ঢাকা     মঙ্গলবার   ০৪ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ১৯ ১৪২৭ ||  ১৪ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

risingbd-august-banner-970x90

করোনাজয়ী মাশরাফির অপেক্ষায় বাংলাদেশ

|| রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:২৪, ২১ জুন ২০২০  

কখনো নড়াইল এক্সপ্রেস, কখনো ম্যাশ, কখনো কৌশিক, কখনোবা মাশরাফি- যে নামেই তাকে ডাকা হোক না কেন সব নামের আবেদন কিন্তু একই। তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের প্রিয় তারকা মাশরাফি বিন মুর্তজা। এই নাম উচ্চারণে মনের মধ্যে এক ধরনের সঞ্জীবনী শক্তির আভাস পাওয়া যায়। মনে হয় গতিতে ছুটছে সবাই। এই গতি অবশ্য তার বলের গতি নয়, গতি তার কর্মোদ্দীপনার, গতি তার সাহসের, গতি তার পজিটিভ ভাবনার।

আমরা ক্রিকেট পাগল জাতি। ক্রিকেটের প্রতি আমাদের প্রেমও অন্ধ। এই ভালোবাসায় প্রথম ধাক্কা লেগেছিল যেদিন মাশরাফি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘তারকা হলেন একজন ডাক্তার। আমি ক্রিকেটার একটা জীবন কি বাঁচাতে পারি? পারি না। ডাক্তার পারেন। কই, দেশের সবচেয়ে ভালো ডাক্তারের নামে কেউ তো হাততালি দেয় না। তাদের নিয়ে মিথ তৈরি করুন, তারা আরও পাঁচজনের জীবন বাঁচাবেন। তারকা হলো লেবাররা, দেশ গড়ে ফেলছে। ক্রিকেট দিয়ে আমরা কী বানাতে পারছি? একটা ইটও কি ক্রিকেট দিয়ে তৈরি করা যায়? একটা ধান জন্মায় মাঠে? জন্মায় না। যারা ইট দিয়ে দালান বানায়, যারা কারখানায় আমাদের জন্য এটা-ওটা তৈরি করে, যারা ধান জন্মায়, তারা হলো তারকা।’ 

এভাবে যিনি ভাবতে পারেন তিনিই আসলে তারকা, নেতা, অধিনায়ক বা একজন যোগ্য দেশপ্রেমিক। এই কথাগুলো আমাদের সবারই মাথায় গেঁথে আছে। মাশরাফির এই কথাগুলো নতুন আলোচনারও জন্ম দিয়েছিল। মাশরাফি একজন ভালো খেলায়াড়, একজন ভালো অধিনায়ক এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের দেশে অনেক খেলোয়াড় তৈরি হয়েছেন, অনেকে দেশে-বিদেশে সুনামও কুড়িয়েছেন, কিন্তু মাশরাফি একদমই ভিন্ন তার ভাবনার কারণে। এই ভিন্নতার কারণে মাশরাফি খেলার বাইরেও আলাদা জীবন গড়ে তুলেছেন। সবখানেই তিনি একজন যোগ্য অভিভাবক। ক্রিকেটার রুবেলের প্রেমঘটিত সমস্যা মাশরাফি যেভাবে সামলেছেন তা সহসা ভুলে যাওয়ার কথা নয় ক্রিকেট প্রেমিকদের। এই হচ্ছে দলনেতার ভূমিকা।

দলনেতা আসলে কেমন? কেমন তার রূপ? কেমন তার চরিত্র? অধিনায়ক সাকিব আল হাসান  এক সাক্ষাৎকারে ‘মাশরাফি কেমন মানুষ’ এই প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন: ‘ওয়ান অফ দ্য গ্রেটেস্ট মোটিভেটর। যেকোনো পরিস্থিতিতে একটা দলকে, কোনো একটা গ্রুপকে কীভাবে চাঙা রাখা যায়, সেটা তার চেয়ে ভালো কেউ জানে না। তার আশেপাশে থাকা মানেই তিনি আপনাকে ফুরফুরে করে রাখবেন।’ 

