ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৬ চৈত্র ১৪২৬, ৩১ মার্চ ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

টাইগার হিলের ভোর এবং এক কাপ চা

সিয়াম সারোয়ার জামিল : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৩-১২ ৪:৩৭:০১ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-১২ ৪:৩৭:০১ পিএম

দার্জেলিং যখন পৌঁছলাম তখন রাত বারোটা। আগে থেকে হোটেল বুকড ছিল না। সময় বাঁচাতে গ্যাংটক থেকে সন্ধ্যায় রওনা দিয়েছিলাম। কিন্তু দার্জেলিঙে পৌঁছে দেখলাম সব বন্ধ হয়ে গেছে। থাকবো কোথায়? ড্রাইভারকে বিপদের কথা জানাতেই তিনি বললেন, তার কয়েকটি জায়গা পরিচিত আছে। কিন্তু ফাঁকা আছে কিনা নিশ্চিত না। হোটেল না পেলেও হোম স্টে পাওয়া যেতে পারে।

এরপর নিজের নম্বর থেকেই কল দিলেন পরিচিত হোটেলগুলোতে। ভরা সিজন। কোথায় ফাঁকা নেই। নিরাশ হলেন যেন। শেষে এক জায়গায় পেলেন বটে, তবে হোম স্টে। অন্ধকার দার্জেলিং শহর ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছলাম সেখানে। মালিক স্থানীয় গোর্খা। গভীর রাতে দরজা খুলে দিলেন বটে, তবে পুরাতন আমলের এক রুম এক রাতের জন্য নেবেন তিন হাজার রুপি। ক্লান্ত শরীরে উপায় না দেখে রাজি হয়ে গেলাম।

লম্বা জার্নি করেছি। তাই রুমে ঢুকেই দ্রুত বরফ পানিতে গোসল দিয়ে শুয়ে পড়লাম বিছানায়। দলনেতা রনি শীল সতর্ক করে দিলেন। ঘুম হবে মাত্র দুই ঘণ্টা। সময় নেই। টাইগার হিলের সৌন্দর্য দেখতে উঠতে হবে রাত তিনটায়। জিপগাড়ি এসে নিয়ে যাবে। হোম স্টের মালিককে গাড়ি ডাকতে বলে দিয়েছি। ঘুম হবে না শুনে একটু মন খারাপ হলেও দেরি করলাম না। ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিলাম- যা হবার হবে, ভেবে লাভ নেই! 

কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না। হঠাৎ রনি শীলের ডাকাডাকিতে উঠতেই হলো- কী হয়েছে? ধমক দিয়ে বললেন, ‘ওই মিয়া, উঠেন!’ কাঁচা ঘুম ভাঙায় মেজাজ আমার হলো গরম। কিন্তু কী আর করা। ঘুরতে এসেছি। ঘুমাতে না। পরে ঘুমাব- মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে বিছানা ছাড়লাম। 

এদিকে প্রমথেশদাকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ঘরের কোথাও না। ৫ মিনিট যায়, দশ মিনিট যায়...। টুটুল ভাই বলে, দাদা কই? দেখা যাচ্ছে না। আমি বলি, হায় হায় সর্বনাশ! এই লোক নিশ্চয় ছাদে গেছে। এই লোক রাইতে ঘুমায় না। বলতে বলতেই দাদা রুমে ঢুকলেন। হাতে টুথ ব্রাশ।

মালিক ঠিক রাত তিনটাতেই এলেন। বললেন, জিপ এসে গেছে। একটুও দেরি করা যাবে না। দেরি হলেই সান রাইজ মিস! কোনোমতে প্যান্ট সোয়েটারের মধ্যে হাত পা গলিয়ে উঠে পড়লাম গাড়িতে। দলনেতা রনি শীলের ওপর রেগে মেগে ছুটলাম টাইগার হিলে। টাইগার হিল জায়গাটি দার্জিলিং শহর থেকে ১১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। আমরা জিপে করেই গেলাম। চৌরাস্তা, আলুবাড়ি বা জোড়বাংলা হয়ে পায়ে হেঁটে, তারপর পাহাড়ি পথ বেয়ে উঠেও পৌঁছানো যায় শুনেছি। আপাতত এডভেঞ্চারে যাবার শক্তি নেই শরীরে। টাইগার হিল জায়গাটা ২,৫৯০ মিটার উঁচু। মাউন্ট এভারেস্ট ও কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্বত দেখা যায় সেখান থেকেই।

কিছুক্ষণ পাহাড়ি পথ বেয়ে জিপ চলার পর পৌঁছে গেলাম টাইগার হিলে। দেখলাম, আরো অনেক ট্যুরিস্ট। অপেক্ষা করতে দাঁড়ালাম। নিচু উচ্চতায় সূর্যকে দেখতে পাওয়ার আগেই কাঞ্চনজঙ্ঘার শিখরগুলি আলোকিত হয়ে উঠলো ধীরে ধীরে। দূরের কাঞ্চনজঙ্ঘার অভূতপূর্ব দৃশ্য না দেখলে বিশ্বাসই হবে না! পৃথিবীপৃষ্ঠের বক্রতার জন্য টাইগার হিল থেকে মাকালু পর্বতকে মাউন্ট এভারেস্টের থেকে উঁচু মনে হলো। আকাশ বেশ পরিষ্কার হতে থাকলো ধীরে ধীরে। দক্ষিণে কার্শিয়াং শহর এবং কিছু দূরে দক্ষিণেই তিস্তা নদী, মহানন্দা নদ, বালাসোন নদ ও মেচি নদীকে সর্পিল পথে এঁকে বেঁকে চলতে দেখা গেলো। চোলা পর্বতমালার পিছনে অবস্থিত তিব্বতের চুমল রি পর্বতটিও চোখে পড়লো।

