ঢাকা     শুক্রবার   ০৭ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২৩ ১৪২৭ ||  ১৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং করোনাকালে প্রত্যাশা

|| রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:২৭, ২৮ জুন ২০২০  

‘শিল্পবিপ্লব’ শব্দটির সঙ্গে মানুষের পরিচয় ১৭৮৪ সাল থেকে। সে বছর বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের ফলে উৎপাদন শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটে। এই আবিষ্কার প্রগতির চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এরপর ১৮৭০ সালে দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবের সূচনা। বিদ্যুৎ আবিষ্কার হলো। উৎপাদন শিল্পে আমূল পরিবর্তন এলো। এরপর ১৯৬৯ সালে তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের সূচনা। হলো ইন্টারনেট আবিষ্কার। উৎপাদন শিল্পে যুক্ত হলো তথ্যপ্রযুক্তি। গতি বেড়ে গেলো কয়েকগুণ। এরপর?

এরপর সূচিত হতে যাচ্ছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের। একে বলা হচ্ছে ‘ডিজিটাল বিপ্লব’। এর প্রভাব এতো বিস্তৃত এবং সুদূরপ্রসারী যে, যার সুফল শুরু হয়েছে মাত্র। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, উন্নত মানের রোবোটিক্স ও অটোমেশন, উন্নত মানের জিনপ্রযুক্তি, ইন্টারনেট অফ থিংস, স্মার্টফোন প্রযুক্তি, ব্লকচেইন প্রযুক্তি, থ্রি-ডি প্রিন্টিং-সহ অনেককিছুই চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের অংশ। বলাবাহুল্য এসব প্রযুক্তিতে আমরা এখনও পিছিয়ে, যদিও উন্নত বিশ্ব তা কাজে লাগিয়ে অনেকদূরে চলে গিয়েছে।

আমাদের নিশ্চয়ই সোফিয়া’র কথা মনে আছে। সোফিয়া ২০১৭ সালের ৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশে এসেছিল। সোফিয়া হচ্ছে মানবাকৃতির সামাজিক যোগাযোগ সক্ষম রোবট। এটি তৈরি করে হংকং-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হ্যানসন রোবটিক্স। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন সোফিয়া’র আবিষ্কার আলোচিত বিষয়। রোবট এতোদিন শুধু কমান্ডে কাজ করতো। এখন সে সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা করতেও সক্ষম। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, সোফিয়া মানুষের ব্যবহারের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং শিখতে পারে। এ সবই সম্ভব হয়েছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বা ডিজিটাল বিপ্লবের কল্যাণে।

শুধু কি সোফিয়া, খোদ রাজধানীর আসাদ গেটের কাছে ফ্যামিলি ওয়ার্ল্ড কনভেনশন সেন্টারের দ্বিতীয় তলায় চালু হয়েছিল রোবট রেস্টুরেন্ট। এই রেস্টুরেন্টে খাবার পরিবেশন করতো দু’জন রোবট। চীনে তৈরি এই রোবট দুটির একটি নারী ও অন্যটি পুরুষের আদলে গড়া। রোবট দেখতে উৎসাহীরা রেস্টুরেন্টে ভিড় জমিয়েছিল। এখন প্রশ্ন হলো- রোবট যদি মানুষের মতো মন বুঝে কাজ করতে পারে, তবে মানুষ কী করবে? শ্চিহ্ন হয়ে যাবে? এই প্রশ্নের উত্তরে বিজ্ঞানীরা এখনো স্পষ্ট কিছু বলছেন না। তবে তারা যা বলছেন তা হলো, স্বয়ংক্রিয়করণ প্রযুক্তির জন্য ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের ৮০ কোটি মানুষ চাকরি হারাবে। স্বভাবতই বাংলাদেশের মতো শ্রমনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলো বিপদে পড়বে। তবে এটা ঠিক যে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কল্যাণে কমিউনিকেশন সহজ হয়েছে, যা আগে কল্পনাও করা যেত না!

বিশ্বব্যাংক ‘ডিজিটাল ডিভিডেন্ডস’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্টারনেটের মাধ্যমে এক দিনে বিশ্বে ২০ হাজার ৭০০ কোটি ই-মেইল পাঠানো হয়, গুগলে ৪২০ কোটি বিভিন্ন বিষয় খোঁজা হয়। এক যুগ আগেও তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে এ পরিবর্তনগুলো ছিল অকল্পনীয়। শুধু কি মেইল পাঠানো আর গুগলে বিভিন্ন বিষয় খোঁজা? চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের উন্নত প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, পণ্য সরবরাহ, চিকিৎসা, শিল্পকারখানা, ব্যাংকিং, কৃষি, শিক্ষা-গবেষণাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করা সম্ভব।

২.