২.
করোনাভাইরাস পুরো দেশকে আক্রান্ত করেছে। দেশের স্বাস্থ্যসেবার দিকে সবাই যখন তাকিয়ে আছেন তখন মাশরাফি নিজ উদ্যোগে ভ্রাম্যমাণ ফ্রি স্বাস্থ্যসেবা চালু করেছেন। এই সেবার মাধ্যমে নড়াইলবাসী যাতে করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে রক্ষা পান তাই এই উদ্যোগ। শুধু কি নড়াইল নিয়েই মাশরাফির চিন্তা? না। খেলার মাঠ ছেড়েছেন, অধিনায়কত্ব ছেড়েছেন, মানুষের মন থেকে কি তিনি দূরে সরেছেন? না। তিনি এখনো সবার প্রিয় অধিনায়ক। ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটিতে যখন পুরো দেশ বন্ধ, তখন ত্রাণের জন্য হাহাকার। এই সময় অনেক সেলিব্রেটি নিজেদের প্রিয় জিনিস নিলামে তুলেছেন। মাশরাফিও পিছিয়ে ছিলেন না। নিজের প্রিয় ব্রেসলেট নিলামে তুলেছেন। সেই টাকা দিয়ে সহায়তা করেছেন নিম্ন আয়ের মানুষদের। 

এই দেশে অনেকেই রাজনীতি করেন। মাশরাফি সদ্য রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন। ২০১৮ সালের ১১ নভেম্বর আওয়ামী লীগের অধীনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে, নড়াইল-২ আসনের হয়ে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন তিনি। ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সাংসদ হন। রাজনীতি নিয়ে তার ভাবনা পরিষ্কার। তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার আগে থেকেই জনগণের কথা ভাবতেন। রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার আগে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘কিছু হলেই আমরা বলি, এই ১১ জন ১৬ কোটি মানুষের প্রতিনিধি। আন্দাজে! তিন কোটি লোকও হয়ত খেলা দেখেন না। দেখলেও তাদের জীবন-মরণ খেলায় না। মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন রাজনীতিবিদেরা, তাদের স্বপ্ন ভবিষ্যৎ অন্য জায়গায়। এই ১১ জন মানুষের ওপর দেশের মানুষের ক্ষুধা, বেঁচে থাকা নির্ভর করে না। দেশের মানুষকে তাকিয়ে থকতে হবে একজন বিজ্ঞানী, একজন শিক্ষাবিদের দিকে।’

এভাবে আমাদের দেশের কোনো রাজনীতিবিদ কি ভেবেছেন? কখনো না। অথচ মাশরাফির এই ভাবনাগুলো রাজনীতিতে আসার আগে। ডা. মো. মঈন উদ্দিন যেদিন করোনার সাথে যুদ্ধ করে মারা গেলেন সেইদিন মাশরাফি তাকে নিয়ে শোক প্রকাশ করেন। দেশে অনেক রাজনীতিবিদ আছেন যারা জানেনই না ডা. মঈন কীভাবে মারা গিয়েছেন? শুনে বিস্ময় লাগছে! কিন্তু ঘটনা সত্যি। মাশরাফি সেদিন তার ফেসবুক পেইজে লিখেছেন: ‘সবাইকে শোকে ভাসিয়ে চলে গেলেন এক মহৎ প্রাণ ডাক্তার! করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গতকাল সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক মানবিক ডা. মো. মঈন উদ্দিন চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তিনি ছিলেন করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ফ্রন্ট লাইনের যোদ্ধা। তাঁর এই মৃত্যু হৃদয় বির্দীণ করার মত। … সর্বশেষ আমি এই বীরযোদ্ধাকে জানাচ্ছি- স্যালুট।’

৩.
‘রাজনীতি আমার পেশা নয়। রাজনীতি কখনো পেশা হতে পারে না। রাজনীতি মানুষের সেবার জন্য, উপকারের জন্য। আমার পেশা খেলা, রাজনীতি নেশা। পেশা দিয়ে আয় করতে হয়। খেলার অর্থ দিয়ে আমার সংসার চলে। তাই পায়ে ব্যথা থাকলেও আমি খেলি। সে জন্য খেলা ছাড়ি না। খেলা শেষে ব্যবসা করব। রাজনীতি দিয়ে উপার্জনের কোনো চিন্তা আমার নেই।’ ‘প্রথম আলো’তে কথাগুলো বলেছিলেন মাশরাফি। যিনি এভাবে ভাবেন, তিনিই তো আসল দলনেতা, দলের নেতা। তার দল ক্রিকেটের মাঠের এগারোজন খেলোয়াড় নয়, তিনি পুরো বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষের অধিনায়ক। এই অধিনায়ক ১৯ জুন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তার সুস্থতা জরুরি।  তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন এটা শুধু বাংলাদেশের নয়, পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য মাশরাফিপ্রেমী ভক্তের প্রার্থনা। করোনা জয় করে তিনি ফিরে আসবেন আমরা সেই অপেক্ষায় আছি।      

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

 

ঢাকা/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়