ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ০৩ এপ্রিল ২০২৫ ||  চৈত্র ২০ ১৪৩১

খেলোয়াড়ের জন্য সবার আগে দেশ : জাকারিয়া পিন্টু

|| রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১১:১০, ৯ জুন ২০১৩   আপডেট: ০৮:৪৫, ১১ আগস্ট ২০২০
খেলোয়াড়ের জন্য সবার আগে দেশ : জাকারিয়া পিন্টু

সাইফুল হক সদল
ঢাকা, ৯ জুন : জাকারিয়া পিন্টু, বাংলাদেশ ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তী। ১৯৫৭ সালে প্রথম ইস্ট এন্ড ক্লাবে যোগদানের মাধ্যমে ফুটবলের বড় পরিসরে প্রবেশ। ১৯৫৯ সালে ওয়ান্ডারাস ক্লাবে। ১৯৬১ সালে চলে আসেন মোহামেডানে। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় খেলেন এই ক্লাবে।

১৯৬৮ থেকে ১৯৭৫ সাল টানা ৮ বছর মোহামেডানের অধিনায়কত্ব করেন জাকারিয়া পিন্টু। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলেরও নেতৃত্ব দিয়েছেন সাহসিকতার সাথে।

রাইজিংবিডির অফিসে এসেছিলেন কিংবদন্তী ফুটবলার । খোলামেলা আলাপে দেশের ফুটবলের  ভবিষ্যত ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি উঠে আসে। পাঠকদের জন্য তা তুলে ধরা হলো-

রাইজিংবিডি : ফুটবলার হয়ে ওঠার কথা বলুন। শুরুটা কিভাবে হয়েছিল ?

জাকারিয়া পিন্টু : ছোটবেলা থেকেই ফুটবল ছিল আমার নেশার মত। বাবা ডাক্তার ছিলেন। তাই তিনি চাইতেন আমিও যেন ডাক্তার হই। সেজন্য তিনি একদিন আমাকে ছোট একটি অপারেশন করার সময় সাথে রাখলেন যাতে আমার এই বিষয়ে আগ্রহ বাড়ে। কিন্তু আমি অজ্ঞান হয়ে পরে যাই ইচ্ছে করেই।

বাবা ভাবলেন, এ ছেলেকে দিয়ে আর যাই হোক ডাক্তারি হবে না। সেই দিন থেকে বাবা আর কখনো আমার ফুটবল খেলায় বিরক্ত হননি।

এরপর জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হই। সেখানে ফুটবল দলে নিয়মিত খেলি। এরপর ১৯৫৭ সালে প্রথম ইস্ট এন্ড ক্লাবে যোগ দেই। তবে আমার ইচ্ছে ছিল একদিন আমি মোহামেডানে খেলবো। সে ইচ্ছেও পূরন হয়েছিল ১৯৭৩ সালে।

সবচেয়ে বড় কথা আমি স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক ছিলাম। এটাই আমার গর্ব। আমরাই প্রথম বিদেশের মাটিতে স্বাধীন বাংলার পতাকা উঠিয়েছিলাম। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ার কৃষ্ণনগর মাঠে ২৪ জুলাই আমরা একটা প্রীতি ম্যাচ খেলেছিলাম। সেই দিনটির কথা আমি ভুলবো না। ঐ দলে খেলেছিল সালাউদ্দিন, নান্নু, এনায়েত, টিপুর মত খেলোয়াড়রা।

আমরা আবেদন জানিয়েছিলাম এই ঐতিহাসিক দিনটিকে জাতীয় ক্রীড়া দিবস হিসেবে ঘোষণা দেবার জন্য। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের খেলোয়াড়দের জন্য হত সেটা অনেক বড় এক প্রাপ্তি। তা এখনও হয়নি। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় রাষ্ট্রীয়ভাবে এখনও তেমন কোন স্বীকৃতি পাইনি।

রাইজিংবিডি : ফুটবলে আপনাদের সময়ের সাথে এখনকার পার্থক্যটা কোথায়?

