ঢাকা, শনিবার, ২৭ আষাঢ় ১৪২৭, ১১ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

হার্ড ইমিউনিটি নাকি করোনার টিকা- কোন পথে মুক্তি?

জাহিদ সাদেক : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-২৩ ১০:৩৪:২০ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৬-২৪ ১:৩১:৩৭ পিএম

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন হার্ড ইমিউনিটিকে করোনাভাইরাস সমস্যার সমাধান হিসেবে ইঙ্গিত করেছেন। যুক্তরাজ্য সরকারের প্রধান বিজ্ঞান উপদেষ্টা প্যাট্রিক ভ্যালেন্স বলেছেন, ‘দেশে এক প্রকার হার্ড ইমিউনিটি গড়ে তোলা প্রয়োজন যাতে আরও মানুষ এই রোগ প্রতিরোধী হয়ে সংক্রমণ কমিয়ে আনতে পারে।’

পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, হার্ড ইমিউনিটি কী? এ ক্ষেত্রে হার্ড শব্দটি এসেছে ভেড়ার পাল থেকে। এর অর্থ জনগোষ্ঠী। ইমিউনিটি হলো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। হার্ড ইমিউনিটি সম্পর্কে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ভ্যাকসিন নলেজ প্রজেক্টের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, যখন একটি এলাকার বেশিরভাগ মানুষকে কোনো একটি সংক্রামক রোগের প্রতিষেধক দেওয়া হয়, তখন ওই এলাকায় রোগটি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে না। কারণ ওই এলাকায় সংক্রমিত হওয়ার মতো আর কোনো মানুষ থাকে না।

মহামারির ইতিহাস থেকে জানা যায় প্লেগ, জলবসন্ত, হাম, পোলিও বা মাম্পস থেকে পুরোপুরি সুরক্ষা না পেলেও কিছুটা প্রতিরোধ ক্ষমতা আমাদের জন্মেছে এই রোগের বিরুদ্ধে। যাকে চিকিৎসকরা বলছেন, পার্শিয়াল হার্ড ইমিউনিটি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশে সংক্রমণ অব্যাহত থাকলে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ না আসা পর্যন্ত উপায় নেই। কারণ টিকা কিংবা অধিক সংক্রমণের মাধ্যমে সমাজের বেশির ভাগ মানুষের শরীরে জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা তৈরি হয়ে যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আপনি টিকা নেননি, সংক্রমণও আপনার হয়নি, কিন্তু আপনার আশপাশে যারা আছেন তারা এই পদ্ধতির মধ্যে কোনও একটার মাধ্যমে ইমিউনড। তখন দেখা যাবে আপনি ইমিউনড না হওয়া সত্ত্বেও আপনার মধ্যে জীবাণুর সংক্রমণ হবে না। অথবা আপনি যদি সংক্রমিত হন তাহলে রোগ হলেও, যাঁরা আপনার সঙ্গে ওঠাবসা করেন তাঁদের মধ্যে জীবাণু ছড়ানোর সম্ভাবনা কমে যাবে। অর্থাৎ একের থেকে অন্যের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর শৃঙ্খল ভেঙে যাবে। কমবে রোগের প্রকোপ। এভাবেই শেষ হবে মহামারির। যেমন হয়েছে প্লেগ, বসন্ত, হাম, মাম্পস, পোলিও ইত্যাদির ক্ষেত্রে।

ব্রিটিশ দৈনিক ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হার্ড ইমিউনিটি থ্রেসহোল্ড বলে একটি সূচক রয়েছে। এর অর্থ হলো মহামারি কমাতে গেলে কতজন মানুষের মধ্যে সেই রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তথা জোরদার অ্যান্টিবডি তৈরি হতে হয়। মাম্পসের ক্ষেত্রে যেমন ৯২ জনের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠলে বাকি ৮ জন নিরাপদ। কোভিড ১৯-এর হার্ড ইমিউনিটি থ্রেসহোল্ড এখন পর্যন্ত যা বোঝা গিয়েছে তা হলো ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ সমাজের ৭০ শতাংশ মানুষের রোগ হয়ে সেরে যাওয়ার পর শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে অ্যান্টিবডি তৈরি হলে বাকি ৩০ শতাংশ মানুষের নিরাপদ থাকার সম্ভাবনা আছে।

