ঢাকা, সোমবার, ৫ কার্তিক ১৪২৬, ২১ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

ভূমিকম্পে মৃত্যু হলো সুন্দরী ঝরনার

ইকরামুল হাসান শাকিল : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০১-১৩ ৭:০৩:৩১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০১-১৬ ২:১০:৩৫ পিএম

আমরা আরুঘাট এসে বাস থেকে নেমে গেলাম। আজকের পথ এপর্যন্তই। এখান থেকেই শুরু হবে আমাদের ট্রেকিং। যারা মানাসলু অঞ্চলের পর্বতগুলোতে অভিযানে আসেন তাদের এখান থেকে ট্রেকিং শুরু করতে হয়।  আরুঘাট নেপালের দার্দিং ও গোর্খা দুই জেলার মাঝে পড়েছে। বুড়িগন্ধাকী নদী দ্বারা বিভক্ত। নদীর ওপর সাস্পেনশন ব্রিজ। এই সেতু দুই জেলার মধ্যে মেলবন্ধন গড়ে তুলেছে।

আমরা আরুঘাট বাজারে সাতকার লজে উঠলাম। প্রথমেই গোসল করে ধুলোয় একাকার শরীর ধুয়ে হালকা হয়ে নিলাম।  আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখান থেকে গণেশ হিমালয় রেঞ্জ দেখা যায়। মুহিত ভাই এর আগে আরো দু’বার এই এলাকায় এসেছেন। প্রথমবার এসেছিলেন ২০০৮ সালে। ২০১১ সালে তিনি এই মানাসলুর শীর্ষে লাল সবুজ পতাকা উড়িয়েছেন। আমরা এসেছি এজেন্সির ভাড়া বাসে। পাবলিক বাসেও আসা যায়। কাঠমাণ্ডু শহরের মাছাপোখারি বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন চারটি বাস ছেড়ে আসে আরুঘাটের উদ্দেশ্যে।



বিকেলে বাজার ঘুরতে বের হলাম। এই অঞ্চলে মূলত গুরঙ জনগোষ্ঠীর বাস। ২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিল নেপালে ঘটে যাওয়া ৭.৮ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল এলাকা। তার ছাপ বাড়িঘরের ফাটল চিহ্নে এখনো স্পষ্ট। এই এলাকা হিন্দু অধ্যুষিত।সামনে দীপাবলী তাই রং বিক্রি চলছে রাস্তার মোড়ে মোড়ে। ১৩ অক্টোবর সকালে শুরু হলো আমাদের এই অভিযানের মূল যাত্রা। সোয়া ৭টার মধ্যেই সবাই নাস্তা সেরে ব্যাকপ্যাক কাঁধে নিয়ে চলতে শুরু করলাম। রাতে ছিলাম দার্দিং জেলায়। বুড়িগন্ধাকীর উপর ব্রিজ পার হয়ে চলে এলাম গোর্খায়। এই বাজারের অলিগলি এত পরিষ্কার যে দেখে মনে হলো এখনই বুঝি ঝাড়ু দেয়া হয়েছে। এই সাতসকালে বাজারের কেনাবেচা শুরু হয়ে গেছে। বেরিয়ে পড়েছে মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে। আরুঘাটের উচ্চতা মাত্র ৬২৫ মিটার। মানাসলু আর অন্নপূর্ণা অঞ্চলটা অন্যসব অঞ্চলের চেয়ে বেশ আলাদা। যেমন এভারেস্ট অঞ্চলে ট্রেকিং শুরু হয় ৯ হাজার ফুট উপর থেকে। আর এখানে আমরা শুরু করেছি অনেকটা প্রায় বাংলাদেশের সমমানের উচ্চতা থেকে। ফলে উচ্চতার সঙ্গে শরীর মানিয়ে নেয়ার পর্যাপ্ত সময় পাবো আমরা। বাংলাদেশের মতোই আবহাওয়া। বেশ গরম। গরমে দরদর করে শরীর থেকে ঘাম ঝরছে।

আকাশ ছুঁয়ে সামনে গণেশ হিমালয় রেঞ্জ এখন অনেক স্পষ্ট। আমরা আরুঘাট থেকে বেরিয়ে এসেছি অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। সবুজের চাদর মোড়ানো পাহাড়ের উপত্যকার মধ্যে দিয়ে হাঁটছি। এই উপত্যকার সমতল ভূমিতে পাকা ধানের ঘ্রাণ আমাদের ক্লান্তিহীন করে তুলছে। ফসলের ক্ষেতের পাশ দিয়ে মেঠো পথে হেঁটে চলেছি। সঙ্গ দিচ্ছে বুড়িগন্ধাকি। পাশ দিয়ে কুলকুল ধ্বনি তুলে বয়ে চলেছে। আমরা আরক্ষেত বাজারে এসে কিছু সময় বিশ্রাম নিলাম। এরপর চলে এলাম সতীখোলায়। এ পর্যন্ত গাড়ি আসতে পারে। এরপর আর গাড়ি চলাচলের পথ নেই। এই সতীখোলাতেই দুপুরের খাবার বিরতি দেয়া হলো। খাবারের তালিকায় রাখা হলো চিকেন, সবজি, ডাল-ভাত।