এবার দার্জেলিং শহরে ফিরতে হবে আবার। ফিরতে গিয়েই দেখতে পেলাম লম্বা লম্বা গাছ, পাহাড় বেয়ে স্বচ্ছ সাদা ঝরনা, উচুঁ-নিচু মাইলের পর মাইল সবুজ উপত্যকা যেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের  নীলাভূমি। সৃষ্টিকর্তা যেন এসব তৈরি করেছেন আপন মাধুরী দিয়ে। সড়কের পাশে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পাকা, আধপাকা ঘর বা সুদৃশ্য আবাসিক হোটেল যেন আমাদের দেশের টং ঘর। এ দৃশ্য সড়ক পথে দিয়েছে নান্দনিকতা। পাহাড় কেটে তৈরি আঁকাবাঁকা সড়ক মনে করিয়ে দেয় ছবির দৃশ্য। হিমশীতল মেঘ ছুঁতে ছুঁতেই সর্পিল পথে যত যাচ্ছি রোমাঞ্চ তত বাড়ছে।

হোমে ফিরতেই খাবার নিয়ে এলেন বাড়ির মালিক। খুবই সুস্বাদু পরোটা। সবজি। মাংস। তাদের অতিথিপরায়ণতা আর ব্যবহারে আমরা মুগ্ধ। রনিদা বললেন, আমাদের নিয়ে সুন্দর একটি পার্কে যাবেন। পাশেই। আসলেই অদ্ভুত সুন্দর একটি জায়গা, নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবে না। যেখানে ভোর বেলা মানুষ জগিং, ব্যায়াম, হাঁটাহাঁটি করতে যায়। সেখান থেকে হেঁটে মল রোডে গেলাম। দেখে মনে হলো সবই আপন। কিন্তু কখনও দেখিনি। কিছু মানুষ এক কোণে বসে আছেন। কিছু মানুষ স্ন্যাকস খাচ্ছেন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। কেউ হয়তো খুব গভীর আলাপে মত্ত। কেউ শুধু দৃশ্য অবলোকনেই ব্যস্ত প্রিয়জনের সঙ্গে। সব কণ্ঠ ছাপিয়ে একটা বেলের শব্দ পেলাম। শব্দ লক্ষ্য করে এগিয়ে যেতেই এক মন্দির দেখলাম। মহাকাল মন্দির। পাদ্রীকে জিজ্ঞেস করলাম, এখনো খোলা আছে? আমি আসতে পারবো ভেতরে?'

তিনি জবাব দিলেন ঐশ্বরিক ভাষায়, আপনাকে যদি প্রভু ডেকে থাকেন, আপনার হৃদয় যদি খোলা থাকে, মন্দিরের দরজাও খোলা। কখনও বন্ধ হবে না। শুধু তার ঐশ্বরিক কণ্ঠ শুনবেন, তাকে ডাকবেন।

মন্দির দর্শন শেষে এলোমেলো হাঁটছি। রনিদা বললেন, আপনি চা পছন্দ করেন না? আমি বললাম, খুব একটা খাই না। সঙ্গ দিতেই শুধু। বললেন, আচ্ছা। কিন্তু দার্জেলিঙেরটা ট্রাই করতে পারেন।

কথা বলছি আর হাঁটছি। হাঁটতে হাঁটতে এমন একটা জায়গায় পৌঁছলাম যেখানে কোমল পানিয়র সুগন্ধ নাকে এলো। এটা হচ্ছে গোল্ডেন টিপস টিবার। দার্জেলিঙের বিখ্যাত জায়গা। যেখানে বিভিন্ন রকম চা পাওয়া যায়। ভারতজুড়ে যার নাম!

যখন দোকানে ঢুকলাম। তখন একজন গোর্খা নারী হাসিমুখে আমাদের অভ্যার্থনা জানালেন। সেখান থেকে পাহাড়ের দারুণ সব সৌন্দর্য চোখে পড়লো। অন্যপাশে বিশাল ওয়াল পেইন্টিং। অবাক হলাম, এতো দারুণ একটা জায়গা দেখে।

সবুজ কালারের চা এলো। নাম ম্যাচা টি লাতে। রনিদা অর্ডার করেছেন আমার জন্য। কেমন একটা মসৃণ আর ক্রিম ক্রিম ভাব। হালকা চিনির সঙ্গে গরম দুধ দিয়ে বানানো। এটা জাপানি রেসিপি। চা সত্যিই দারুণ! একেবারেই অন্যরকম। স্বাদ লেগে থাকার মতো। ফ্লেভারটা ভোলার মতো না। স্বাদ পেয়ে এরপর অর্ডার করলাম- কাশ্মিরি খাওয়া। এক কাপ নেয়ার পর মনে হলো, আমি চা পছন্দ করি না ঠিকই কিন্তু এরপর দার্জেলিঙের চা পেলে কোনোভাবেই ছাড়বো না।


ঢাকা/তারা