বিবিসি’র একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম থেকেই সচেতনভাবে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি করার জন্য কাজ করেছে সুইডেন। করোনা ঠেকাতে সারা পৃথিবী যখন লকডাউনের পথ বেছে নিয়েছে, ব্যতিক্রম হিসেবে সুইডেন সব কিছুই খোলা রেখেছে। সুইডেনের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রধান পরিচালক চিকিৎসক অ্যান্ডার্স টেগনেল বলেছেন, ‘সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। কিছু মানুষ মারা যাচ্ছেন কিন্তু তার মানে এই নয় যে, লকডাউন না করার সিদ্ধান্ত ভুল। আমরা সন্দেহভাজন প্রতিটি মানুষকে ধরে ধরে পরীক্ষা করেছি। আলাদা রেখেছি। চিকিৎসা দিয়েছি। তাতে ভালো কাজ হয়েছে। আমরা আশা করছি, সামনের মাসের মধ্যেই স্টকহোমের বেশ কিছু অংশে, যেখানে রোগ বেশি হয়েছে, হার্ড ইমিউনিটি পুরোদস্তুর তৈরি হয়ে যাবে।’

অনেক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মতে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে হার্ড ইমিউনিটি হতে হলে অন্তত ১৬ কোটি মানুষকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে হবে। এখন ১৬ কোটি মানুষ আক্রান্ত হলে, এদের মধ্যে যদি ০.০০১ ভাগ মানুষেরও হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়, তাহলে যে বিশালসংখ্যক মানুষের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দরকার হবে বাংলাদেশের বর্তমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বাস্তবতায় সেই সেবা দেওয়া সম্ভব হবে না। এতে মারা যেতে পারে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ।

অনেকে মনে করেন, দেশে বর্তমানে যেভাবে সংক্রমণের হার বাড়ছে তা হতো না যদি আগে থেকেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতো; কোয়ারেন্টিন ভালোভাবে কার্যকর করা যেতো; মানুষ যদি সচেতন হয়ে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করতো। বন্ধ করে আবার হঠাৎ করেই গার্মেন্টস খুলে দেওয়া এবং লকডাউন শিথিল করার সিদ্ধান্তটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকে অবহেলা করার শামিল বলেও অনেকের ধারণা। তাদের মতে দেশবাসীকে এর মূল্য দিতে হবে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হার্ড ইমিউনিটি নিয়ে প্রখ্যাত ভাইরোলজিস্ট প্রফেসর নজরুল ইসলাম অবশ্য ভিন্ন কথা বলেছেন। তার মতে, আমাদের দেশে সংক্রমণের যে প্যাটার্ন তাতে হার্ড ইমিউনিটিতে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। কারণ এখন দেশে কার্যকর একটি কঠোর লকডাউন আরোপ করাও সম্ভব নয়।

এদিকে বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস মহামারি যখন শুরু হয়, তখন অনেক দেশেই হার্ড ইমিউনিটির ব্যাপারে জোরেশোরে কথাবার্তা শোনা গেলেও শেষ পর্যন্ত কোনো দেশই সেই পথে না হেঁটে বরং লকডাউনের পথ বেছে নিয়েছে। কারণ ভ্যাকসিন আবিষ্কারের আগে প্রাকৃতিকভাবে হার্ড ইমিউনিটি গড়ে তুলতে যে পরিমাণ মানুষ আক্রান্ত হবে, আর যত মানুষ মারা যাবে, সেই সংখ্যা হবে অনেক বড়। এজন্য বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ সন্দেহ প্রকাশ করে বলেছেন, করোনার বিরুদ্ধে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হবে কিনা নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না। করোনার টিকা এখনও নেই। কাজেই হার্ড ইমিউনিটি হতে হলে, তাকে আসতে হবে সংক্রমণের পথ ধরেই।

এখন প্রশ্ন হলো, কোনটি ঠিক? কোন পথে গেলে মিলবে মুক্তি? সেই প্রসঙ্গে এখনও দ্বিধাবিভক্ত চিকিৎসক সমাজ। এর মূল কারণ হলো, ফ্লু জাতীয় ভাইরাস মিউটেশন হয়ে নিয়মিত বিরতিতে নতুন নতুন প্রকরণের সৃষ্টি হয়। ফলে শরীর কোনো একটি প্রকরণ দ্বারা সংক্রমিত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুললেও পরবর্তী সময়ে যদি নতুন কোনো প্রকরণ দিয়ে সংক্রমিত হয়, তাহলে প্রথম ক্ষেত্রে যে ইমিউনিটি অর্জিত হয়েছিল সেটি দ্বিতীয়টির বেলায় নিরর্থক হয়ে পড়বে। সুতরাং ফ্লু জাতীয় ভাইরাসের ক্ষেত্রে হার্ড ইমিউনিটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এখন এই গ্রহবাসীর অপেক্ষার পালা- হয় হার্ড ইমিউনিটি তৈরির দিকে যেতে হবে, না-হলে টিকা আবিষ্কারে আরো বেশি মনোযোগী হতে হবে। বেছে নিতে হবে যে কোনো একটি পথ।

 

ঢাকা/তারা