খাবার শেষে আবার ট্রেকিং। আজকের গন্তব্য লাপুবেসি। কখনো পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠে আবার নেমে এগিয়ে যাচ্ছি। আগেই এই রাস্তা সম্পর্কে শুনেছি মুহিত ভাই ও নুর ভাইয়ের কাছে। তাদের গল্পের সাথে মিলিয়ে একের পর এক ট্রেইলের সৌন্দর্য দেখে চলেছি। বিভিন্ন স্থানে রাস্তার পাশেই বিভিন্ন আকৃতির অসাধারণ ঝরনা। একটি জায়গা আছে, নাম খোরসানী বাড়ি।একটি ঝরনা এতোই পছন্দ হয়ে গেলো যে, রাস্তার পাশে এক লজের খোলা চত্বরের ঘাসে শুয়ে বসে ঝরনাকে পেছনে রেখে ছবি তোলার লোভ সামলাতে পারলাম না। আমরা আছি এখন লোয়ার মানাসলু অঞ্চলে। একটা সময় আমরা বুড়িগন্ধাকী থেকে অনেকটা উপর উঠে এসেছি। তবে এখান থেকে কোনোভাবে পড়ে গেলেই হলো- একদম ঠিক বুড়িগন্ধাকীর বুকে! তিব্বতের গ্লেসিয়ার থেকে বরফ গলে আসা ফেনিল বেগবান স্রোতের শীতল জলে। সাথে সাথেই ভাসিয়ে নিয়ে যাবে ভাটির টানে বিরামহীন গর্জনে।

সামনে আকাশ ছোঁয়া চড়াই। এই চড়াই অতিক্রম করতে পারলেই লাপুবেসির দেখা মিলবে। আর আজকের মতো দম বের করা চড়াই উতরাইয়ের পালা শেষ হবে। অবশেষে দূর থেকেই দেখতে পেলাম গুরঙ জনগোষ্ঠীর গ্রাম লাপুবেসি। এখানে একটি লজের দোতলায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো। লাপুবেসির উচ্চতা ৮৮০ মিটার। এখনো শীতের তেমন লক্ষণ নেই। গ্রামের পাশে একটি উঁচু পাহাড়া থেকে ঝরনার পানি আপন ছন্দে পড়ছে। পানি পতনের শব্দ আমাদের মনে শিহরণ তুলছে। ভুলেই গিয়েছি কালকের গন্তব্য ৯৭০ মিটার উচ্চতার খোরলাবেসি।



ভোরেই ঘুম ভেঙে গেলো। সকালের নাস্তা সেরে আমরা সাড়ে সাতটার মধ্যেই বেরিয়ে পড়লাম। লাপুবেসি থেকে কিছুটা পথ আসার পরে বিশাল এক ঝরনা দেখার কথা ছিলো। সেই ঝরনার কথা মুহিত ভাইয়ের কাছে শুনেছিলাম। শুনে মনে মনে উত্তেজনা বোধ করছিলাম। কিন্তু সেই ঝরনার যে অবস্থা দেখলাম, তাতে একে আর ঝরনা বলা যায় না। বিশাল বিশাল পাথর এর গতিপথ ঢেকে দিয়েছে। বছর তিনেক আগের ভূমিকম্পের ফলে ঝরনার এই অবস্থা হয়েছে। ঘন সবুজের ভিতর দিয়ে হেঁটে চলেছি। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে ছড়িয়ে থাকা অপরূপ সৌন্দর্য দেখছি আর অভিভূত হচ্ছি। তবে কিছুদূর আসার পর রাস্তায় উঠে গেলাম। বুলডোজার দিয়ে রাস্তা তৈরির কাজ চলছিলো। পাহাড়ের গাঁ কেটে কেটে রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে। বেশ কিছুটা পথ হাঁটার পর সে পথটুকুও শেষ হয়ে গেলো। পাহাড়ের গাঁ বেয়ে সবুজের মধ্যে সরু ফিতার মতো কখনো পাথুরে অমসৃণ এবড়ো-থেবড়ো পথে এগিয়ে চলছি। উপর থেকে একের পর এক খচ্চর বাহিনী আসছিলো মালামাল বহন করে। তাদের জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে হচ্ছিলো একটু পরপর। এ সময় সরে দাঁড়ানো বুদ্ধিমানের কাজ। রাস্তায় খচ্চর, গাধা বা ইয়াক এলে পাহাড়ের খাদের  দিকে দাঁড়ানো বিপজ্জনক। কারণ তাদের ধাক্কায় খাদে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এমন বহু দুর্ঘটনার নজির রয়েছে এই পাহাড়ি পথে।

