ঢাকা, সোমবার, ৫ কার্তিক ১৪২৬, ২১ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

অভিনেতা রবীন্দ্রনাথ || ড. তানভীর আহমেদ সিডনী

ড. তানভীর আহমেদ সিডনী : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৫-০৫-০৭ ৮:৫৪:০৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৮-০৬ ১১:৪১:৪৬ এএম

অভিনেতা রবীন্দ্রনাথের কথা দুয়েকটি বলা যেতে পারে। পরিবারের পরিবেশ তাঁর নাট্যভাবনা তৈরির পথ দেখিয়েছে। নতুন সৃষ্টির উন্মাদনা বরাবরই ঠাকুর বাড়িতে লক্ষ্য করা যায়। শুধু রবীন্দ্রনাথই নন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও স্বর্ণকুমারীদেবীর সাহিত্য সাধনার পর্যায়কে অস্বীকার করার সুযোগ স্বল্পই আছে। নাট্যপ্রয়োগের জন্যও সমকালে এ বাড়ি বিশেষ হয়ে উঠেছিল। ছেলেবেলায় কবির মনে এ বাড়ির পরিবেশ যে প্রভাব রেখেছিল তার বর্ণনা মিলে ‘ছেলেবেলা’ গ্রন্থে, “সদর দরজার কাছ থেকে দাদাদের কেউ কেউ অতিথিদের উপরে আগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। গোলাপপাশ থেকে গায়ে গোলাপজল ছিটিয়ে দিচ্ছেন, হাতে দিচ্ছেন ছোট একটি করে তোড়া। নাটকের থেকে কুলীন মেয়ের ফুপিয়ে কান্না কখনও কখনও কানে আসে- তার মর্ম বুঝতে পারি নে। বোঝবার ইচ্ছে হয় প্রবল।” ধারণা করা সহজতর হলো যে রবীন্দ্রনাথের চিন্তনে নাটকের বীজ বপন করা হয়েছে। ছেলেবেলায় নাটকের সঙ্গে এমনি করে যোগাযোগ হয়েছিল তাঁর। গভীর মনোযোগ দিয়ে বাড়ির নাট্য আয়োজন পর্যবেক্ষণ করেছেন। এ কারণে বোধহয় ভেতরের আয়োজনও তার দৃষ্টিসীমার বাইরে যায় নি। ‘ছেলেবেলা’ গ্রন্থে তিনি লিখেন, “আমাদের বাড়িতে যাত্রাগান হয়েছে মাঝে মাঝে। কিন্তু রাস্তা নেই, ছিলুম ছেলেমানুষ। আমি দেখতে পেয়েছি তার গোড়াকার যোগার যন্তর।”

বাড়ির মঞ্চেই প্রথম অভিনয় করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। যদিও তাঁর প্রথম অভিনীত নাটক কোনটি তা নিয়ে সংশয় আছে। কারো মতে ‘মানময়ী’ গীতিনাট্য, আবার কারো মতে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ‘অলীকবাবু’ প্রহসনে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ মঞ্চে অভিনয় শুরু করেন। ১৮৭৭ সালে অভিনয় করেন ‘এমন কর্ম আর করব না’ প্রহসনে, এখানে তার চরিত্রের নাম ছিল অলীকবাবু। এর চারবছর পর অর্থাৎ ১৮৮১ সালে নিজের লেখা নাটকে অভিনয় করেন রবীন্দ্রনাথ।  নাটকের নাম ‘বাল্মিকী প্রতিভা’। তাঁর বয়স তখন ২০, এই নাটকে একাধারে সুরযোজনা ও নির্দেশনার কাজ করেন তিনি। ‘বাল্মিকী প্রতিভা’ নাটকের দর্শকসারিতে উপস্থিত ছিলেন, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রমুখ। ১৮৮২ সালের ২ ডিসেম্বর মঞ্চস্থ হয় ‘কালমৃগয়া’। এরপর আর নাটকটি মঞ্চস্থ হয় নি। এ নাটকে তিনি অভিনয় করেছিলেন অন্ধমুণির চরিত্রে।

১৮৮৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ‘রাজা ও রানী’ নাটকে বিক্রমদেব চরিত্রে অভিনয় করেন। এই নাটকে তাঁর অংশগ্রহণ ও নাটকের বিবরণ দেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি বলেন, “দেবদত্ত সেজেছিলেন মেজো জ্যাঠামশায়, সুমিত্রা মেজজ্যাঠাইমা, রাজা রবিকাকা, ত্রিবেদী অক্ষয় মজুমদার, কুমার প্রমথ চৌধুরী, ইলা প্রিয়ম্বদা, সেনাপতি নিতুদা, যেমনি লম্বা চওড়া ছিলেন স্টেজে ঢুকলে মনে হত যেন মাথায় ঠেকে যাবে।”

১৮৯০ সালে ‘বিসর্জন’ নাটকে রবীন্দ্রনাথ রঘুপতির চরিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর অভিনয়ের বর্ণনায় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর জানান, বড়ো মাটির মূর্তি দু’হাতে উপরে তুলে মঞ্চের এক পাশ থেকে অন্যপাশে যান। এই কালিমূর্তি তোলার বিষয়টি নাটকের উপস্থাপনায় ছিল না। মহড়ায় অনুশীলন না করা সত্ত্বেও কেন তিনি এর ইম্প্রোভাইজেশন করলেন সেটি সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেন, “কী জানি কী হল, ভাবলুম মূর্তিটাকে তুলে একেবারে উইংসের ভিতর ছুঁড়ে ফেলে দিব। উত্তেজনার মুখে মূর্তি তো তুলে নিলুম, ছুড়তে গিয়ে দেখি ও পাশে বিবি না কে যেন হারমোনিয়াম বাজাচ্ছে, এই মাটির মূর্তি চাপা পড়লে তবে আর রক্ষে নেই। হঠাৎ সামলে তো নিলুম, কিন্তু কোমর ধরে গেল।”