জাকারিয়া পিন্টু : আগে ফুটবল বেশ জনপ্রিয় খেলা ছিল তার একটাই কারণ। সেটা হলো এখন আমাদের খেলোয়াড়রা তাদের পারফরমেন্স দিয়ে দর্শকদের আকৃষ্ট করতে পারছে না। এই যে আপনার আমার সাক্ষাতকার নিচ্ছেন। কারণ আমার খেলার কারণেই আমাকে এখনও আপনারা মনে রেখেছেন।

আমাদের সেই খেলোয়াড়  সালাউদ্দিন, নান্নু, হাফিজ,এনায়েত, প্রতাপ, টিপু তাদের খেলা কিন্তু এখন মানুষের চোখের সামনে ভাসে। সেজন্য মাঠে খেলতে হবে। ভাল না খেললে তো দর্শক হবে না। ভাল খেলোয়ার তৈরি করতে হবে। তবেই না ফিরে আসবে ফুটবলের সু-দিন।

সময় খেলোয়াড়দের ডেডিকেশন ছিল বেশী। আর এখন খেলোয়াড়দের ইনকামের দিকে নজর বেশি। এক একজন খেলোয়াড় হিউজ টাকা নিচ্ছে ক্লাব থেকে কিন্তু খেলার মাঠে তার ছিটেফোঁটাও পারফরমেন্স দেখাতে পারছে না।

দর্শক কিন্তু ক্লাবের খেলা দেখতে আসে না। তারচেয়ে বেশী আসে ভাল কোন খেলোয়াড়ের খেলা দেখতে। সেই বর্তমানে আমাদের ফুটবলে অনুপস্থিত। গত দশ বছরে দেখেন উল্লেখ করার মত তেমন কোন খেলোয়াড়ই তেরি হয়নি।

রাইজিংবিডি : ফুটবলের উন্নয়নে আমরা কি এখন সঠিক পথে আগাচ্ছি ?

জাকারিয়া পিন্টু : বাফুফের বর্তমান সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন আমরা একসাথেই খেলেছি। আমি জানি ফুটবল নিয়ে ওর চেষ্টার কোন কমতি নেই।

আমি আগেই বলেছি আমাদের খেলোয়াড় তৈরি করতে হবে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিদেশী প্লেয়ার বা কোন দল এনে আমাদের দেশে খেলালে কোন লাভ হবে না। বরং সেই টাকা নতুন প্লেয়ার তৈরিতে খরচ করা উচিত। বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট করে নতুন সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় বের করতে হবে। কাতার বিশ্বকাপকে টার্গেট করে তাদেরকে প্রশিক্ষন দিতে হবে।

রাইজিংবিডি : ফুটবলে বাংলাদেশের মেয়েদের ভবিষৎ কেমন ?

জাকারিয়া পিন্টু : আমাদের মেয়েরা তো ভালই করছে। মাত্র পাঁচ বছর হলো তারা শুরু করেছে। সেই তুলনায় মেয়েরা ভালই করছে। দলে পাহাড়ী মেয়েরা খুব ভাল করছে। ওরা অন্যান্য মেয়েদের চেয়ে পরিশ্রমী বেশী। এটা একটা ভাল দিক। আমার তো মনে হয় আমাদের দেশের ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এগিয়ে যাবে।

রাইজিংবিডি: এখন আপনার ব্যস্ততা কি নিয়ে ?

জাকারিয়া পিন্টু : আমি কিছু অরগানাইজেশনের সাথে জড়িত। এখন প্রতিবন্ধিদের শিশুদের একটি কোর্স করাচ্ছি।এটি হচ্ছে ‘শিশু কল্যাণ পরিষদ’ নামের একটি অর্গানাইজেশন। আমি এই প্রতিষ্ঠানের স্পোর্টসের চেয়ারম্যান।

এছাড়াও লেখালেখি করছি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। তবে ফুটবল নিয়ে বই লিখছি। কিছু অনুবাদও করছি।

রাইজিংবিডি : যারা আগামী দিনের ফুটবলারদের জন্য আপনার পরামর্শ কি?

জাকারিয়া পিন্টু : যারা ফুটবলার হতে চায় কিংবা যারা জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করবে ভবিষ্যতে তাদেরকে আমি একটাই কথা বলবো যে ফুটবলের প্রতি ডেডিকেশন থাকতে হবে। সবার আগে দেশ। যে যে ক্লাবেই খেলুক না কেন তার ক্লাবের প্রতি, খেলার প্রতি ডেডিকেশন থাকতে হবে। ক্লাবে খেলেই না তাকে আসতে হবে জাতীয় দলে।

খেলায় নির্দিষ্ট একটি দিকে পারদর্শী হতে হবে। যেমন সালাউদ্দিন উইথ দ্যা বল খুব ফাস্ট ছিল। মেসি যেমন উইথ দ্যা বল খুবই ফাস্ট, তাকে আটকানো যায় না। আর নিয়মিত অনুশীলনের তো কোন বিকল্প নেই।

 

রাইজিংবিডি/সাহস/শামটি

রাইজিংবিডি.কম


সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়