ঢাকা, সোমবার, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৮ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

গোপন থাইরয়েড সমস্যা আছে কিনা কীভাবে বুঝবেন?

এস এম গল্প ইকবাল : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৮-২৬ ২:৩৪:০৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৮-২৬ ২:৩৪:০৩ পিএম
প্রতীকী ছবি

এস এম গল্প ইকবাল : গলায় অবস্থিত থাইরয়েড গ্রন্থি হলো বিস্ময়কর শ্রমিক। এটির উৎপাদিত হরমোন আমাদের বিপাক ও অর্গানের কার্যক্রম ব্যবস্থাপনা করে এবং এটি সবসময় শারীরিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে, যেমন: হার্ট রেট, কোলেস্টেরলের মাত্রা, শরীরের ওজন, শক্তি, মাংসপেশির সংকোচন ও শিথিলতা, ত্বক ও চুলের গঠনবিন্যাস, অন্ত্রের কার্যক্রম, সন্তান জন্মদানের সক্ষমতা, মাসিক চক্র, স্মৃতিশক্তি ও মেজাজ- বলেন দ্য সুপারচেঞ্জড হরমোন ডায়েটের লেখক ও ন্যাচারোপ্যাথ নাতাশা টার্নার। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই গ্রন্থিটি যেমনটা কাজ করা উচিত তেমনটা সবসময় করে না। এটি পর্যাপ্ত হরমোন উৎপাদন না করলে অথবা অত্যধিক হরমোন উৎপাদন করলে পুরো শরীরে প্রভাব পড়তে পারে। এখানে গোপন থাইরয়েড সমস্যা কিভাবে বুঝবেন তা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

থাইরয়েড সমস্যা বলতে কি বোঝায়?

টার্নার বলেন, ‘পর্যাপ্ত থাইরয়েড হরমোন ছাড়া শরীরের প্রত্যেক সিস্টেম ধীর হয়ে পড়ে। হাইপোথাইরয়েডিজম বা আন্ডারঅ্যাক্টিভ থাইরয়েড রোগ (যখন থাইরয়েড গ্রন্থি পর্যাপ্ত হরমোন উৎপাদন করে না) বিভিন্ন উপসর্গ সৃষ্টি করে এবং ব্যক্তিভেদে এসব উপসর্গের তীব্রতা ভিন্ন হতে পারে। যেসব লোক হাইপোথাইরয়েডিজমে ভুগেন তারা ক্লান্তি অনুভব করেন এবং প্রচুর পরিমাণে ঘুমায়। তাদের ত্বক খুব শুষ্ক হতে পারে, চুল পড়ে যেতে পারে এবং এমনকি মানসিক প্রক্রিয়াও ধীর হয়ে যেতে পারে। তাদের হজম বিলম্বিত হয় ও ওজন বৃদ্ধি পায়।’

থাইরয়েড হরমোনের অভাবে যেসব উপসর্গ দেখা দিতে পারে তা হলো-

* ঘনঘন শীত অনুভব করা অথবা ঠান্ডা তাপমাত্রা সহ্য করতে না পারা।

* শুষ্ক ত্বক, ভঙ্গুর চুল ও নখ ভেঙ্গে যাওয়ার প্রবণতা।

* শরীরচর্চার সময় ঘাম নিঃসরণ কমে যাওয়া।

* অস্বাভাবিক হারে চুল পড়া।

* অনিয়মিত মাসিক অথবা মাসিক ভারী হওয়া।

* যৌন তাড়না হ্রাস পাওয়া।

* কোষ্ঠকাঠিন্য হওয়া।

* অস্বাভাবিক ক্লান্তি অনুভব করা।

* অস্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধি অথবা ওজন কমাতে না পারা।

* আয়রন-ঘাটতি জনিত রক্তস্বল্পতা অথবা উচ্চ কোলেস্টেরল (হাইপোথাইরয়েডিজমে ভোগা কিছু লোকের ক্ষেত্রে)।

আরেকটি থাইরয়েড সমস্যা হলো হাইপারথাইরয়েডিজম বা ওভারঅ্যাক্টিভ থাইরয়েড (যখন থাইরয়েড গ্রন্থি অত্যধিক হরমোন উৎপাদন করে)। টার্নার বলেন, ‘অতিরিক্ত থাইরয়েড হরমোন উৎপন্ন হলে শরীরের প্রত্যেক সিস্টেম দ্রুত হয়।’ উপসর্গের মধ্যে ঠান্ডা সহ্য করতে না পারা, ঘুমাতে সমস্যা হওয়া, ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া, ওজন কমে যাওয়া ও অস্থিরতা উল্লেখযোগ্য। আপনার কোন ধরনের থাইরয়েড সমস্যা রয়েছে তা শনাক্ত করতে আপনার চিকিৎসক থাইরয়েড হরমোন ও অ্যান্টিবডির মাত্রা জানতে রক্ত পরীক্ষা করবেন। যদি এ পরীক্ষায় কোনো অসঙ্গতি ধরা পড়ে, তাহলে ধরে নিতে পারেন যে আপনার থাইরয়েড সঠিকভাবে কাজ করছে না।

* কি কারণে থাইরয়েড সমস্যা হয়?

টার্নার বলেন, ‘হাইপোথাইরয়েডিজম হলো একটি জটিল ডিসঅর্ডার, যার উৎপত্তি হতে পারে বিভিন্ন কারণ থেকে। কিছু সম্ভাব্য কারণ হলো: হ্যাশিমোটো’স থাইরয়েডাইটিসের মতো অটোইমিউন রেসপন্সের কারণে থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যক্রমে সমস্যা, পারদের বিষাক্ত মাত্রা, ইস্ট্রোজেনের উচ্চমাত্রা অথবা হরমোন-রিপ্লেসমেন্ট থেরাপির (এইচআরটি) কারণে প্রজেস্টেরন ঘাটতি, সয়াভিত্তিক খাবার বেশি পরিমাণে খাওয়া, অতিরিক্ত কোমল পানীয় পান করা এবং কিছু পুষ্টি বা খনিজের ঘাটতি, যেমন- আয়োডিন, টাইরোসিন, সেলেনিয়াম ও জিংকের অভাব।’

* থাইরয়েড সমস্যার চিকিৎসা কী?

