ঢাকা, বুধবার, ২৮ কার্তিক ১৪২৬, ১৩ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

শীতে দেখি বাংলার রূপ

গাজী মুনছুর আজিজ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৮-১২-২২ ৬:৪৩:২৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০২-১৮ ১:৩১:১৭ পিএম

গাজী মুনছুর আজিজ : দেখা হয়নি চক্ষু মেলিয়া, ঘর হইতে দুই পা ফেলিয়া- সত্যি তাই। ছোট্ট হলেও ছয় ঋতুর এ দেশে চারপাশেই আছে নানা দর্শনীয় স্থান। আছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার ও সর্ববৃহৎ একক ম্যানগ্রোভ বন- সুন্দরবন। আরও আছে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সৈকতপাড় কুয়াকাটা, বিশ্ব ঐতিহ্য ষাটগম্বুজ মসজিদসহ নানা প্রাকৃতিক ও ঐতিহ্যের দর্শনীয় স্থান। এছাড়া এ দেশের আদিবাসীদের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি আমাদের ঐতিহ্যের ভাণ্ডারে যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা।

সামনেই আসছে শীতের মৌসুম। আর শীত মানেই বাংলাদেশের পর্যটন বা বেড়ানোর মৌসুম। তাই চাইলে এ মৌসুমে ভ্রমণ করে দেখে নিতে পারেন বাংলার রূপ-বৈচিত্র। তবে ভ্রমণে বের হলে সবার আগে ভাবতে হবে, হাতে সময় আর বাজেট কত? কারণ, সময় কম থাকলে আশপাশে বা দিনে গিয়ে ঘুরে আসা যায় এমন স্থানে ভ্রমণ করা ভালো। হাতে সময় থাকলে যেতে পারেন দূরে কোথাও। তবে ভ্রমণে বের হলে দলবেঁধে যাওয়া ভালো। এতে খরচ কম হয়। অন্যদিকে একা একা ভ্রমণের মজাও আলাদা। আর পারিবারিক ভ্রমণ তো অন্যরকম মজার।

ভ্রমণে বের হলে আরেকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে- যেখানে আগে যাওয়া হয়নি সেই জায়গাটিকে প্রাধান্য দেওয়া। তবে যেখানেই যান, আগে সেখানকার থাকা-খাওয়া ও যাতায়াত ব্যবস্থার সব ধরনের তথ্য জেনেই বের হওয়া উচিত। খুব ভালো হয়, যেখানে যাচ্ছেন সেখানে পরিচিত জনদের আগে কেউ গিয়েছেন এমন কাউকে সঙ্গে নেওয়া। অথবা সেখানকার স্থানীয় লোকদের কাছ থেকে সেখানকার তথ্য জেনে নেওয়া। এছাড়া ভ্রমণ তথ্য নিয়ে বাজারে অনেক বই আছে। চাইলে সেসব বই দেখেও জানতে পারেন। আর এখন তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। ইন্টারনেটে ভ্রমণের নানা তথ্য ও ছবি আছে। সেখান থেকেও তথ্য জেনে নিতে পারেন।

সমুদ্র ভ্রমণ: যারা সমুদ্র দেখতে পছন্দ করেন, তাদের সবার আগে যাওয়া উচিত কক্সবাজার। এটি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সমুদ্রসৈকত। বিশাল এই সৈকতের পাশে দাঁড়ালে আপনার মনটাও বিশাল হয়ে যাবে; এমনটা বললে ভুল হবে না। আর সৈকতের পাশের মেরিন ড্রাইভটিও পৃথিবীর দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ। এ ড্রাইভ দিয়ে সমুদ্রের পাড় ধরে যাওয়া যাবে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত। কক্সবাজারে আরও আছে হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান ও সৈকত, ইনানী সৈকত, রামু বৌদ্ধবিহার, সাফারিপার্কসহ নানা দর্শনীয় স্থান।



কক্সবাজারের বিশেষ আকর্ষণ সেন্টমার্টিন দ্বীপ। টেকনাফ থেকে জাহাজে যাওয়া যাবে প্রবাল এ দ্বীপে। দ্বীপে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও আছে। দ্বীপের আরেক দর্শনীয় স্থান ছেড়াদ্বীপ। কক্সবাজার ছাড়া সমুদ্র দেখতে যেতে পারেন সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দেশ কুয়াকাটা। এটিও দারুণ।

ঢাকা থেকে রাতের বাসে কক্সবাজার গিয়ে সারা দিন থেকে আবার রাতে ফেরা যাবে ঢাকার উদ্দেশে। তবে সেন্টমার্টিন গেলে আরও একদিন সময় লাগবে। কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিনে দিনে গিয়ে দিনেই ফেরা যাবে। থাকতেও পারেন। আর কুয়াকাটা গিয়ে এত কম সময়ে ফেরা যাবে না। কারণ, কুয়াকাটা যেতে হলে প্রথমে লঞ্চে বা বাসে পটুয়াখালী। তারপর সেখান থেকে লোকাল বাসে কুয়াকাটা।

যদি যান পাহাড়ে: সমুদ্র দেখা হলে যেতে পারেন পাহাড়ে। পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি সত্যিই সৌন্দর্যের আধার। পাহাড়, অরণ্য আর আদিবাসীদের বর্ণিল সাজে সজ্জিত এ জনপদ। চোখ জুড়ানোর পাশাপাশি মনও জুড়াবে। পাহাড়ি এ অঞ্চলে ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে সকালে পৌঁছে সারাদিন ঘুরে আবার রাতে ফেরা যাবে ঢাকার উদ্দেশে। থাকলে চাইলে হোটেল-রিসোর্ট সবই আছে।

বন-বাদাড়: সমুদ্র কিংবা পাহাড় দেখা হলে যেতে পারেন বনে-বাদাড়ে। আর বন দেখতে হলে প্রথমে আসতে পারেন সুন্দরবনে। এটি বিশ্বের একক বৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন। ঢাকা থেকে প্রথমে খুলনা, তারপর সেখান থেকে বিভিন্ন ভ্রমণ পরিচালনাকারী সংস্থার মাধ্যমে প্রবেশ করতে পারেন সুন্দরবনে। এছাড়া একা একা দিনে দিনে সুন্দরবনের স্বাদ পেতে যেতে পারেন করমজল। মংলাঘাট থেকে ট্রলারে করমজল যেতে সময় লাগবে প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা। এছাড়া বিভিন্ন ভ্রমণ পরিচালনাকারী সংস্থার মাধ্যমে ঢাকা থেকেও সরাসরিও আপনি সুন্দরবনের উদ্দেশে আসতে পারেন। অনেকেই ভাবেন, দেশের যে কোনো স্থানেই একা একা যাওয়া গেলে সুন্দরবন কেন যাওয়া যাবে না? আসলে তাদের ধারণা ভুল। কারণ, সুন্দরবনের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানগুলো দেখতে হলে আপনাকে কমপক্ষে তিন-চার দিন সময় নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করতে হবে। আর সুন্দরবনে কখনও একা প্রবেশ করা যায় না। তাই সুন্দরবনের মূল অংশে আপনাকে যেতে হলে ভ্রমণ পরিচালনাকারীদের সাহায্য নিতে হবে। অথবা নিজেদের ভাড়া করা লঞ্চ বা বড় ট্রলারেই যেতে হবে। এছাড়া লঞ্চ ছাড়া বন বিভাগ আপনাকে সুন্দরবনে একা প্রবেশের অনুমতিও দেবে না।



চা-বাগান: বন, সমুদ্র বা পাহাড় দেখা হয়ে গেলে আসতে পারেন সবুজ চা-বাগান দেখতে। সিলেট বিভাগজুড়ে রয়েছে অসংখ্য চা-বাগন। তবে সবচেয়ে বড় ও বেশি চা-বাগান রয়েছে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায়। রাতের ট্রেনে বা বাসে রওনা হয়ে সকালে নেমে সারাদিন চা-বাগান দেখে আবার রাতে ফেরা যাবে ঢাকায়। চাইলে শ্রীমঙ্গলে দিনে গিয়েও দেখে আসা যাবে।

হাওর: বাংলাদেশের বৃহৎ হাওরগুলো রয়েছে সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজারসহ সিলেট অঞ্চলজুড়ে। হাকালুকি, টাঙ্গুয়া, পাশুয়া, বাইক্কাসহ বিভিন্ন হাওর দেখতে আসতে পারেন এ অঞ্চলে। শীত মৌসুমে অসংখ্য পারিযায়ীর পাখির কলতানে হাওর হয়ে ওঠে অন্যরকম সৌন্দর্যের ভূমি। বর্ষায় হাওরের আরেক সৌন্দর্য। ঢাকা থেকে রাতে বাসে বা ট্রেনে রওনা হয়ে সারাদিন হাওর ঘুরে আবার রাতের গাড়িতে সকালে ঢাকা ফিরে আসা যাবে। সিলেট অঞ্চল কেবল চা-বাগান আর হাওর নয়, এ অঞ্চলজুড়েও রয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য অরণ্য ও ঝরনা। এর মধ্যে মাধবপুর ঝরনা অন্যতম। আরও আছে গহীন বনের হামহাম ঝরনা। দুটো ঝরনাই মৌলভীবাজের।



পুরাকীর্তি: ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা বা পুরাকীর্তি দেখার মজাও আলাদা। এটা দেখার মাধ্যমে ফিরে যাওয়া যায় অতীতের ইতিহাস-ঐতিহ্য বা সংস্কৃতির অজানা সব অধ্যায়ে। আর পুরাকীর্তি দেখার জন্য আসতে পারেন খুলনার ষাটগম্বুজ মসজিদসহ বিভিন্ন মসজিদ, দিনাজপুরের কান্তজিউর মন্দির, কুমিল্লার ময়নামতি, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, বগুড়ার মহাস্থানগড়, ফরিদপুরের মথুরা দেউর, রাজশাহীর সোনামসজিদ, তোহাখানা, পুঠিয়া রাজবাড়ি, নাটোরের রাজবাড়ি, জমিদারবাড়ি, গণভবনসহ নানা স্থানে। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ছোট-বড় নানা পুরাকীর্তির নিদর্শন।

এছাড়াও হরিণের রাজ্য দেখতে হাতিয়ার নিঝুমদ্বীপ, পাখির রাজ্য দেখতে সিলেটের হাওর ও ভোলা-নোয়াখালীর উপকূলের বিভিন্ন চরে যেতে পারেন। এছাড়া চাইলে আপনি আপনার জেলাটাই ঘুরে দেখতে পারেন শীতের এ মৌসুমে। কারণ, আমাদের প্রতিটি জেলারই রয়েছে নানারকম ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থান। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের চারপাশে যেদিকেই চোখ বুলাবেন সেদিকেই দেখা মিলবে রূপসী বাংলার মায়াবী রূপ।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২২ ডিসেম্বর ২০১৮/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন