবে নিজেকে একের পর এক প্রশ্ন করা উচিৎ। যদি আমরা তাকওয়া অর্জন করতে না পারি তাহলে রমজান আমাদের জন্য সৌভাগ্য তো নয়ই বরং উল্টো দুর্ভাগ্যের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম এক খুতবায় দাঁড়িয়ে তিনবার হজরত জিবরাইল আলাইহি ওয়াসাল্লামের দোয়ার শেষে আমিন আমিন বলেন। এর মধ্যে একবার ছিলো, যারা রমজান পেলো কিন্তু নিজেকে মাফ করাতে পারলো না তারা ধ্বংস হোক। মাফ পাওয়ার জন্য তওবা করা ও সেই কাজ পুনরায় না করা শর্ত।

জীবনে বারংবার রমজান পেয়েও যদি আমরা নিজেদের সংশোধন করতে না পারি, তাকওয়া অর্জন করতে না পারি তাহলে এই রমজান আমাদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই আসুন, এই রমজানে নিজেকে বদলে নেই। নিজের জীবনের গুনাহগুলোকে নিজে নিজে চিহ্নিত করে সেগুলো থেকে তওবা করি। বাকি জীবন সতর্কতার সাথে কাটাই। তাহলেই আমাদের জীবনে রমজান মাস আসা সার্থক হবে। আমরা নিজেরা উপকৃত হবো। দেশ ও জাতি উপকৃত হবে।

আল্লাহতায়ালা আমাদের সত্যিকার তাকওয়া অর্জনের তৌফিক দান করুন।


ঢাকা/শাহেদ/তারা