সাধারণত থাইরয়েড সমস্যার চিকিৎসায় কৃত্রিম থাইরয়েড হরমোনযুক্ত ওষুধ ব্যবহার করা হয়, কিন্তু টার্নার প্রাকৃতিক চিকিৎসা সুপারিশ করছেন। তার পরামর্শ হলো, প্রাকৃতিক চিকিৎসায় ছয় মাস পরও ফল পাওয়া না গেলে ওষুধ ব্যবহারের কথা বিবেচনা করতে পারেন। চেষ্টা করে দেখার জন্য খাবার-সম্পর্কিত কিছু চিকিৎসা রয়েছে, বিশেষ করে আপনার টিএসএইচ (থাইরয়েড-স্টিমিউলেটিং হরমোন) ২.০ ও ৪.৭ এর মধ্যে থাকলে- এটি জানতে রক্ত পরীক্ষা করতে হবে। আপনি হরমোনগত সমস্যায় বিশেষজ্ঞ ন্যাচারোপ্যাথের সঙ্গে কথা বলতে পারেন, বিশেষ করে আপনার টিএসএইচ ৪.০ বা এর বেশি হলে। আপনি থাইরয়েড-সম্পর্কিত উপসর্গে ভুগলে (কিন্তু আপনার রক্ত পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য অসংগতি ধরা পড়েনি) এই তিনটি সাপ্লিমেন্ট সেবন করে ফল পাওয়া যায় কিনা দেখতে পারেন: অশ্বগন্ধা, এল-টাইরোসিন ও কোকোনাট অয়েল।

* অশ্বগন্ধা : টার্নার বলেন, ‘অশ্বগন্ধা হলো একটি ভেষজ উদ্ভিদ যা থাইরয়েড গ্রন্থিকে সরাসরি প্রভাবিত করে থাইরয়েড হরমোন টি৪ ও টি৩ বাড়ায়। যখন আমার মানসিক চাপও থাকে, তখন থাইরয়েডকে সাহায্য করার জন্য আমার প্রিয় পছন্দ হলো অশ্বগন্ধা।’ দিনে দুইবার ৭৫০ থেকে ১,০০০ মিলিগ্রাম অশ্বগন্ধা সেবন করুন।

* এল-টাইরোসিন : টার্নার বলেন, ‘শরীরে থাইরয়েড হরমোন উৎপাদনের জন্য অ্যামিনো অ্যাসিড টাইরোসিনের প্রয়োজন রয়েছে।’ এছাড়া ওজন কমানোর কর্মসূচির শুরু থেকে এল-টাইরোসিন সেবন করা ভালো আইডিয়া, কারণ এটির সম্পূর্ণ কার্যকারিতা পেতে অন্তত চার সপ্তাহ লাগে। আপনার উচ্চ রক্তচাপ না থাকলে ব্রেকফাস্টের পূর্বে ১০০ মিলিগ্রাম এল-টাইরোসিন সেবন করুন। উচ্চ রক্তচাপে এল-টাইরোসিন সুপারিশকৃত নয়।

* কোকোনাট অয়েল : টার্নার বলেন, ‘সকল ফ্যাটকে সমানভাবে সৃষ্টি করা হয়নি এবং সকল ফ্যাট অস্বাস্থ্যকর নয়। আপনার অলস থাইরয়েড গ্রন্থিকে উদ্দীপ্ত করার একটি ভালো উপায় হলো ভার্জিন, নন-হাইড্রোজেনেটেড কোকোনাট অয়েল (নারকেল তেল)।’ এটি ওজন কমাতেও অবদান রাখে। রান্নার সময় এই তেল ব্যবহার করুন- এটির তাপ সহ্য করার ক্ষমতা অলিভ অয়েলের তুলনায় বেশি। আপনি স্মুদিতেও এক চা চামচ কোকোনাট অয়েল মেশাতে পারেন।

রোগ নির্ণয় করুন

যদি মনে করেন যে আপনার কোনো সমস্যা রয়েছে, তাহলে মনের মধ্যে সন্দেহ নিয়ে বসে না থেকে চিকিৎসকের কাছে যান ও পরীক্ষা করুন। চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে আপনার জন্য কার্যকর হতে পারে এমন চিকিৎসা নিন। উপসর্গ হলো রোগের ইঙ্গিতবাহক। উপসর্গ আপনাকে জানাতে চায় যে শরীরকে চিকিৎসক দেখান, অবহেলা করবেন না। আপনাকে এটা মাথায় রাখতে হবে যে, বিভিন্ন রোগের উপসর্গ একই হতে পারে, কাজেই উপসর্গ দেখে আপনার কোন সমস্যা রয়েছে তা সম্পর্কে নিজে নিজে সিদ্ধান্তে আসা উচিত নয়। প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে ও উপযুক্ত সেবা পেতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। উপসর্গকে উপেক্ষা করলে অথবা রোগ শনাক্ত না করে বসে থাকলে অথবা সঠিক চিকিৎসা না নিলে যে কেউ মারাত্মক পরিণতিতে ভুগতে পারেন।

তথ্যসূত্র : রিডার্স ডাইজেস্ট


রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৬ আগস্ট ২০১৯/ফিরোজ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন