ঢাকা, সোমবার, ৫ কার্তিক ১৪২৬, ২১ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:
ফুটপাতের জীবিকা-১

টিয়া দিয়া ভাগ্যের খেলা!

আরিফ সাওন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৬-১৯ ৮:২২:৫৯ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৬-২৩ ৬:৪৯:২৮ পিএম

আরিফ সাওন: ‘যে কাজে আগ্রহ করছেন তা থেকে বিরত থাকবেন। কেননা, এ ইচ্ছা কষ্টের কারণ হবে। আপনি শত্রুদের মধ্যে পরিবেষ্টিত কিন্তু আল্লাহতাআলা আপনাকে মুক্তি দেবেন এবং আপনার মনোবাসনা পুর্ণ হবে। আপন লোকদের ভালোবাসা এবং তাদের ক্ষতি থেকে দূরে থাকেন। জন্ম তারিখ হিসেবে আপনার রাশি মেষ। আপনি কারো ক্ষতি করেন না কিন্তু অনেকেই আপনার ক্ষতি করার চেষ্টা করে। তবে তেমন কিছু করতে পারে না।’

১৭ জুন বেলা পৌনে ১২ টার দিকে গুলিস্তানে ‘টিয়া পাখি দিয়ে ভাগ্যের খেলায়’ এ প্রতিবেদককে এসব কথা বলেন মো. মুনসুর আলী। বয়স তার ৭০ এর ঘরে।

প্রায় প্রতিদিনই তাকে দেখা যায় গুলিস্তানে মহানগর নাট্যমঞ্চ প্রাঙ্গনের মূল ফটকের পাশে। কখনো কখনো দেখা যায়, তাকে ঘিরে কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের তিনি কিছু বলছেন। তারাও খুব আগ্রহের সাথে শুনছেন। আবার কখনো দেখা যায় তিনি একা বসে আছেন।

বয়সের ভারে মুখে আর কপালে ভাঁজ পড়ে গেছে। ত্বক হয়েছে তামাটে। চুল সাদা হয়ে গেছে। দাড়িরও ঠিক একই অবস্থা। দাঁত বেশিরভাগ পড়ে গেছে। কথা বলার সময় সামনে একটা দাঁত দেখা য়ায়। চোখ লালচে হয়ে গেছে।

যখন কোনো লোক না থাকে তখন যেভাবে বসে থাকেন, দেখে মনে হয় খুব দুচিন্তা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। আজও ঠিক সেভাবে একা বসে ছিলেন।

একটু দূর থেকে দেখা যায়, তিনি বসে আছেন দেয়াল ঘেঁসে। তার ডান হাতে ছোট একটা কাঠি। সামনে এক সারিতে সাজিয়ে রাখা আছে কতোগুলো চিঠির খাম। হাতের বা-পাশে একটি খাঁচায় রয়েছে একটি টিয়া পাখি। রয়েছে একটি ছোট বইও। কাছে গিয়ে জানা গেল, এটা রাশি দেখার বই।

টিয়া পাখি দিয়ে ভাগ্য দেখা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগে আপনি নিজেরটা দেখেন। তারপর বলছি।’  

এবার তিনি খাঁচা থেকে টিয়া পাখি বের করেন। বলেন, ‘এই নামে একটা চিঠি উঠাও।’ পাখিটি ঠোঁট দিয়ে একটি চিঠির খাম ধরে আবার খাঁচার মধ্যে চলে যায়। খামের ভেতর থাকা কাগজটি মুনসুর আলী বের করেন। তারপর পড়ে শোনান। এটাই সেই ভাগ্যের লিখন!
 


তবে এটাকে ‘ভাগ্য’ বলতে নারাজ মুনসুর আলী। তিনি বলেন, ‘ভাগ্য নেই, ভাগ্য মানুষের কর্মে। কর্ম ছাড়া ভাগ্য নেই। মানুষের ভাগ্য আমি দেখতে পারলে, ফুটপাতে বসতাম না। ফুটপাতে মানুষ কখন বসে? কোনো উপায় না পেয়ে। ভাগ্য বললে গুনাহ হবে। এটা হচ্ছে মনের শান্তনা। সোজা কথায় বিনোদন। এটাকে খেলাও বলতে পারেন; ভাগ্য গণনা নয়!’

‘এই যে আপনার একটা চিঠি দেখলাম। আপনাকে যা বললাম, কথায় কাজে কতটুকু মিল হয়েছে আপনিই জানেন। এই এতটুকুই। মিলের কারণেই মানুষ আসে, দেখে, ১০ টাকা দেয়।’

মানুষ যেটাকে বলেন ভাগ্য গণনা। টিয়া পাখি দিয়ে এই ভাগ্য গণনা করতে জনপ্রতি তিনি ১০ টাকা করে নেন।

মানুষ এটাকে কীভাবে নেয়, কেউ কখনো খারাপ ব্যবহার করে কি না- জানতে চাইলে বলেন, ‘অনেকেই করে। যারা মন্তব্য করে, তারাই আবার এখানে এসে দেখে। দেখে বলে, না দাদা, ঠিক আছে।’

মুনসুর আলী জানান, কারো কারো কাছে এটা চিট ব্যবসা। এটা ভালো কাজ না। এটা ধাপ্পাবাজি। অনেকে ছেড়ে দিতে বলেন। যারা ছেড়ে দিতে বলেন তারা তো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন না। তাহলে ছেড়ে দিয়ে কি করবেন। স্ত্রীকে নিয়ে কি খাবেন! তিনি তো ভিক্ষা বা চুরি করে খাচ্ছেন না। তাই মাঝে মাঝে মানুষের কথায় ভীষণ কষ্ট পান।

মুনসুর আলী ১৯৮২ সালে প্রথম এই কাজ শুরু করেন। এরপর মাঝে কয়েক বছর বাদ দেন। তখন পোশাক করাখানার ফেলনা জিনিস কেনাবেচার কাজ শুরু করেন। সেই ব্যবসায় তিনি সফল হতে পারেন নি।

তিনি বলেন, ‘পোশাক কারখানার ফেলনা জিনিসের  ব্যবসা করতে গিয়ে ব্যবসায় মাইর খেয়ে গেলাম। ব্যবসায় ধরেন নানান ধরনের চাদাঁবাজি, এই-সেই! হ্যান-ত্যান! অনেক টাকা পয়সা মাইর খাইলাম! পরে ১৯৯৮ সালের বন্যাতেও অনেক টাকা পয়সা মাইর খাইয়া গেলাম! তখন অন্য কোনো পথ না দেইখ্যা, ধরেন আমার অস্তিত্ব হারাই ফেলছি। কোনো পথ না দেইখ্যা, এই লাইনটা আমার জানা ছিলো, পরে আবার এই লাইনে আইছি। এর আগে মটর গাড়িও চালাইছি। বয়স হয়ে গেলে আর গাড়ি চালানো সম্ভব হয় না।’
 


২০০৬ সালে আবার নতুন করে মুনসুর আলী এই কাজ শুরু করেন। সংসারে মাত্র দুজন তারা, স্বামী-স্ত্রী। বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সিদ্দিরগঞ্জ থানা এলাকায়। দুই ছেলে-এক মেয়ে। তাদের বিয়ে হয়েছে। তারা আলাদা সংসারে থাকেন।

এখন আর এই বয়সে এসে তেমন কোনো চাওয়া পাওয়া নেই। তিন বেলা তিন মুঠো খেয়ে মাটির তলে যেতে পারলে হয়। এটাই তিনি প্রত্যাশা করেন।

তার সাথে কথা বলার মাঝেই রাজীব নামের এক যুবক আসেন। তার বেলাতেও একইভাবে টিয়া পাখি বের করে চিঠি তোলান। সেই চিঠির ভেতরে থাকা কাগজে লেখা ছিলো- ‘অস্থির হয়ে আছো। শরীরে তাপ বেশি থাকে। সর্বদা দুঃখ কষ্টের মধ্যে অনেক কাজেই ইচ্ছানুযায়ী সমাধান হয় না। এই দিনগুলো দুর্ভাগ্যের কারণ। এভাবে আরো কিছু দিন চলবে; আল্লাহ চাইলে শিঘ্রই সুদিন আসবে। মন শান্ত হবে, চিন্তা ভাবনা করা ঠিক হবে না। ধৈর্য্য ও দৃঢ়তার সাথে এ দিনগুলো কাটানো উচিত। কারো সাথে ঝগড়া ফ্যাসাদ করলে অমঙ্গল হবে। দান করা ভালো। মশুর ডাল ও লাল কাপড় মঙ্গলবারে দান করা এ বরুজের অনুকুলে আসে।’

কাগজটি পড়া শেষে ওই যুবকের উদ্দেশে মুনসুর আলী বলেন, ‘বন্ধু-বান্ধব ও মহিলা (বিপদ হতে পারে এমন কেউ) থেকে সাবধান থাকতে হবে। যেহেতু বর্তমান সময়টা ভালো যাচ্ছে না।’

‘কেন এমন হয়? কি করলে ভালো হবে, পুরো ঘটনা জানতে হলে হাত দেখাতে হবে। ৩০ টাকা খরচ করতে পারবা? পুরো লাইফের ঘটনা জানতে পারবা।’

তখন সেই যুবক বলেন, ‘৩০ টাকা?’

মুনসুর আলী বলেন, ‘না, এই ১০ টাকা সহকারে ৪০ টাকা হয়।’

দর কষাকষিতে যুবকের উদ্দেশে মুনসুর আলী বলেন, ‘জানার অপর নাম জ্ঞান। জেনে রাখা ভালো। জানলে বিপদ হয় না। সতর্ক-সাবধান থাকা যায়। টাকা বড় কথা নয়, জানাটা বড়।’

তখন আবার যুবক বলেন, ‘৩০ টাকা নেন।’ তিনি বলেন, ‘আবার ১০ ট্যাকা কম দিবা?’ যুবকের সাথে থাকা আরেক যুবক তাকে হাত ইশায়ায় না করে।
 


তাই এই যুবক হাত না দেখিয়ে ১০ টাকা দিয়ে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ান। এ সময় তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, যা যা বলেছে তার সাথে মিল আছে।

এরপর আসেন আরেক ব্যক্তি। তিনি সকালে হাত দেখিয়ে গেছেন। তিনি জানান, তার সম্পর্কে যা যা বলেছে সব মিলে গেছে। তাই এখন এসেছেন পরামর্শ নিতে। এসময় মুনসুর আলী তাকে পরামর্শ দেন, একটি আকিক পাথর ব্যবহারের। আকিক পাথর চেনার উপায়ও তিনি বই খুলে তাকে দেখিয়ে দেন। তাকে জানান, পাথর কিনতে গিয়ে মানুষ ঠকে। তাই যাতে না ঠকেন সেজন্য পাথর চেনার উপায় বলে দিলেন।

ওই লোকটি চলে গেলে টিয়া পাখির এই চিঠি ধরা সম্পর্কে জানতে চাইলে মুনসুর আলী জানান, এর জন্য টিয়া পাখিটাকে প্রশিক্ষণ দিতে হয়। একটা পাখি কেনার পর বাড়িতে এনে তাকে বেশ কিছু দিন প্রশিক্ষণ দিয়ে উপযুক্ত করে গড়ে তোলা হয়। যখন বোঝা যায় যে, পাখিটি সঠিকভাবে কাজটি করতে পারছে, তখন তাকে নিয়ে বসা হয়।

তিনি বলেন, ‘পাখিটাকে নিয়ে খেলতে হয়। হাত দিয়ে তুলে চিঠিটা মুখে দিতে হয়। বারে বারে এরকম খেলতে খেলতে, যখন পাখিটা বুঝতে পারে যে, চিঠিটা ধরতে কয়। ধরলেই ছেড়ে দেবে। এরপর পর সে চিঠি ধরা শুরু করে। মানুষও যেমন বোঝে, মানুষের যেমন মস্তিষ্ক আছে, পাখিরও আছে। তাই বার বার বোঝানোর চেষ্টা করলে সেও বোঝে।’

২০০৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত ছয়টি পাখি দিয়ে তিনি এ কাজ করেছেন। তিনটা পাখি মারা গেছে। তাতে তিনি ভীষণ কষ্ট পেয়েছেন। কারণ, সহজে পাখি পাওয়া যায় না। তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা, চার হাজার টাকা দিয়ে একটা পাখি কিনতে হয়। একবার মোবাইল কোর্টও নিয়ে গেছে একটা পাখি।

পাখির যত্ন নেওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমার নিজের চেয়ে বেশি নিতে হয় পাখির যত্ন। তারে দিয়ে তো আমার ইনকাম করতে হয়। আমার দেহের জন্য যতটুকু যত্ন নেই, তার চেয়ে পাখির য্ত্ন অনেক বেশি নিতে হয়। তার প্রধান খাদ্য হচ্ছে ধান, পেয়ারা, আপেল, কলা। এগুলো দেই। কামড়ে খায়।’

মাঝে মাঝে মুনসুর আলীকে এখানে দেখা যায় না। কেন, জানতে চাইলে বলেন, ‘সকালে এসে বসি আর সন্ধ্যার ঠিক আগে চলে যাই। এখানে-ওখানে বিয়ে কিংবা কোনো অনুষ্ঠানে খেলা দেখানোর জন্য মাঝে মাঝে নিয়ে যায়। সেখান থেকে এক দুই হাজার টাকা দেয়। এখানে বসলেও তো আর এতো টাকা পাই না। এখান থেকে সামান্য কিছু আয় হয়। তা দিয়ে দুই জনের চলে যায়।’

মুনসুর আলী জানান, শুধু তিনি নন, গুলিস্তানে টিয়া পাখি নিয়ে আরো দুই জন বসেন।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৯ জুন ২০১৯/সাওন/শাহনেওয়াজ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন