ঢাকা, রবিবার, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ৩১ মে ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

করোনাভাইরাস যেভাবে শরীরের প্রতিটি অঙ্গকে আক্রমণ করে

এস এম গল্প ইকবাল : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-০৪ ৯:২৯:৩২ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-০৪ ১১:৫২:১১ এএম

নতুন করোনাভাইরাস আবির্ভাবের শুরু থেকেই আমরা এটির সংক্রমণকে (কোভিড-১৯) অবহেলা করেছি ও ভুল বুঝেছি। কিন্তু সময় পরিক্রমায় আমরা রোগটি সম্পর্কে অনেককিছু জানতে পেরেছি। এখন এটা পরিষ্কার যে কোভিড-১৯ কেবল শ্বাসতন্ত্রীয় রোগ নয়, এটি শরীরের অন্যান্য অঙ্গেরও ক্ষতি করতে পারে।

কোভিড-১৯ পরিপাকতান্ত্রিক রোগের মতো ডায়রিয়া ও পেট ব্যথায় ভোগাতে পারে। এটি এমন উপসর্গ সৃষ্টি করে যাকে ঠান্ডা বা ফ্লু ভেবে ভুল হতে পারে। প্রধান উপসর্গসমূহ ছাড়াও এ রোগে চোখ লাল হওয়া, সর্দি, স্বাদ ও ঘ্রাণের শক্তি হ্রাস, পেশি ব্যথা, ক্লান্তি, ডায়রিয়া, ক্ষুধা হ্রাস, বমিভাব ও বমি, পুরো শরীরে ফুসকুড়ি, শরীরের কিছু স্থানে ফোলা ও লাল হওয়া এবং আরো কয়েকটি ব্যতিক্রমী উপসর্গ প্রকাশ পেতে পারে।

চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন আরো তীব্র অসুস্থতায় রোগীদের অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন, হার্ট ফেইলিউর, কিডনি ড্যামেজ, বিভ্রান্তি, মাথাব্যথা, খিঁচুনি, গিলেন-বেয়ার সিন্ড্রোম (যেখানে ইমিউন সিস্টেম স্নায়ুকোষকে আক্রমণ করে), চেতনা হারানো ও রক্ত শর্করা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হতে পারে।

নতুন করোনাভাইরাস সংক্রমণে প্রথমে জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্টের মতো প্রধান উপসর্গ প্রকাশ পাবে এমনটা নাও হতে পারে। এ কারণে রোগটির শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা অবিশ্বাস্য কঠিন হয়ে পড়েছে। ইয়েল স্কুল অব মেডিসিনের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ জোসেফ ভিনেটজ বলেন, ‘আমি দুই দশক ধরে সংক্রমণ নিয়ে কাজ করছি। কিন্তু কোভিড-১৯ এর মতো এতো অগ্রগতি অন্যকোনো সংক্রমণে দেখিনি।’

করোনাভাইরাস যেভাবে শরীরের প্রতিটি অঙ্গকে আক্রমণ করে

যখন ভাইরাস কণা চোখ, নাক অথবা মুখের সংস্পর্শে আসে তখন ভাইরাসের ‘স্পাইক প্রোটিন’ আমাদের কোষের পৃষ্ঠের ওপর একটি নির্দিষ্ট রিসেপ্টরের (এসিই২ নামে পরিচিত) সঙ্গে সংযুক্ত হয়। এভাবে নতুন করোনাভাইরাসের প্রবেশ ঘটে। এসিই২ রিসেপ্টর একটি বড় টার্গেট নির্ধারণ করে, কারণ আমাদের সারা শরীরে অঙ্গসমূহে এগুলো রয়েছে। ভাইরাসটি প্রবেশের পর কোষকে একটি কারখানাতে রূপান্তর করে, যেখানে ভাইরাসের লক্ষ লক্ষ প্রতিলিপি তৈরি হয়- এগুলো শ্বাসক্রিয়া বা কাশির মাধ্যমে বের হয়ে অন্যদেরকে সংক্রমিত করে।