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কল্যাণে শিল্পকারখানাসহ সব যন্ত্রপাতি অটোমেশনে নিয়ে যাওয়া, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতে অতি আধুনিকায়ন করা, উৎপাদন শিল্পে পণ্যের গুণগত মান রক্ষা করে আরো উৎপাদন বাড়ানো, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, বিনোদনের আধুনিকায়ন, তথ্যের অবাধ ব্যবহার, ই-এডুকেশন বা অনলাইন শিক্ষাপদ্ধতির ব্যাপকতা, দ্রুত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল ট্রাফিকিং পদ্ধতি চালু, ভার্চুয়ালি অফিস পরিচালনা, ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদারসহ অসংখ্য কাজ করা যাবে। তবে এক্ষেত্রে সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও কম নয়। ডিজিটাল বিপ্লবের সবচেয়ে বড় অসুবিধা হলো, তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ। উইকিলিকস এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ২০০৬ সালের ৪ অক্টোবর উইকিলিকসের ওয়েবসাইট নিবন্ধিত হয়। এরপর থেকে উইকিলিকস বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গোপন নথি ফাঁস করে আলোচনায় উঠে আসে। সুতরাং ডিজিটাল বিপ্লবের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা। যেমন জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জুকারবার্গের বিরুদ্ধে তথ্য বিক্রির অভিযোগ শুরু থেকেই আছে। যদিও তিনি অভিযোগ সব সময়ই অস্বীকার করে এসেছেন।

শুধু ফেইসবুক নয়, যেকোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা ব্যক্তিগত তথ্য দেই। সেসব  তথ্য আদতে কতটা গোপন থাকছে চিন্তার বিষয়। ডিজিটাল বিপ্লবের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো সঠিক তথ্য যাচাই এবং গুজব নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তিগত সমস্যায় ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস, অটোমেশনের কারণে চাকরি হ্রাস, শঠতা ও মিথ্যাচার বৃদ্ধি, মানসিক অস্থিরতা বৃদ্ধিসহ অনেক কিছু। তবে চ্যালেঞ্জের চেয়ে সম্ভাবনার দিকটাই বেশি।

৩.

বলা হচ্ছে আমরা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু এই বিপ্লবের সম্ভাবনা পুরোপুরি বিকশিত হওয়ার আগেই মানবজাতি করোনার কারণে মহামারিতে আক্রান্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফ-এর পূর্বাভাস সত্যি হলে ১৯৩০ এর দশকের মহামন্দার পর ২০২০ সাল সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়তে যাচ্ছে গোটা বিশ্ব। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, করোনা মহামারির কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে ১২ ট্রিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতি হবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ২০২০ সালের মে মাসের প্রতিবেদন বলছে, বর্তমানে বিশ্বের ৩৩০ কোটি কর্মজীবী মানুষের মধ্যে ৮১ শতাংশই ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বাংলাদেশের ২৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ যুবক বেকার রয়েছে। ফেব্রুয়ারি থেকেই বেকারত্ব বাড়ছে। মহামারির প্রভাবে যুবকদের প্রতি ছয়জনে একজন কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। মহামারিতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তিনভাবে। প্রথমত কর্মহীন হচ্ছেন, দ্বিতীয়ত তাদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে, তৃতীয়ত চাকরিতে প্রবেশ ও দক্ষতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ৬ কোটি ৩৫ লাখ। এর মধ্যে কাজ করেন ৬ কোটি ৮ লাখ নারী-পুরুষ। বাকি ২৭ লাখ বেকার। ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাই শুরু হয়ে গিয়েছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)র তথ্যানুযায়ী, চলমান কভিড-১৯ অতিমারির ফলে দেশের ১ কোটি ৩ লাখ মানুষ চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। ২০২০ সালের ১৮ জুনের ভার্চুয়াল সংলাপে তারা এই তথ্য তুলে ধরেন।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি ২০২০ সালের ৮ জুন একটি জরিপ প্রকাশ করে। জরিপের তথ্যানুযায়ী, সাধারণ ছুটির ৬৬ দিনে দেশের তিন কোটি ৫৯ লাখ ৭৩ হাজার ২৭১ জন মানুষ চাকরি বা উপার্জন হারিয়েছেন। করোনার বিস্তার ঠেকাতে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির আগে দেশে মোট দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল তিন কোটি ৪০ লাখ। ছুটির ৬৬ দিনেই ‘নবদরিদ্র’ মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ৮০ লাখে। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে রাজধানীর ৫০ হাজার ভাড়াটিয়া ঢাকা ছেড়েছেন। (২৫ জুন ২০২০, কালের কণ্ঠ) এতেই বোঝা যাচ্ছে অর্থনৈতিক মন্দাটা আসলে কত ভয়ানক।

মূলত শিল্পবিপ্লবের ধারণা এই যে, প্রতিটি শিল্পবিপ্লব মানুষের জীবনকে আরো সহজ-সাবলীল করে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবও সেই ধারণাতেই এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে তার সেই গতিতে বিঘ্ন ঘটেছে। এই অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের মানুষ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুফল উপভোগ করবে এটুকুই প্রত্যাশা। একইসঙ্গে এর সুফল ভোগ করতে হলে নিজেদের তৈরি করতে হবে, পরিবর্তন মেনে নিয়ে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে দৃঢ় প্রত্যয়ী হতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তিকে নিয়ে যেতে হবে মানুষের দোরগোড়ায়। ভুলে গেলে চলবে না উন্নত বিশ্ব চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুফল ইতোমধ্যেই ভোগ করছে। আমরা সেদিক থেকে অনেকটাই পিছিয়ে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক


ঢাকা/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়