এখানে তাঁর অভিনয় মুগ্ধ করেছিল ত্রিপুরার রাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য ও কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচীকে। রবীন্দ্রনাথের ৬২ বছর বয়সে এম্পায়ার থিয়েটারে মঞ্চস্থ হয়েছিল ‘বিসর্জন’। ১৯২৩ সালে মঞ্চস্থ এই নাটকে রাজা সেজেছিলেন রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রঘুপতির ভূমিকায় দিনেন্দ্রনাথ এবং জয়সিংহের ভূমিকায় কবি নিজেই অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনয় প্রসঙ্গে অহীন্দ্র চৌধুরী লিখেছেন, “এত বয়সে তিনি মঞ্চে এমন সহজ নমনীয় ভঙ্গিতে চলাফেরা করতে লাগলেন যে কেউ ভাবতেও পারেন নি তাঁর এতখানি বয়স হয়েছে।”
১৯০৯ সালে শান্তিনিকেতনে ‘প্রায়শ্চিত্ত’ অভিনীত হয়। পরের বছর আরও দুবার মঞ্চস্থ হয় নাটকটি। এই তিনবারের মধ্যে দুবার রবীন্দ্রনাথ নাটকটিতে ধনঞ্জয় বৈরাগীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। এই চরিত্রে অভিনয়ের সময় তিনি গান ও নাচের অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন যাতে বাউল ভাবটি প্রকাশিত হয়।

১৯১০ সালে শান্তিনিকেতনে মঞ্চস্থ হয় ‘রাজা’, এখানে তিনি অভিনয় করেন ঠাকুরদার ভূমিকায়। যাদের ‘রাজা’ নাটকটি পাঠ করা আছে তারা নিশ্চয়ই জানেন-ঠাকুরদা একই সঙ্গে নাচ ও গানের ডালি নিয়ে ঘুরে বেড়ান। ‘রাজা’ নাটকের স্মৃতিচারণে সীতাদেবী জানাচ্ছেন, “রাজা অভিনয় দেখিয়া একেবারে বিস্মিত ও মুগ্ধ হইয়া গেলাম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরদা সাজিয়াছিলেন। আড়াল হইতে রাজার ভূমিকায় তিনিই অভিনয় করিয়াছিলেন। ..একটা জিনিস আমার সর্বদা মনে হইত, যখনই তাঁহার অভিনয় দেখিতাম তিনি যে ভূমিকায় অবতীর্ণ হোন, তিনি যে রবীন্দ্রনাথ ইহা কিছুতেই ভুলিতে পারিতাম না। আত্মগোপন করা তাঁহার পক্ষে অসম্ভব ছিল। যদিও তিনি অতি উৎকৃষ্ট প্রথম শ্রেণির অভিনেতা ছিলেন।”

১৯১১ সালে ‘শারদোৎসব’ নাটকে সন্যাসীর ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি। ১৯১৪ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে শান্তিনিকেতনে মঞ্চস্থ হয় নাটক ‘অচলায়তন’। এই নাটকে গুরুর ভূমিকায়ও অভিনয় করেছিলেন তিনি নিজেই। এর তিন বছর পর কবির জন্মদিনে ‘অচলায়তন’ মঞ্চস্থ হয়, এখানে তিনি অদীনপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন। জন্মদিনে নাটক মঞ্চায়নের সময় তিনি দর্শক আসনে বসে থাকতেন না। সক্রিয় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে জন্মদিনের আনন্দ উদযাপন করতেন।

১৯১৬ সালে অভিনীত ‘ফাল্গুনী’ নাটকে তিনি বাউলের চরিত্রে অভিনয় করেন। তার অভিনয়ে মুগ্ধ অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবিগুরুর বাউলমূর্তি এঁকেছিলেন। ৫৫ বছর বয়সী রবীন্দ্রনাথ নাচ, গান ও অভিনয়ের ত্রিবেনী সঙ্গমে দর্শকের উপর ব্যাপক প্রভাব রেখেছেন। ১৯১৭ সালে মঞ্চস্থ হয় ‘ডাকঘর’। একই বছর লিখিত এই নাটকের প্রথম মঞ্চায়ন হয় শান্তিনিকেতনে। পরে কলকাতায় মঞ্চস্থ হয় নাটকটি। এই নাটকে তিনি ঠাকুরদার ভূমিকায় অভিনয় করেন। একই নাটকে তিনি প্রহরীর ভূমিকায়ও অভিনয় করেন। ‘নটীর পূজা’ নাটকটি জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে ১৯২৬ সালে মঞ্চস্থ হয়, এতে তিনি উপালি চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের আগ্রহ সৃষ্টি করেন।

১৯৩৫ সালে শেষবারের মতো মঞ্চে দাঁড়ান, অভিনেতা রবীন্দ্রনাথ। কলকাতার নিউ এম্পায়ার মঞ্চে ১২ ও ১৩ ডিসেম্বর ‘অরূপরতন’ মঞ্চস্থ হয়েছিল। অভিনেতা রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে এমনি করেই বাংলা নাটকের দর্শকের যোগ সাধিত হয়।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৮ মে ২০১৫/তাপস রায়
 

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন