ঢাকা, রবিবার, ১৫ চৈত্র ১৪২৬, ২৯ মার্চ ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

ফেনীবাসীর কলঙ্কিত ‘নুসরাত’ অধ্যায়

সৌরভ পাটোয়ারী : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০১-০১ ১১:২২:৫৬ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০১-০১ ৩:০৯:৪৬ পিএম

২০১৯ সালটি ছিলো ফেনীবাসীর জন্য একটি কলঙ্কিত অধ্যায়। সেটি হয়েছিল নুসরাত জাহান রাফিকে দিয়ে।

একা একটি মেয়ে লড়ে গেছেন এ সমাজের কিছু মানুষরূপি পশুর সাথে। যেখানে ছিলেন এ সমাজেরই দায়িত্বশীল প্রতিনিধি একজন মাদ্রাসা অধ্যক্ষ, একজন ওসি, একজন রাজনৈতিক নেতা।

মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার অকাণ্ডের বিচার চাইতে গিয়ে ওসি মোয়াজ্জেমের কাছে উল্টো হেনস্থা হতে হয়েছিলো আত্মদানে বলিয়ান হওয়া নুসরাতকে।

বখাটের প্রেম নিবেদনে সাঁড়া না পেয়ে প্রথমে নুসরাতের চোখে চুন নিক্ষেপ করে অধ্যক্ষের লালিত মাদ্রাসা ছাত্র ফাঁসির দন্ডাদেশ প্রাপ্ত নুর উদ্দিন। বিচার যায় তৎকালীন সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেমের কাছে। তার বিচার না হওয়ায় নুসরাতের উপর অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে যায়। কারো কাছেই সুবিচার পায়নি নুসরাত। শেষাবধি মানুষরূপি পশুদের হাতে তাকে পুড়ে মরতে হয়েছে ।

শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পা রাখার পরই নুসরাতের উপর কুদৃষ্টি পড়ে হায়েনাদের। সেজন্য মায়ের আদেশে শিশু থেকেই বোরকা পরতেন তিনি। তবুও একের পর এক প্রেম প্রস্তাবে জর্জরিত নুসরাত। বখাটে শত বাধা পেরিয়ে দশম শ্রেণিতে পা রাখে নুসরাত।

প্রেমে সাড়া না দেয়ায় ২০১৭ সালে ২২ ফেব্রুয়ারি দুপুরে সোনাগাজীর কাশ্মীরবাজার সড়কে নুসরাতের মুখে চুন ছোড়ে বখাটেরা। তখন নুসরাত সোনাগাজী খাতিজাতুল কোবরা মহিলা মাদ্রাসার দাখিল পরীক্ষার্থী ছিল। চুন পড়া চোখের যন্ত্রণা নিয়ে দাখিল পরীক্ষা শেষ করে নুসরাত। এতো কিছুর পরও মেধা তালিকা উর্ত্তীণ হয়ে সোনাগাজী সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হয়। ভর্তির পর আরো বেড়ে যায় বখাটে উপদ্রব। অতিষ্ঠ হয়ে উঠেন মা-বাবা। অধ্যক্ষের কাছে যায় বিচারের পর বিচার। কিন্তু না অধ্যক্ষের নিজেরই কুদৃষ্টি পড়ে নুসরাতের উপর।

অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ তার অফিসকক্ষে ডেকে নিয়ে নুসরাতের শ্লীলতাহানি করেন। এই অভিযোগে মামলা করেন নুসরাতের মা। এরই জেরে ৬ এপ্রিল অধ্যক্ষের নির্দেশে পাঁচজনে মিলে মাদ্রাসার ছাদে নিয়ে নুসরাতকে হাত-পা বেঁধে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের  বার্ণ ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চার দিন পর ১০ এপ্রিল নুসরাত মারা যান। ঘটনাটি সংবাদমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার পরপর আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়ে মানববন্ধন, সভা-সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের লোকজন। ঘটনাটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নজরে এলে তাৎক্ষনিক অপরাধীদের সর্বোচ্চ সাজার আশ্বাস দেন। জাতীয় সংসদেও মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত হত্যাকান্ডের নির্মম ঘটনাটি আলোচিত হয় এবং আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠে। মামলার বিচারকাজ দ্রুত শেষ হয়। ২৪ অক্টোবর জেলার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল অভিযুক্ত সাবেক অধ্যক্ষসহ ১৬ জনকে মৃত্যুদন্ডাদেশ দেন।

উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রাক্তন সভাপতিসহ দন্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামিরা হলেন- সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার (বহিস্কৃত) অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা, মাদ্রাসার ছাত্র নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর আওয়ামী লীগ নেতা মাকসুদ আলম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, জাবেদ হোসেন সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, হাফেজ আবদুল কাদের, আবছার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন শম্পা প্রকাশ চম্পা, আবদুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম, উপজেলা আওয়ামী লীগের বহিস্কৃত প্রাক্তন সভাপতি রুহুল আমীন ও মহিউদ্দিন শাকিল। এই মামলায় ৯২ জন সাক্ষীর মধ্যে ৮৭ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। এ মামলার অন্যতম আসামি কামরুন নাহার মনি কারাগারে থাকা অবস্থায় কন্যা সন্তানের মা হন।

নুসরাত হত্যা ঘটনায় ৮ এপ্রিল নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। এই মামলাটি প্রথমে পুলিশ তদন্ত করলেও পরবর্তীতে পিবিআই পুলিশের নিকট হস্তান্তর হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ফেনীর পিবিআই পরিদর্শক মো. শাহ আলম ১৬ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ১৬ জন আসামির মধ্যে ১২ জন আসামী আদালতে দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।

দ্রুততম সময়ে যুগান্তকারী রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বাদি পক্ষের আইনজীবী এম শাহজাহান সাজু বলেন, ‘মাত্র ৬১ কার্যদিবসে বহুল আলোচিত এ হত্যা মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। যা দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে নজিরবিহীন।’

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় নুসরাতে মা শিরিনা আক্তার বলেন, মেয়ে হত্যার ঘটনায় তিনি যে ধরনের শাস্তির আশা করেছেন। আদালত সঠিক বিচার করেছেন। মেয়েকে হয়তো আর কোনোদিন ফিরে পাবো না।কিন্তু মেয়ে হত্যাকারীদের ফাঁসির রায় কার্যকর করার মধ্যদিয়ে একটু স্বস্তি পাবো। নুসরাতের মা রায়ে সব আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।



ফেনী/সৌরভ/টিপু