ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ১৩ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২৯ ১৪২৭ ||  ২২ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

এমন সম্মান তো মাশরাফির-ই প্রাপ্য

|| রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:৪২, ৬ মার্চ ২০২০  
এমন সম্মান তো মাশরাফির-ই প্রাপ্য

কতদিন পর চোখে চশমা পড়েছেন মাশরাফি। দুপুরে যখন ড্রেসিংরুম থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন তখন কি চোখ লুকাতে চেয়েছিলেন! ওই চোখে কি জল ছিল? ওই চোখ কি ছলছল করছিল?

ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে সাফ বলেছিলেন, ‘এগুলো বানাবেন না।’ মাশরাফির ইঙ্গিত ছিল, যেরকম পরিস্থিতি আসুক না কেন আমি শক্ত আছি।’

ইস্পাত দৃঢ় মানসিকতার মতো মাশরাফি শক্ত-ই থাকলেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। অধিনায়কত্বের শেষ ম্যাচে বাংলাদেশ জয় পেল। কিন্তু মাঠে নামার ঠিক আগেও দলকে সতর্ক করলেন, ‘ম্যাচটা হারলে কিন্তু সব শেষ হয়ে যাবে।’ ওই বার্তা থেকে পুরো দলও সজাগ। পুরো দল এক। আজকের পর মাশরাফি ‘ভাই’ আর অধিনায়ক থাকবেন না মাঠে কেউ ভাবেননি এমনটা। কিন্তু জয় নিশ্চিতের পর কাছের মানুষ হারানোর হাহাকার প্রত্যেকের কণ্ঠে।

গোটা দলকে কিভাবে মাশরাফি এক করে রেখেছিলেন তা বোঝা গেল ম্যাচ জয়ের পর। ২০১১ বিশ্বকাপের ফাইনালের কথা মনে আছে? বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক তো ছিলেন মাহেন্দ্র সিং ধোনী। কিন্তু বিশ্বজয়ের পর হারভাজন, যুবরাজ সিংদের কাঁধে চড়েছিলেন শচীন টেন্ডুলকার। ভারতের ব্যাটিং ঈশ্বরকে দেওয়া ওই সম্মান তার প্রাপ্য।

মাশরাফি বিশ্বকাপ জেতেননি। মাশরাফি দলকে ফাইনালেও নেননি। কিন্তু এ দলটার ‘ধোনি, টেন্ডুলকার’ সব তিনি। তাইতো তামিমদের কাঁধে চড়ে শেষবার মাঠ ত্যাগ করলেন বাংলাদেশের ২২ গজের নেতা। এ সম্মানেরও প্রাপ্য মাশরাফি।

ওখানেই সতীর্থদের কৃতজ্ঞতা থামেনি। মাশরাফি তখন ড্রেসিংরুমে। সতীর্থরা একে একে বেরিয়ে এলেন লাল-সবুজের জার্সিতে। বুকে লিখা, ‘থ্যাংক ইউ ক্যাপ্টেন’। জার্সির নাম, ‘মাশরাফি’ সাথে মাশরাফির জার্সির নম্বর ২।’

মাশরাফি ছাড়া স্কোয়াডে থাকা ১৪ জনের গায়ে এক জার্সি, এক নাম, এক নম্বর। শুধু বাংলাদেশ কেন উপমহাদেশে এমন সম্মান কেউ কোনোদিন পাননি। ড্রেসিংরুমে কতোটা জায়গা জুড়ে এ নেতা নিজের রাজত্ব করেছেন তা আবারও শোনা গেল তামিমের কন্ঠে, ‘এ মানুষটা আমার জন্য কতো কি করেছে আমি বলে বোঝাতে পারব না। আমাকে যখন বাদ দিতে চেয়েছিল তখন পিলার হয়ে আমার পাশে থেকেছে।’

মোহাম্মদ মিথুনের গলা ভার। বাংলায় টিভিতে বললেন, ‘আমি ঠিক বলতে পারছি না কিভাবে বলব উনি আমাকে, আমার ক্রিকেটিং ক্যারিয়ারে কতোটা প্রভাব রেখেছে।’

মাশরাফি ড্রেসিংরুম থেকে বেরিয়ে অবাক। সংবাদ সম্মেলনে এসে স্বীকার করলেন, ‘ওরা যে এসব করছে আমাকে কিছু বলেনি। জানলে একটু বাড়তি অনুভব করতে পারতাম।’ মাশরাফিকে বিসিবির পক্ষ থেকে দেওয়া হয় ক্রেস্ট। জাতীয় দলের পক্ষ থেকেও পেয়েছেন ক্রেস্ট। সাথে জিম্বাবুয়ে সিরিজে থাকা স্কোয়াডের সকল সদস্যের অটোগ্রাফ সংবলিত জার্সি। মাশরাফি টিভিতে বললেন, ‘আমি ওদের সম্মানে আপ্লুত। এতোটা সম্মান, ভালোবাসা পাবো ভাবিনি। ওদের নিয়ে খুব গর্ব হচ্ছে। নিজের ছেলেদের নিয়ে আমি সত্যিই খুব খুশি।’

পন্টিং, ফ্লেমিং, ধোনি, রানাতুঙ্গা, আজহার উদ্দিন, গাঙ্গুলী, ইমরান খানসহ ব্রায়ান লারা, ওয়াসিম আকরাম, স্যার ভিভিয়ান রিচার্ডস, বিরাট কোহলি; এ নামগুলো ক্রিকেট বিশ্বের সবথেকে প্রসিদ্ধ। নানা কারণে তারা ক্রিকেট বিশ্বে বিখ্যাত। সেই নামের তালিকায় আজ যুক্ত হলেন বাংলাদেশের মাশরাফি বিন মুর্তজা। প্রত্যেকেই তারা এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছেন। তারা প্রত্যেকেই দেশকে অধিনায়কত্ব করে জিতিয়েছেন ৫০টির বেশি ম্যাচ। আফসোস মাশরাফি থাকবেন ৫০ নট আউট হয়ে!

ইনজুরি জর্জরিত ক্যারিয়ারের দীর্ঘ সময় থেকেছেন মাঠের বাইরে। অধিনায়কত্বসহ মাঠের ভেতরে থাকলে হয়তো সবাইকে ছাড়িয়ে নিজের নাম তুলতে পারতেন সবার ওপরে। বিধাতা হয়তো এমনটা চাননি। কিন্তু যতটুকু মাশরাফি পেয়েছেন তাতে খুব খুশি, ‘ক্যারিয়ার কতোটা লম্বা হবে। অধিনায়কত্ব কতোদিন করবো সেগুলো নিয়ে কোনোদিন চিন্তা করিনি। আজ ছাড়ছি এখনও চিন্তা করছি না। যা পেয়েছে তাতে সন্তুষ্ট।’

ক্রিকেটার মাশরাফি অনেক বড়। অধিনায়ক মাশরাফি আরও বড়। তার সাফল্য-ব্যর্থতা কিংবা প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি হিসেবের খাতায় শুধু গোনার জন্যই মানায়। মাঠের বাইরে ও ভেতরে যে দলটাকে গুছিয়ে দিয়েছেন সেজন্য পুরো বাংলাদেশ হয়ে থাকবে অনুগৃহীত। ধূমকেতু হয়ে এসেছিলেন। ধ্রুবতারা হয়ে তিনি স্বপ্ন সত্যি করেছেন। রংধনুর সাত রঙে রাঙিয়েছেন। শেষ ক্যানভাসটাও হয়ে রইল আরও রঙিন


সিলেট/ইয়াসিন/আমিনুল/নাসিম 

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়