তাড়াতাড়ি শনাক্তকরণ এড়াতে করোনাভাইরাসটি বহুবিধ উপকরণ ব্যবহার করে সংক্রমিত কোষের সাহায্য চাওয়ার আবেদন প্রতিরোধ করে। আক্রান্তের সময় কোষগুলো যেসব বিপর্যয় সংকেতের প্রোটিন তৈরি করে সেগুলোকে ভাইরাসটি নিষ্ক্রিয় করে দেয়। ভাইরাসটি সংক্রমিত কোষের ভেতরকার ভাইরাস-বিরোধী নির্দেশনাকেও ধ্বংস করে। এর ফলে ভাইরাসটি নিজের প্রতিলিপি তৈরি করতে ও আক্রমণকারী হিসেবে শনাক্তের পূর্বে আশপাশের স্থানকে সংক্রমিত করতে প্রচুর সময় পেয়ে থাকে। এটি হচ্ছে জ্বরের মতো ইমিউন রেসপন্স আরম্ভের পূর্বেই ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ।

সরাসরি আক্রমণ

মৃদু উপসর্গ অথবা উপসর্গবিহীন অনেক রোগী ভাইরাসটি আরো ধ্বংসাত্মক হওয়ার পূর্বেই তাকে প্রতিহত করতে সক্ষম হন। এসব রোগীর শুধুমাত্র উপরিস্থ শ্বাসতন্ত্রীয় উপসর্গ থাকতে পারে, যেখানে তারা প্রথম সংক্রমিত হন। কিন্তু কারো শরীর ভাইরাসটিকে প্রবেশপথে ধ্বংস করতে না পারলে ভাইরাস কণা শরীরের গভীরে চলে যায়। ভাইরাসটি প্রবেশপথ থেকে ফুসফুসে এসে ক্যাম্প গড়তে পারে ও পরিপাকতন্ত্রে টিকে থাকার জন্য লড়াই করতে পারে অথবা উভয়ের সমন্বয়ে কিছু করতে পারে।

ডা. ভিনেটজ বলেন, ‘স্পষ্টত নতুন করোনাভাইরাস সংক্রমণে শ্বাসতন্ত্রে সমস্যা দেখা দেয়, যেকারণে রোগীদেরকে হাসপাতালে যেতে হয়। কিছু রোগী ডায়রিয়া ও পেটের ব্যথা সহকারে পরিপাকতান্ত্রিক অসুস্থতায় ভুগতে পারেন। পরিপাকতান্ত্রিক অসুস্থতার সঙ্গে শ্বাসতন্ত্রীয় সমস্যা থাকতে পারে, আবার নাও থাকতে পারে।’

ভাইরাসটি শরীরের গভীরে চলে গেলে তীব্র অসুস্থতায় ভুগতে হয়, যেখানে এসিই২ রিসেপ্টর রয়েছে এমন অন্যান্য অঙ্গ সরাসরি আক্রান্ত হয়। হার্টের মাংসপেশি, কিডনি, লিভার, রক্তনালী ও কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র প্রত্যক্ষ আক্রমণে পড়তে পারে। এটি কোভিড-১৯ সংক্রমণে বিভিন্ন ধরনের উপসর্গ দেখা দেয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে। ডা. ভিনেটজ বলেন, ‘রোগীর কোনো মারাত্মক রোগ না থাকলে অন্যকোনো অঙ্গের ওপর প্রত্যক্ষ আক্রমণে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা কম।’

মস্তিষ্ক ও স্নায়ুও প্রত্যক্ষ আক্রমণের শিকার হতে পারে। ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো স্কুল অব মেডিসিনের ডিপার্টমেন্ট অব নিউরোলজির প্রধান কেনেথ টাইলার বলেন, ‘নতুন করোনাভাইরাস সংক্রমণে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র সরাসরি আক্রান্ত হতে পারে। একটি ভাইরাস কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করার জন্য অনেক পথ রয়েছে। কিছুটা বিতর্কিত একটি মত হচ্ছে- ঘ্রাণশক্তি হ্রাস এটা নির্দেশ করে যে ঘ্রাণের জন্য দায়ী স্নায়ুটি সংক্রমিত হয়েছে এবং ভাইরাসটিকে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে নিয়ে যেতে পারে, যেমন- মস্তিষ্ক। কিন্তু নতুন করোনাভাইরাস সংক্রমণে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র এভাবে আক্রান্ত হয় এটা নিশ্চিতভাবে বলতে এখনো কোনো প্রমাণ নেই।’