হঠাৎ আমাদের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো। অবাক সৌন্দর্যের সব ঝরনারা রাস্তার পাশে একের পর এক অভ্যর্থনা জানাতে শুরু করলো। কখনো ঝরনার সামনে দাঁড়িয়ে, কখনো পাশ দিয়ে, আবার কখনো পাশের পাহাড়ের গাঁয়ে ঝরনা দেখছি। মেঘে পাহাড়ের চূড়া ঢেকে আছে। আর সেই মেঘের ভিতর থেকে ঝরনার পানি পড়ছে- এ যেন সাক্ষাৎ একেবারে আকাশ থেকে নেমে আসছে পানি। আমরা অবাক বিস্ময়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। কোথাও বেশি সময় দাঁড়িয়ে ঝরনার রূপ দেখতে পারলাম না। কারণ খোরলাবেসি পৌঁছাতে হবে। দুপুরের আগেই আমরা চলে এলাম মাচাখোলায়। এখানেই আমাদের লাঞ্চ বিরতি। খাবার মেন্যু সেই আগের ডাল-ভাত-চিকেন সবজি। আমরা প্রায় দুই ঘণ্টা এখানে শুয়ে-বসে খেয়ে কাটালাম। কারণ আজকের পথ খুব একটা বেশি না।



খাবার শেষে আবার হাঁটা। কিছুদূর হাঁটার পর আবার বুড়িগন্ধাকী চলার সঙ্গী হলো। এর পাড় ধরে খড়স্রোতা কলকল শব্দের তালে তালে আঁকাবাঁকা আর  চড়াই উৎরাই পথ চলেছি। আজ রোদের তেজও বেশ তাই দেহে ক্লান্তি এসে উঁকি দিচ্ছে। দুপুরের পরেই আমরা চলে এলাম খোরলাবেসি। চারপাশ গাঢ় সবুজে ঘেরা একটি কটেজে আজ আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। কটেজের সামনে সবুজ ঘাসের চাদর বিছানো একটি সমতল উঠান আছে। অনেকটা টেনিস মাঠের মতো। একটু বিশ্রাম নিয়েই আমরা গ্রাম থেকে কিছুটা নিচে ঝিরিতে গোসল করতে নেমে এলাম। পানিতে পা ছোঁয়াতেই যেন ঝিঁঝিঁ ধরে গেলো। বেশি দূরে না হয়তো খুব কাছের কোনো এক গ্লেসিয়ার গলা জল নেমে আসছে বুড়িগন্ধাকী নদীতে। সেই হিমশীতল জলে আমরা নেমে পড়লাম। পানিতে ডুব দিয়েই টের পেলাম শরীরের বোধশক্তি কমে গেছে। তারপরেও সেই শীতল স্বচ্ছ পানিতে কিছু সময় গা ডুবিয়ে গোসল সেরে নিলাম। পানি থেকে ওঠার পর আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। দাঁতে দাঁত, হাঁটুতে হাঁটু বাড়ি খাচ্ছে ঠান্ডার কাঁপুনিতে।

লজে ফিরে তৈরি হয়ে সোজা চলে এলাম ডাইনিং টেবিলে। বিভিন্ন দেশের ট্রেকাররাও বিভিন্ন টেবিলে বসে আছে। কেউ বই পড়ছে, কেউ চা-কফি খাচ্ছে, কেউ কেউ তাস খেলছে। আমরাও একটি টেবিলে এসে বসলাম। সামনে উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তরল পানের পরিমাণও বাড়াতে হবে। এই খোরলাবেসি জায়গাটা অন্যসব জায়গার চেয়ে বেশ জমজমাট। এখানে বেশ কয়েকটা লজ আছে। আজ সব লজই ট্রেকারে পরিপূর্ণ। রাত বাড়ছে। আমরা সাড়ে সাতটার মধ্যে ডিনার শেষ করে রুমে চলে এলাম। এখান থেকে কিছুটা ঠান্ডা শুরু হয়েছে। কম্বলের উষ্ণ অভ্যার্থনায় রাতে ঘুমের সমুদ্রে ভেসে চললাম। (চলবে)



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ জানুয়ারি ২০১৯/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন