ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০৪ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

অচেনা নিস্তব্ধতায় কাঙ্ক্ষিত বিশ্রামে মিরপুর স্টেডিয়াম

ইয়াসিন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৩-৩০ ৪:৩২:১১ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-৩০ ৪:৩২:১১ পিএম

ক্রিকেটারদের আনাগোনা নেই। ব্যাট-বলের ঠুকঠাক শব্দও হয়ে গেছে বড্ড অচেনা। যেখানে সব সময় থাকতো ক্রিকেটারদের কোলাহল, সেখানে এখন নেমে এসেছে রাজ্যের নীরবতা। নতুন এই অচেনা নিস্তব্ধতার সঙ্গেই আপাতত বন্ধুত্ব করে নিয়েছে মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম।

বোর্ডের সিনিয়র গ্রাউন্ডস ম্যানেজার সৈয়দ আব্দুল বাতেনের কাছে মাঠ কিংবা উইকেট চেয়ে এখন কোনো চাহিদাপত্র আসে না। কিউরেটর গামিনি ডি সিলভার কপালে নেই দুশ্চিন্তার ভাঁজ, গ্রাউন্ডসম্যানদের নেই তেমন তোড়জোর। করোনাভাইরাসের ধাক্কায় স্থবির হয়ে থাকা ক্রীড়াঙ্গনের বৃহৎ চিত্র এটিই। অথচ গত ১৩ মার্চ মিরপুর একাডেমি মাঠেই অনুশীলন করেছে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের নয় ক্লাবের ১৩৫ ক্রিকেটার। বর্তমান নীরবতা দেখলে মনে হবে এ যেনো অনন্তকালের এক জনমানবশূন্য ভূমি!

এমন অপ্রত্যাশিত ‘ছুটি’ কেউই চাননি। কিন্তু পূর্ণ মৌসুমে মিরপুর মাঠের এমন ‘বিশ্রাম’ যেন হাসি ফুটিয়েছে কিউরেটর গামিনি ডি সিলভার! বেশ কয়েক বছর ধরেই জাতীয় দলের প্রত্যাশামাফিক উইকেট উপহার দিয়ে আসছেন এ লঙ্কান কিউরেটর। কিন্তু মিরপুর মাঠের চাপ সামলাতে পারেন না তিনি! বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্ন সময় অভিযোগ করেছেন, এ মাঠে এতো খেলা কেন?

আন্তর্জাতিক বা ঘরোয়া ক্রিকেট, আয়োজকদের হিটলিস্টে থাকে মিরপুরের হোম অব ক্রিকেট। জাতীয় লিগ, বিসিএল, বিপিএল, ঢাকা লিগ, স্কুল ক্রিকেট, নারীদের ক্রিকেট; কী হয়না না এখানে! এরপর সিরিজ আসলেই জাতীয় দলের চাহিদাপত্রে থাকে সেন্টার উইকেটে অনুশীলন। বিভিন্ন জাতীয় দিবস, বড় কোনো আয়োজনের জন্য মিরপুরের ২২ গজ একমাত্র ভরসা। সব কিছু সামলে সারা বছর সেবা দিয়ে যাচ্ছে মিরপুর হোম অব ক্রিকেটের মোট ৫০ উইকেট।

মোহাম্মদ কবির হোসেন দীর্ঘ দুই দশক ধরে বিসিবির গ্রাউন্ডম্যান হিসেবে কাজ করছেন। গ্র্যাউন্ডসম্যানদের মধ্যে সিনিয়রদের একজন তিনি। পবিরার নিয়ে থাকেন মিরপুরে। করোনার সময়টাতেও রোজ মিরপুরের সবুজ গালিচায় গিয়ে কাজ করেন একবেলা, ‘মাঠে আমাদের কাজ বন্ধ নেই। মাঠে পানি দিতে হয়। ঘাস কাটতে হয়। উইকেট দেখ-ভাল করতে হয়,’ বলছিলেন কবির হোসেন।

গৃহবন্দি হয়ে থাকা গামিনি আগেই দিয়ে রেখেছেন উইকেট ঠিক রাখার ব্যবস্থাপত্র। সেভাবেই হচ্ছে পরিচর্যা। রোজ উইকেট ও ঘাসের ছবি তুলে করতে হয় হোয়াটসঅ্যাপ। বিসিবির প্রধান নির্বাহীর অনুমতি ছাড়া কথা বলবেন না গামিনি। তবে সামান্য কথোপকথন এবং গ্রাউন্সকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, শের-ই-বাংলার বিশ্রামে বেশ খুশি তিনি। ‘খুশি তো হবেই। এখন খেলা নেই। উইকেট প্রস্তুত করতে পারছে। সব সময় তো এমন সময় পাওয়া যায় না,’ মাঠকর্মী কবিরের এমন বক্তব্যই বলে দেয় তাঁর বস আছেন মহাখুশিতে!

বিসিবির স্থানীয় কিউরেটর জাহিদ রেজা বাবু মাঠের মানুষ। দীর্ঘ সময় ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িত। যশোরে নিজ বাড়িতে ১২ দিন ধরে গৃহবন্দি। এমন অস্থির সময়ে নিজের অধীনে থাকা চট্টগ্রাম ও খুলনার মাঠ রক্ষণাবেক্ষণ করছেন ভালোভাবেই। জানালেন স্টেডিয়ামের আশেপাশে থাকা গ্রাউন্ডসম্যানরা নিজেদের তাগিদেই মাঠের যত্ন নিচ্ছে।

জাহিদ রেজা বলেছেন, ‘এমন অভিজ্ঞতা কখনো হয়নি। মাঠে যেতে পারছি না। কোনো কাজ করতে পারছি না। খেলোয়াড়দের সঙ্গে ফোন দিয়ে কথা বলছি। মাশরাফি-মুস্তাফিজদের টেক্সট করছি। ফোনে প্রতিনিয়ত সবার সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। গ্রাউন্ডসম্যানরা যারা আশেপাশে থাকে তাঁরা গিয়ে পানি দেয়, ঘাস কাটে। ওদের মাঠে যেতে মানা করেছি। সরকারেরও নির্দেশ আছে। কিন্তু ওরা কাজ ছাড়া কি করবে সেটাই বলুন।’

টানা আয়োজনের উপর থাকা মিরপুর মাঠের ‘বিশ্রাম’কে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তিনি, ‘মিরপুর মাঠ আমার অধীনে নেই। তাই সেই মাঠ নিয়ে খুব বেশি চিন্তা আমার থাকে না। তবে নিশ্চিতভাবেই এ সময়টা পাওয়া মাঠের জন্য ভালো হল। আউটফিল্ড প্রস্তুত হবে, উইকেট ভালো হবে।’

সৈয়দ আব্দুল বাতেনের কন্ঠেও একই সুর, ‘এটা ইতিবাচক দিক। মাঠটা বিশ্রামে আছে। এরকম লম্বা সময় কখনোই পাওয়া যায় না। বিশেষ করে অনুশীলনের উইকেট। জাতীয় দল বাইরে থাকলেও কোনো না কোনো দল অনুশীলন করে। আবার ব্যক্তি পর্যায়েও অনুশীলন হয়। এখন সবকটি উইকেট বিশ্রামে আছে। মিরপুরে ৪২ জন মাঠকর্মী আছে। প্রায় সবার ছুটি দেওয়া। যাদের বাসা আশেপাশে, যারা স্টেডিয়ামের ভেতরে থাকে তাঁরা এখন রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছে।’ 

মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ দুদিন আগে ভিডিও বার্তায় বলেছিলেন, ‘ভালো দিন খুব বেশি দূরে নয়।’ তাঁর বিশ্বাস শঙ্কার মেঘ সরে দেখা দিবে নতুন সূর্য। তখন নিস্তব্ধতাকে বিদায় বলে শের-ই-বাংলা ফিরবে চেনা রূপে। আবারও মুখরিত হবে মুশফিক, মাহমুদউল্লাহ, তামিম, মুস্তাফিজরদের পদচারণায়। বলার অপেক্ষা রাখে না, ওই সময়ে পরীক্ষা হয়ে যাবে গামিনিরও। তাঁর পারফরম্যান্স মূল্যায়নের সুযোগও পাবেন নীতিনির্ধারকরা!


ঢাকা/ইয়াসিন/কামরুল