ময়নাতদন্ত ও কোষকলা পরীক্ষার প্রাথমিক গবেষণা থেকে জানা গেছে, কোভিড-১৯ রোগীর নাকের গহ্বর বা গলা ছাড়াও চোখের পানি, মল, কিডনি, লিভার, অগ্ন্যাশয় ও হার্টেও ভাইরাস কণা পাওয়া যেতে পারে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একজন মেনিনজাইটিস রোগীর মস্তিষ্কের তরলে ভাইরাস কণার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

যেভাবে কোভিড-১৯ রোগীর মৃত্যু ঘটে

ফুসফুস মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হলে ইমিউন সিস্টেম অতি সক্রিয় ও উদ্দীপ্ত হয়ে প্রচুর পরিমাণে সাইটোকিন উৎপন্ন হয়। সাইটোকিন হচ্ছে বার্তাবাহক কেমিক্যাল। তীব্র ইমিউন রেসপন্স বা অনাক্রম্য প্রতিক্রিয়ায় শরীরে নিঃসরিত এ অত্যধিক মাত্রার কেমিক্যালকে সাইটোকিন স্টর্ম বলে। এটি হচ্ছে কেমিক্যালের জটিল পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া যা রক্তচাপ কমিয়ে দেয় এবং এমনকি ফুসফুস, হার্ট, কিডনি ও মস্তিষ্কে আরো ক্ষতিসাধন করে। কিছু গবেষক জানিয়েছেন, সাইটোকিন স্টর্মে হঠাৎ করে কোনো অঙ্গ অকার্যকর হয়ে যেতে পারে, যার ফলে কোভিড-১৯ রোগীরা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।

আরেকটি নতুন আবিষ্কার ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, করোনাভাইরাস রোগীদের মৃত্যুর পেছনে অন্য একটি মারাত্মক কালপ্রিটের ভূমিকা থাকতে পারে। অনেক চিকিৎসক প্রাণনাশক কোভিড-১৯ কেসে অস্বাভাবিক রক্তজমাটবদ্ধতা দেখেছেন যা থ্রম্বোসিস নামে পরিচিত। চিকিৎসকেরা সবখানে রক্তজমাটবদ্ধতা দেখেছেন: পায়ে ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস (ডিভিটি), ফুসফুসে পালমোনারি এম্বোলাই (পিই), ধমনীতে স্ট্রোক ঘটানোর মতো রক্তজমাটবদ্ধতা ও ছোট রক্তনালীতে ছোট রক্তজমাটবদ্ধতা। ময়নাতদন্তেও বিভিন্ন অঙ্গে বিক্ষিপ্ত রক্তজমাটবদ্ধতা দেখা গেছে।

হসপিটাল অব দ্য ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার রক্তরোগ ও রক্তজমাট ব্যাধি বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম কুকার বলেন, ‘রক্ত পাতলাকরণ ওষুধ সেবনের পরও রোগীদের মধ্যে উচ্চ হারে রক্তজমাটবদ্ধতা দেখা গেছে। নতুন করোনাভাইরাস সংক্রমণে রক্তজমাটবদ্ধতার কারণ সম্পর্কে গবেষকরা নিশ্চিত হতে পারেননি। সাইটোকিন স্টর্মের মতো রক্তজমাটবদ্ধতাও উচ্চ হারে কোভিড-১৯ রোগীদের মৃত্যু ঘটাচ্ছে।

এছাড়া তীব্র অসুস্থতা জনিত নিম্ন রক্তচাপ, নিম্ন অক্সিজেন মাত্রা, ভেন্টিলেটর ব্যবহার না করা ও রোগীদের নিজস্ব বিবেচনায় ওষুধ সেবনের কারণে অঙ্গের ক্ষতি হচ্ছে, যেমন- হার্ট, কিডনি, লিভার, মস্তিষ্ক ও অন্যান্য অঙ্গ। এসব কারণেও করোনাভাইরাস রোগীদের মৃত্যু হচ্ছে।



ঢাকা/ফিরোজ